২০ জুন, ২০২১ , রবিবার

কবিতা সিরিজ
সুমিতাভ মণ্ডল
ঘাসের শরীরে জ্বর
জাতিস্বর

এসো জাতিস্মর! এ দৈব ভূমণ্ডলে পা, রাখো
প্রাচীন বাঁশের বনে, অশ্বত্থের ডালে ডালে রাখো
মৃদু লন্ঠন হাতে নেমে এসো অন্তরীক্ষে, শিশিরে
মুঠো ভরা ভাঁটফুলে ভাঙাকুঠি রেনুময় ঘ্রাণ
নিও আমাদের সন্ধান; কিছু তোমার পদছাপ
ভেঙেচুরে ধুলো মেখে মাঠময় উড়ে গেছে।

উড়ে গেছে শীত শীত ঘাসের শরীরে,
বীজপত্রে — শিশুর লালামাখা ঠোঁটে…
ঠোঁটে হাত রাখো।  ফুঁয়ের বাতাস
উড়ে গিয়ে ঘাসের শরীরে আঁকে
উল্কির ছাপে ছাপে, আমাদের কণ্ঠের স্বর;
দেখো — ঘাসের শরীরে জ্বর… বোঝেনি ঈশ্বর!

উপাচার

ঘুরপথে ফিরে এসে যে সকালে চোখ মেলো,
আলুথালু জটাজুটো থেকে টুপটাপ কমণ্ডুলু বেয়ে
ছড়িয়ে পরা আশিসে সে সকাল নেমে আসে –
মাঠে ঘাটে, শেকড়ে-বাকড়ে তার বিস্মরণ কত কিছু…
বাকিটুকু সৌধ হয়ে ঘামে ঘামে শিথিল শরীর
ঘাস হয়ে ঘেরাটোপে ঢুকে পরে।

এইসব উপাচার মেনে ঘর বাঁধি, তুলসির থান;
করি দেবতার সন্ধান পথে পথে ঘুরে
হাতে ফুল, ত্রিপত্র, নারিকেল সাজানো অর্ঘ্যের ডালি
আসন বিছিয়ে জ্বালি হোমের আগুন
শুচি করি ঘর! আসবে ঈশ্বর! সৌম্য ধীর
পায়ের তলায় তার ঘাসের শরীরে জ্বর…

ঔষধি

এ শরীর ছুঁয়েছো যে হাতে সকল ঔষধি
সেই হাতে হাত দিয়ে আঁচলা ভরেছি, জলে
টলটলে সূর্যের তাপ চুয়ে চুয়ে  ঝরছে ঘাসের শরীরে
তারপর জীবন উদ্বায়ু হয়ে প্রকষ্ঠে প্রকষ্ঠে ঘুরে ফেরে;
ঘুরে ফেরে শৈবাল হয়ে, পথের স্মৃতিধুলো মেখে কোন জাতিস্মর!
খুব ক্লান্ত হয়ে বাঁশবনে বসে ঘাসের শরীর ছুঁয়ে।

কখন সন্ধ্যা আসে, জোনাকি আলো, ছেয়ে যায়
চারিধারে শুরু হয় অন্তরীক্ষের বিনির্মাণ গোপনে।
আমি ওজু সেরে করজোড়ে বসি; তখনও
ফোঁটা ফোঁটা ঝরে যায় সকল ঔষধি
ঢলে পড়ি ধানক্ষেতে, তরুমূলে, ঘাসেদের কোলে
আবারও উদ্বায়ু চরাচর; শুধু ঘাসের শরীরে জ্বর।

শ্বাসমূল

শ্বাসমূল হয়ে ইতিউতি জেগে থাকা
এ জীবন নোনাজল ঘেঁটে, দমবন্ধ পাঁক থেকে
মাথা তুলে কোন মতে ধান-দিঘী পাড়ে বসে;
পানকৌড়ির ডুবে ডুবে পাদদেশে আকাশ দেখে।
এ আকাশে দেবতারা ঘাসেদের জাল ফেঁদে গেছে, দেখি
ম্যানগ্রোভ ঘাসেদের জঙ্গলে বেঁচে আছি ধম্মের ষাঁড়।

ছিঁড়ে-ভুরে দাঁতে পিষে কিছুটা ঘাসের নির্যাস
ঢোক গিলে তেষ্টা মিটলে তবে ফিরি ঘরে
গামছায় হাত মুখ মুছি, চাটাই পাতা, এককোনে তুলসির থান –
দেহের ক্লান্তিতে মাপি গাদা করা মাঠের সোনালী ধান
উনুনে ফুটছে চালে জলে পরিপাটি, তৃপ্তিতে গোছানো
মেঠো ইঁদুরের ঘর; ছেঁড়া-ভোরা ঘাসের শরীরে জ্বর।

মায়ালেখা

অবয়বে মায়ালেখা ভেসে ওঠে তারপর
কিছু ভাস্কর পরিধান খুলে ফেলে ভাস্কর্য হয়ে যায়
এইসব সফেন স্মৃতিফুলগুলি বৃন্তসার, নিস্পল দেখে
রেনুপথ দিয়ে ভিতরে যাওয়া যায়, শুরু হয়
পরাগ মিলন, হৃদয়ে গোপনে সহসাই যেন—
নেমে এসে ঘাসের বিছানা পাতা, জোছনা চাদর।

গায়ে ঢলে বসে এলানো দোতারা— ছেনালের মতো
অন্তরের সুখ কেজানে কোথায় ফেলে ঘুরে ফেরে
আখড়ায় আখড়ায়, ভজনে সাধনে একাকার
কখনও বোষ্টমীর পেলব দেহ জড়িয়ে ঘাটে যায় শুদ্ধিস্নানে
বোষ্টমী শাড়ি খুলে, সুর ফেলে, সায়া বাঁধে বুকের কিছুটা ওপরে
সুরগুলো ছটফট করে দেখে বোষ্টমীর ঘর— ঘাসের শরীরে জ্বর।

ধোপাবাড়ি

সমাধিতে অদ্ভুত তাপবোধ আমার, প্রেয়সী এখন।
ছায়াগাছে ঝুলতে ঝুলতে কয়েকটা আত্মঘাতী মেঘ
আত্মনে সেবাইত হয়ে— মন্দির থেকে
ঝুপঝাপ নেমে এসে তারা উদ্বায়ু সহসা।
কঠিন চিবুক বেয়ে দু’পা নিচে এসে ঝকমকে নতুন গহনা
পসার মেলে, আধুলি গুছিয়ে গুটিগুটি সন্ধ্যার হরিগানে।
প্রেয়সী আমার! ব্রহ্মতালু ছুঁয়ে তাপ মেপে নাও
প্রেয়সী আমার! এই ক্ষিরপাক জুড়িয়ে গেলে সুবাসে থেকে যাব।

কিছু সুরঙ্গ কপাট খুলে, ধ্রুব মোক্ষের ইঙ্গিতে
মেলে ধরে পিছল নক্ষত্রমালা নিভু জোছনায়;
হড়কে গড়িয়ে যায় গোটা কতক প্রাচীন বাঁশঝাড়
অবগাহনে নেমেও ছুড়ে দেয় ব্রহ্মমূল আকাশের দিকে।
এইভাবে সমাধিতে আছড়ে আছড়ে কান্নাজলে
ধোপাবাড়ি জুরে শোরগোল পড়ে যায়
উৎসব আঙ্গিনা হয়ে ওঠে প্রেয়সীর ঘর
সমাধির ফাটলে ফাটলে জাগে ঘাসের শরীরে জ্বর।

ব্রহ্মপট

নতজানু পৃথিবীর ছায়াটুকু সরে যেতে থাকে।
ডানহাতে ধরে থাকা কম্বলের পশম, মেঘের মতো
উড়ে গিয়ে ঝরে পড়ে ঘাসের শরীরে।
ঘাসেদের জ্বর টুনটুনি হয়ে ঠোঁট দিয়ে বাসা
বুনে ফেলে অদৃষ্টের ঘোরে এক মায়াজাল
আর সেই শঙ্খবেলায় সমূদ্রের হাতবদল হওয়ার
সাক্ষী হয়ে গোঙানির মতো কাঁদে তোমার ঈশ্বর কণা।

এই পতনের যতটুকু অবকাশ জুরে
বেঁচে নেওয়া যায় আস্ত এক জীবন;
তার রপ্তে রপ্তে মাথা তুলে আকাশে পৌঁছায় হিমালয়!
তার আবর্তে এক সুরঙ্গ গড়ে ওঠে
ঈশ্বর কণা ছুটতে থাকে কোলাইডারে
শুরু হয়ে যায় ব্রহ্মপটের নির্মাণ; অগোচরে
ঘাসের শরীরে জ্বর ফিরে আসে তারপর।

গর্ভবীজ

যে প্রসাধনে আমার সকল আবেশ গেঁথে আছে,
তার পরতে পরতে এমন রঙিন প্রজাপতি
উড়ে এসে ডানার ঝাপটে সহসাই ঝেরে ফেলে
সূক্ষ্ম কিছু মাঙ্গলিক দোষের অপাংক্তেয় রেণু;
নিষেকের জল-পাত্র উপচে নামা হড়পা
গর্ভবীজে ঢেকে দেয় ঘাসের শরীর আলগোছে
আত্ম-বিস্মরণে প্রিয় গৃহিণী গুমড়ে উঠে
বালিশ হাতড়ে দেখে — নক্ষত্র কেমন বিন্দু হয়ে যায়…

এই অনুক্ষণে বনেদী সকল আসবাব
রুয়ে দিতে হয়, মজে যাওয়া খালের
কিনারে যে জমি উর্বর হয়ে আকুল; চাষের আর্তি
ছলাৎ ছলাৎ করে চলকে ভিজিয়ে যায়
ধারাপাত শিখে নেওয়া ফেনা মাখা ঘাসেদের একটা গ্রাম
অলীক ইঙ্গিতে তারা বুনে দেয় মাঠময় জিলিপির প্যাঁচ!
তারপর আসবাব সব, মেলে ধরে নতুন সবুজ পাতা
কুয়াশায় মুড়ে দেয় ঘাসের শরীরে — মুগ্ধ চরাচর!

গর্ভস্ফীতি

একটু একটু করে হৃদয়ের সকল রজন পুড়ে খাক
হতে পারে; প্রথম স্পর্ধার ফল আলেখ্যর মত
বয়ে যেতে যেতে শূন্য জনপদে থমকে দাঁড়িয়ে
পড়ে ফেলে জীবনের সকল রহস্যগল্প,সন্ধিসূত্র যত
অপহৃত নদীবাঁকের নুড়ি, ঘাটশিলার আয়নায় দেখে
মহাকাশে ঠিকরে ছোটে অসামান্য উল্কা-গতি
যারা কেবল ঝরতে জানে ঘাসেদের অভিমুখে, আর
অদ্ভুত পত্রফলক হয়ে মেলে ধরে প্রান্ত-বেলার বাতাস।

এমন উন্মুক্ত উদ্যান পাওয়া গেলে স্বপ্ন মনে হয়
অভিঘাত হয়ে বাল্য-ক্রীড়ায় যাতে ঈশ্বর
অলিন্দের দেওয়ালে দেওয়ালে গর্ভস্ফীতি ফুটে ওঠে
ঘাসেদের মাতৃত্ব-জালিকা ছুঁয়ে একে একে টুপটাপ
ভূমিষ্ঠ কান্নায় সহসাই প্রকষ্ঠ জলসা হয়ে ওঠে
তোমার আমার জন্ম-গান শুরু হয় মঞ্চের উপর
শুধু মা জানে এইসব উৎসব উল্লাস মহাকাশে উল্কাপাত বিলীন।
এ দহনে ঘাসের শরীরে জ্বর — মাতৃত্ব মলিন।

ক্রমশ...
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
সাম্প্রতিক পোষ্ট
সাড়ে চুয়াত্তরের কেদাররূপী ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের “মাসিমা মালপোয়া খামু” র অনবদ্য হ্যাংলামো আমাদের ভেতরে স্বতঃজাগরূক। ওটা সহজেই মাসিমা আইচকিরিম খামু হতে পারে… সারাজীবনে কতবার যে চেয়েছি সেটা।

হারিয়ে যাওয়া ফেরিওয়ালারা- যশোধরা রায়চৌধুরী

Read More »
আপনি কি প্রকাশক বা লেখক?

কেয়াপাতার অনলাইন বিপণীতে বই রাখতে পারেন খুব সহজেই !