৩০ মে, ২০২১, রবিবার

ধারাবাহিক স্মৃতিচারী গদ্য
হারিয়ে যাওয়া গানের খাতা
যশোধরা রায়চৌধুরী

যশোধরা রায়চৌধুরী

২৩ পর্ব
খাদ্য ভূগোল, খাদ্য মানচিত্র

আমি শ্রী শ্রী ভজহরি মান্না,

আমি শ্রী শ্রী ভজহরি মান্না।

ইস্তাম্বুল গিয়ে জাপান কাবুল গিয়ে

শিখেছি সহজ এই রান্না..

আমি শ্রী শ্রী ভজহরি মান্না।

 

হাতে নিয়ে ডেকচি, যেই তুলি হেঁচকি,

হাতে নিয়ে ডেকচি, যেই তুলি হেঁচকি,

বিরিয়ানী কোরমা, পটলের দোরমা,

মিলেমিশে হয়ে যায় প্যারিসের ছেঁচকি।



পাবেন না মশলাটা যেখানেই যান না,

আমি শ্রী শ্রী ভোজহরি মান্না।

 

সুইজারল্যান্ড গিয়ে, ইজিপ্ট হল্যান্ড গিয়ে

শিখেছি নতুন এই রান্না..

আমি শ্রী শ্রী ভজহরী মান্না ..

 

শোনো ভাই কুন্তী, নিয়ে এসো খুন্তি,

শোনো ভাই কুন্তী, নিয়ে এসো খুন্তি,

ওহে বীর হাজরা.. হাড় আর পাঁজরা..

ওহে বীর হাজরা, হাড় আর পাঁজরা

আস্ত মাছেই করি ডেভিল অগুন্তি,

মোটেই হবেনা ভুঁড়ি যত খুশি খান না,

আমি শ্রী শ্রী ভজহরি মান্না ..

 

না কেটেই খাশি টা, টাটকা কি বাসি টা,

না কেটেই খাশি টা, টাটকা কি বাসি টা,

ঠিক পড়ে নজরে, বলে দি সজোরে,

মাংসটা ঝাল হবে মেটে হবে আশিটা।

 

পেটে গিয়ে ব্যা ব্যা করে জুড়ে দেবে কান্না,

আমি শ্রী শ্রী ভজহরি মান্না।

 

Khyber Pass গিয়ে Rome Cyprus গিয়ে,

শিখেছি দারুন এই রান্না …

আমি শ্রী শ্রী ভজহরি মান্না,

আমি শ্রী শ্রী ভজহরি মান্না।



আমার হারিয়ে যাওয়া খাতার ছেঁড়া পাতায় ভেসে ভেসে এসেছে অসংখ্য প্রসঙ্গ। হয়ত একটাই প্রসঙ্গ দুবার কি তিনবার এসেছে নানা অংশে, পর্বে। 

খাওয়ার প্রসঙ্গ খাদ্যপ্রেমী বাঙালির শেকড়ে। উঠতে খাওয়া বসতে খাওয়া, বাঁচতে খাওয়া, জন্মে মৃত্যুতে, অন্নপ্রাশনে শ্রাদ্ধে খাওয়া। 

তারপর আছে বাড়িতে খাওয়া। সকালের জলখাবারের পর্ব, দুপুরের চর্ব্যচোষ্য লেহ্য পেয়, সন্ধের জলযোগ, চায়ের সঙ্গে টা, আবার রাত্রের গান্ডেপিন্ডে গেলা। প্রতিটি ঘন্টার সঙ্গে খাওয়ার সম্পর্ক ওতোপ্রোত। “অন্ন ব্রহ্ম” নামক চেতনা, কেমন যেন বীজাকারে এসে, আমাদের দর্শনে চারিয়ে গেছে। বলা ভাল সূচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরিয়েছে। মন্দিরে আশ্রমে, ঘরের থেকে বারোয়ারি পুজোতে, অন্নছত্রে, কীর্তনে, ধর্মকর্মের সমস্ত প্রকারভেদে পেটুক বাঙালি শুধু কী খেতে পাবে সেই কথা ভেবে হাজির হয়েছে জোড় হস্তে। 

এর সংগে আবার জুড়েছে সময়ের দাবি । আমাদের বড় হবার সময়ের, ষাট সত্তর দশকের , আশি দশকের খাওয়াদাওয়ার অভ্যাসের কত যে পরিবর্তন, প্রগতি, বিবর্তন। 

ঘরের খাবার থেকে যদি খাদ্যপ্রেম  শুরু হয়, তাহলে আমার প্রথম স্মৃতি , একেবারে প্রায় পূর্বজন্মের কাছাকাছির স্মৃতি হল, আমি বছর তিনেকের , কোমরে হাত  দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, মাকে খুব রেগে বলছি আমার দুধের বোতলটা কোথায় গেল? কোথায় আমার প্রিয় দুধের বোতল? খাবনা আমি দুধের বোতলে দুধ? দুধ খাব না আমি?

কেন এই অদ্ভুত দৃশ্যট আমার স্মৃতিপটে মুদ্রিত থেকে গেল ভাবি। আসলে সেই প্রথম আমার সাক্ষাৎ হল বড়দের মুখনিঃসৃত মিথ্যার সঙ্গে। মা বেমালুম মিথ্যে বললেন। আমার বোতলের অভ্যাস ছাড়ানোর জন্য বোতলটা হাপিস করে দিয়েও। আমি আমার অন্তর দিয়ে সেই বয়সে জানি মা ছাড়া আর কেউ থাকতে পারেনা আমার দুধের বোতলএর রহস্যময় অন্তর্ধানের পেছনে।  অথচ মা কেমন সরল সরল মুখ করে বললেন, কই ? কোথায় গেল? জানি না ত?

এই বিশ্বাসঘাত, যাদের বিশ্বাস করি যাদের প্রতি কথাকে সত্যি বলে মানি তাদের বানানো ছেলেভুলনো কথাকে মিথ্যা বলে চিনতে পারার শক, ট্রমা, আজো আমার পরিষ্কার মনে পড়ে। স্বপ্নের ভেতরে যখন আজো দেখি মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করছি, বারো বছর আগে অন্তর্ধান করা মায়ের সঙ্গে… তা যেন জড়িয়ে যায় প্রথম দিনের সেই ব্যর্থ ক্ষোভ ও অক্ষম রাগের সঙ্গে। পরিবারের মানুষদের কাছ থেকেই ত আমাদের কাছে আসে জীবনের প্রথম ধাক্কা, প্রথম প্রতারণা। 

এর পরের স্মৃতি সবই সুখস্মৃতি। সকালে ইশকুল যাবার আগে জোর করে দুধের গেলাস খালি করতে হওয়া ও দুধে আমার আঁশটে গন্ধ পাওয়াটুকু বাদ দিলে…

অনেক রাতে সপরিবারে ( পড়ুন দিদু, মামা মামিরা মা আমরা বাচ্চারা) কোথাও ঘুরে তারপর ফিরে গরম ফেনাভাত, গোবিন্দভোগ চালের… মাখন বা ঘিয়ের গন্ধ। দিদুর বাড়িতে। বাটিতে করে দুধ, রাতে, মুড়ি বা খই দিয়ে… সঙ্গে এক খন্ড গুড়। দিদুর দেওয়া। একেবারে শৈশবের ভুলতে না পারা স্বাদ। অসাধারণ পোলাও, যার ওপর ভাজা পেঁয়াজের বারেস্তা। গোল গোল করে গরাস পাকানো ভাত ডাল আলুসেদ্ধ মাখার স্বাদ। 

মূল খাবারের থেকে বেশি স্মৃতি জলখাবারের।  সুস্বাদু  যতরকমের জলখাবার… রুটি বেগুনভাজায় চিনি ছড়িয়ে জলযোগ, প্রথমবার বাড়িতে করা ফ্রেঞ্চ টোস্ট খাবার স্মৃতি, কি সুন্দর কুরকুরে ছিল ডিমের ধার গুলো  তেলে ভাজা ভাজা হয়ে… অসংখ্য মুড়ি নারকেল চিনি খাওয়ার স্মৃতি, বা শশা চানাচুর মুড়ি… 

আমাদের জন্ম ইশ্তক সমস্ত রস গ্রহণ, যাবতীয় স্বাদকুঁড়ির উন্মোচন ত বাড়িতে মা দিদিমা, ঠাকুমার দেওয়া খাবারের সূত্রেই। আমার দিদু বছরে।একবার মুড়ির মোয়া বানিয়ে ডালডার টিন  ভরে পাঠাতেন৷ আমার অন্যতম প্রিয় খাবার ছিল মোয়া! what a snack !!! বিস্ময়ের চোটে ইংরেজি বলে ফেলার মতই সত্যি। লাজবাব্ব, কোথায় লাগে ইংরেজি কুকি কেক বিস্কুট।  দিদুর স্পেশাল মোয়াতে আবার চিনেবাদামের কুচি দেওয়া থাকত।

আসলে ভাত কম খেতাম, ভাত মুখে নিয়ে ঘন্টাভর বসে থাকতাম, অসম্ভব স্লো ইটার ছিলাম। তাই সবার খাওয়া যখন শেষের দিকে আমার তখনো দ্বিতীয় পদ চলছে, তাই আমার আর ভরপেট ভাত খাওয়াই হল না কখনো । রুইমাছের তেল খেতাম না, পাশের পাতে চালান করতাম। ইলিশ মাছের তেল খেতাম, মাছটা বেশি কাঁটা বলে পাশের পাতে…

ভাতটা ভাল করে খেতাম না বলেই,  মাঝে মাঝেই স্ন্যাক্সের দরকার হত। আগেই কখনো বলেছি এই সব স্ন্যাকের অনেকটা আসত পাড়ার বিবিধ দোকান থেকে। বিকেলের জলখাবার , এটা বাঙালির এক বিশেষ দুর্বলতা। বিভূতিভূষণের গল্প উপন্যাস থেকে শরদিন্দুর ব্যোমকেশের কাহিনি অব্দি বিতত আছে এই বিকেলের চায়ের সঙ্গে খাওয়া পাড়ার দোকানের লুচি কচুরি সিঙাড়া , মিষ্টি, ভাজা মিষ্টি, সন্দেশ রসগোল্লা ইত্যাদির কথা। ঘিয়ে ভাজা চিঁড়ে থেকে ঝাল আলুর দম অব্দি ছড়ানো আছে। উনিশশো চল্লিশ পঞ্চাশ ষাটের দশকের এই জলখাবার বৃত্তান্ত। 

আমাদের দিদুর বাড়ির গলির মুখের ছোট্ট নামহীন মিষ্টির দোকানের সিঙাড়া ছিল আমাদের আটপৌরে বিকেলের খাবার। অন্যথা গোবিন্দদা, সেই উড়িষ্যানিবাসী দিদুর ডান হাত , যার কথা আগেও বলেছি, বাড়িতে বানাত চিঁড়ের পোলাও থেকে শুরু করে আরো নানা সুখ্যাদ্য। বেগুনি পেয়াঁজি , আরো কত ভাজা ভুজি। মুড়ি কড়াইশুঁটি সেদ্ধ তেল দিয়ে খেতাম শীতে।

সত্তরের দশকে এইসব খাবারের সঙ্গে জুড়ে গেল ফাস্ট ফুড চাউমিন , জুড়ে গেল এগ রোল আর চিকেন রোল। আরো পরে, এল মনগিনিজ এর প্যাটিজ , স্যান্ডুইচ, পাড়ায় পাড়ায়। ষাট দশক অব্দি,  আগে রোল  মানেই ছিল নিজামের রোল, হগের বাজারের পেছনের গলি থেকে, আর প্যাটিজ স্যান্ডুইচ কুকি বিস্কুট পেস্ট্রি নাহুম, মানে নিউ মার্কেট বা হগের বাজারের ভেতরের থেকে… নয়ত পার্ক স্ট্রিটের ফ্লুরিজ এর মত “পশ” নাক উঁচু দোকানের। ( প্রথমবার সালামি ও খাওয়া এই হগেরবাজারের দোকান কেভেন্টারস থেকে, সেই ঘুরন্ত চাকায় ফালি ফালি হওয়া সসেজ, দৃশ্যটা অবাক করেছিল। পাশে দাড়ানো অন্য ক্রেতা সসেজের যে লালচে চামড়াটা কাটার সময়ে ফালি ফালি হয়ে পড়ে যাচ্ছিল সেগুলো তুলে মুখে দিয়ে কচমচ করে খেয়ে নিলেন মনে পড়ে)… খ্রিষ্টান ও মুসলিম ঘরানার যাবতীয় খাওয়াদাওয়ার পীঠস্থান তখন ও পাড়া আর আমরা বাত্তিওয়ালা হিঁদু  কায়েতের শিক্ষিত বাঙালির মধ্যেবিত্তের তখন হাউমাউ করে সেসব খাওয়ার দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্ম আমি বা আমরা। 

নয়ের দশকে মনজিনিসের সর্বত্রগামিতা ইতি করে দিল আমাদের “বাঙালি” কেনা জলখাবারের। সিঙাড়া হয়ে গেল ব্যাকডেটেড।  ফিশ ফ্রাই ও হারাল তার  ফার্স্ট বেঞ্চে বসা প্রিভিলেজড অস্তিত্বটি, চিকেন ইন্টারনেট বা মেয়োনেজ সসে চোবানো হটডগ চিকেন স্যান্ডুইচের মত মনের জিনিসের সঙ্গে কম্পিটিশনে। 

কলেজ স্ট্রিটে কফি হাউজের কবরেজি কাটলেট, কফি -কোল্ড কফি আর তুলতুলে চিকেন স্যান্ডুইচের দুর্লভ দর্শন ততদিনে প্রেসিডেন্সি পড়া আমার ঘটেছে। ট্যাঁকে পয়সা না থাকায় বড়ই দুর্লভ ছিল যাদের দর্শন আশি দশকের। নয়ের দশকে চাকরি ও ট্যাঁকে টাকা আসার পর , হা হতোস্মি,  ততদিনে তারা অস্তগামী,  জনপ্রিয়তায়। বাজারে এসে গেছে আরো কত হরেক নবীন খাদ্যসম্ভার। 

আমাদের ছোটবেলায় ছিল হাটারির অথবা পিপিং এর মহার্ঘ চাইনিজ… পরে চাং ওয়া বা কিম ওয়াহ ( গড়চায়)। তারপর পাড়ায় পাড়ায় রোল কর্নারে স্টলে স্টলে চাউমিন এসে গণতন্ত্রীকরণ করল তারও। 

আমাদের মূল বসবাসের ভূখন্ড যেহেতু শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি রোড-হাজরা মোড় অঞ্চল…জীবনের সেই মানচিত্র আদি। পরে,  বড় হবার সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে গেছি যদিও মূল ভূখন্ড থেকে,  ক্রমশ ত  তৈরি হয়ে উঠেছে কলকাতা বিস্তৃত  এক খাদ্য ভূগোল। 

আমার বাড়ির আসেপাশে  ধরে ধরে, পুরো ছোট বেলার বাইরের খাবারের ফুড ম্যাপ রচনার একটা চেষ্টা করেছিলাম আগে একবার। এবার  আবার ফিরে আসি সেই কাজে। সম্পূর্ণ হয়নি সে কাজ।  অনেকের কাছে শুনে , অভিযোগ পেয়ে, দেখছি সেই ফুড ম্যাপের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিন্দুই আমি ভুলে মেরেছিলাম। সমস্ত খাবার দোকানের তালিকা এবার ভবানীপুরের শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি রোডের ফুটপাত ধরে ধরে করব। 

আমাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাঁদিকে গেলে বিজলি সিনেমা। ভবানীপুর থানার পাশে। সেই বিজলির গলিতে ছিল বিজলি গ্রিল। এখনো আছে। বিজলি গ্রিল কেটারিং  হল কেটারিং জগতের ভগীরথ ,মানে সোজা বাংলায় পায়োনিয়র।  শোনা কথা, তার মালিক ছিলেন বাবার বন্ধু, ১৯৬১ তে দিদির অন্নপ্রাশনের খাওয়ার কেটারার ছিলেন তিনিই।  বিজলি গ্রিলের ফিশ ফ্রাই ছিল যে কোন উঠতি খাদ্যাভিলাষীর অবশ্যভক্ষ্য, তবে ফিশ রোল বলে একটা অসাধারণ জিনিস বিয়েবাড়িতে ওঁরা পাতে ফেলতেন,  একেবারে মুগ্ধ করা জিনিস। আরো ছিল, ফিশ ওর্লি, নরম ব্যাটারে ফ্রাই করা। এই ওর্লি আসলে স্থাননাম। যদিও হোয়াটস্যাপ মাধ্যমে নানা গল্প ঘোরে এর ইতিহাস সম্বন্ধে, কতটা  বিশ্বাসযোগ্য জানা নেই। 

উল্টো ফুটের কোণায় শ্রীহরি মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। এঁদের কাঁচাগোল্লা এবং ভাজা মিষ্টি অনন্য ছিল। কালোজাম বা লেডিকেনি তুলতুলে। এখনো ভাল আছে কিন্তু জাতে শ্রীহরি আর মিষ্টান্ন জগতের ফোর রানার নেই। ওদের সকালের বা রাতের পংক্তি ভোজন হত।  বেশ নামকরা সেটা। গরিব মানুষদের খাওয়াতেন। এখন আর হয় কিনা জানা নেই।  শ্রীহরির ভেতরে বসে লুচি/কচুরি দিয়ে মিষ্টি মিষ্টি ছোলার ডাল খাওয়ার অজস্র অভিজ্ঞতা , যার শেষটি প্রেমকরা কালীন, যা নিয়ে কবিতাও লিখেছিলাম।  মিনার বিজলি ছবিঘর, রাধা পূর্ণ প্রাচী সিরিজের কবিতাগুলিতে নয়ের দশকে এই  সিনেমাপাড়াগুলো

কে সেলিব্রেট করেছিলাম, সঙ্গে শ্রীহরির কচুরির কথাও। 

শ্রীহরিকে ডান হাতে রেখে হেঁটে গেলে, ইন্দিরা সিনেমার কাছে ফুটের যে ফুচকা ওয়ালা তার মত ফুচকা সারাজীবনে আর খাইনি। আর সেই ফুচকার নেশাটা ছিল মারাত্মক। আশি নব্বই দশকে সন্ধেবেলা “চল দিদি ফুচকা খেয়ে আসি” বলে আমরা খেতে চলে গেছি কত কত বার। একাও খেয়েছি,  পথে চলতে অমোঘ টানে টানত সেই তেঁতুলজলের গন্ধ। 

শ্রীহরিকে বাঁদিকে রেখে হাজরামোড়ের দিকে হাঁটলে পড়বে মোড়ের কাছে ক্যাফে। যা উঠে যেতে বসেছিল বছর কয়েক আগে। ওদের দুধ চা, চপ , কাটলেট, ফ্রাই আর পুডিং অনন্য। অসংখ্য বার বন্ধুদের সঙ্গে ওখানে গেছি তবে শৈশবে এসব জায়গায় ঢোকা হয়নি। সবটাই পাখা গজানোর পর । 

হাজরা রোড পার হয়ে আরো হেঁটে গেলে আছে যোজন গন্ধা, উল্টো ফুটে, ওখানেও ফিশ ফ্রাই ছিল দারুণ নামী। এক চানাচুর ওয়ালার কাছে প্রথম আগ্রাই ডালমুট খেয়ে বুঝি বাঙালির চানাচুর থেকে এ ডালমুট একদম আলাদা , সূক্ষ্ম সেমাই আর ভাজা গোটা মুগের ডালের সেই সখ্য ভাবা যায়না। মুখে দিলে গলে যায় এত ঘি মুচমুচে। তার পর আরো এগোলে উজ্জ্বলা সিনেমার তলে উজ্জ্বলার চানাচুর। এখনো খাই। বাদামি কাগজের ঠোঙায় ভরা মচমচে এই চানাচুরের তেল এত ভাল ব্যবহৃত হয় যে বহুদিন অব্দি বাসি তেলের গন্ধ আসেনা । অতি নামী এই চানাচুরের কদর দূর দূর অব্দি। 

আবার হাজরা রোডের ওপর রাধাকৃষ্ণ মন্দিরের গায়ের ঐ ছোট্ট ফরশানের দকানের আলুবোণ্ডা,পালং এর পকোড়া, আর কচুর চিপ্স, অজস্র গাঠিয়া চানাচুর সহ, মায়ের মোস্ট ফেবারিট ছিল আমাদের শৈশবে। ঐ দোকানেও এত ভাল তেল ব্যবহার হত যে কখনো অসুখ করেনি। মা ডালডার টিন ভরে ভরে ওইসব কিনে রাখতেন আর আমরা মুঠো মুঠো খেতাম। গরম পকোড়ার সঙ্গে ওরা দিতেন সবুজাভ একটা কাঁচা পেঁপের  আচার। গুজরাটি সেই আচারে মুখের তেল ভাব কেটে যায়। অসাধারণ ছিল ওই স্বাদ। নিজে বানানোর চেষ্টা করেছি, অমন হয়নি। 

বিজলী সিনেমার গায়ে বহুদিন ছিল মেঘদূত। পরে উঠে যায়। আমাদের ছোট্ট জীবনের একটা বড় অংশ, মা দিদুর বাড়ি থেকে ফিরে বা অন্য কোন সান্ধ্য অনুষ্ঠান থেকে বাড়ি ফেরার পথে বাস থেকে নেমেই বলতেন, দোসা খেয়ে যাই। অর্থাত মাকে আর বাড়ি গিয়ে রাতের রান্নার আয়োজন করতে হবে না। সেই দোসার স্বাদ ছিল একেবারে শ্রেষ্ঠ। আমার চাই প্লেন দোসা, মা নেবেন মসালা দোসা, কারণ নইলে পেট ভরবে না। পেট ত বেশিই ভরত। অনেকেই এক প্লেট দোসা বা ইডলি বড়া খেয়েছে আর মূল পেট ভরিয়েছে  বহুবার ভরে দিয়ে যাওয়া সম্বর আর নারকেল চাটনির বাটি টেনে নিয়ে নিয়ে।  যদিও হাজরা মোড়ে আরো দু তিনটে দোসার দোকান ও মায়ের খুব ফেভারিট ছিল, একটার নাম লক্ষ্মী বিলাস। অন্যটা, আশ্চর্য ভাবে এক শিখ সর্দারজি চালাতেন। 

হাজরার মোড়ে শেঠি হোটেলের রুমালি রুটি আর তড়কা আমাদের প্রায় প্রায়ই ডিনারে জুটেছে এই সমসময়েই। আর খিরোদ ঘোষ মার্কেটের নিচে একটা কচুরির দোকান পরে প্রচন্ড হিট হয়ে যায়। 

হরিশ মুখার্জি রোডের সঙ্গে হাজরা রোডের সংযোগ স্থলে কোণায় ছিল জলযোগের দোকান। হার্ট শেপ কেক আর কাপ কেক দুটোই ছিল অনবদ্য। গোছা গোছা আনতেন মা। 

হরিশ মুখার্জিতে আরো এগিয়ে ছিল একটা আরামবাগ চিকেনের আউটলেট। আশি দশকের শুরুতে প্রথম ড্রেসড চিকেন বিক্রি করে দারুণ রমরমিয়ে চলতে শুরু করে আরামবাগ । হরিশ মুখার্জি ধরে অনেক দূর এগিয়ে গেলে পিজির কাছে অসামান্য একটি গুরুদ্বারা-লাগোয়া দোকানে লস্যি খেয়েছি আমরা, দোকানটা স্বমহিমায় বিরাজমান।  বিশেষত ময়দানে, রবীন্দ্রসদনের বিপরীতে প্রতি শীতে অসংখ্য মেলায় যাওয়া হত যখন, ফেরার পথে ঐ অব্দি হেঁটে এসে লস্যি খেতাম আমরা। এক গেলাসেই পেট ভর্তি। অত ঘন মালাইদার দইয়ের লস্যি কোনদিন আগে খাইনি। উল্টোফুটের ফরসান দোকানে প্রথমবার ধোকলা খাই, সেও বাঙালির জীবনে নতুন আমদানি। মুখে গলে যাওয়া ধোকলার সেই স্বাদ ভোলার না। তারপর ত বাঙালির রোজকার খাবারই হয়ে উঠল ঠেপলা ধোকলা দোসা বড়া এবং খাকরা… দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতের বিশাল অংশ দক্ষিণ কলকাতার বাসিন্দা হবার দৌলতেই। 

দেশপ্রিয় পার্কের কাছের কেরালা কাফেতে ক্লাস টু থ্রিতে পড়া কালীন মায়ের সংগে গিয়ে, প্রথম বার  নারকেলের ঘন চাটনিতে ডুবিয়ে মুড়ুক্কু খেয়ে আনন্দে প্রায় অজ্ঞান হয়ে গেছিলাম, সে দোকান পরে উঠে যায়। রাসবিহারির গুরুদ্বারাতে ঘি চপচপে প্রসাদি মোহন ভোগ খেয়ে একেবারে বিন্দাস হয়ে গেছি সেও ঐ বয়সেই। ক্লাস থ্রি ফোর ফাইভ হবে। 

ঐ প্রতাপাদিত্য রোড রাসবিহারী অঞ্চলের রথের মেলায় ত কোটি কোটি বারের পাঁপড় জিলিপি খাওয়ার স্মৃতি একেবারে তাজা আজো। আর, আরো পরে এইসব পাড়ায় একলা ঘুরেছি যত, রক্তে মিশে গেছে লেক মার্কেটের উল্টোদিকের কোমলা বিলাস ( এখন ভোল পাল্টে বেনানা লিফ) , বা মনোহর পুকুরের রাজ রেস্তোরাঁর দক্ষিণী খাবার। 

এই মুহূর্তে যখন লিখছি, মনে পড়ছে প্রায় প্রায় সন্ধেতেই পেনসিল , রবার, ভূগোলের ম্যাপ আঁকার জন্য কাগজ, স্কুলের বোর্ড ম্যাগাজিনের জন্য রঙিন বা সাদা চার্ট পেপার, বা স্কুলের ফরমাইশি আর্ট প্রজেক্টের জিনিস কিনতে দাঁ পেপার হাউজে যাওয়ার বায়না করা,  বই কিনতে ব্যানার্জি বুক স্টল যাওয়া…মায়ের সঙ্গে তারপর চষে বেড়ানো ভবানীপুরের ফুটপাত। এবং আনুষঙ্গিক এই সব খাওয়াদাওয়ার অনিবার্যতা। ফুচকা চুড়মুড় দিয়ে যার শুরু আর শেষ ফিশফ্রাইতে… বা বিজলি গ্রিলের চাউমিনে। 

শেষ করি দুটো  মজার গল্প বলে। আমার পিসি আর পিসেমশাই আমাদের বাইরে খাওয়ার অন্য একটা পর্ব রেগুলেট করতেন। পিসেমশাই প্রায়শ খাওয়াতে  নিয়ে যেতেন। বছরে একবার কি দুবার… এসব খাওয়াতে মাকে নিতেন না মানে আমাদের দুই বোনকে প্যাম্পার করাই উদ্দেশ্য। মায়ের সঙ্গে  ত  গুরুজন সম্পর্ক। 

একবার  বড়পিসি লন্ডন থেকে এসে সব খুড়তুতো জেঠতুতো ভাইবোনদের পিপিং এ খাওয়াতে নিয়ে গেছিলেন, সে প্রায় দশ বারো জনের বিশাল দল। বিশাল জোড়া টেবিলে বসা হল। সব খাবার শেষে,  সেবারই ভ্যানিলা আইসক্রিম, যা নাকি বাহারি রুপোর সরুগলা  পাত্রে সরু  লম্বা চামচ সহ এসেছিল , সেটা খেতে শুরু করার পর কেউ একটা  বলল, আইসক্রিম তেতো লাগছে। অমনি পিসি শোরগোল ফেলে দিলেন, খেও না কেউ, পাল্টে দিতে হবে পিপিং কর্তৃপক্ষকে!!! সবাইকে তলব করে সে এক হৈ হৈ কান্ড, ম্যানেজার এসে খেয়ে বললেন কই আমার ত তেতো লাগল না। দিদি বুদ্ধি করে শোরগোলের মধ্যেই আইসক্রিম শেষ করে দিয়েছে। পরে যদি না পাওয়া যায়! আর পেলে ত কথাই নেই। দুবার আইসক্রিম খাওয়া যাবে খন। 

শেষ মেশ দশ বারো টা আইসক্রিম বদলে দিল না পিপিং, আর তাইতে আমাদের সবার আইসক্রিম গলে জল, পিসির মেজাজও টং। 

এর পর বেশ কিছু বছর কেটেছে। আমরা তখন কলেজে বা দিদি কলেজে আর আমি স্কুলের উঁচু ক্লাসে। পিসেমশাই বললেন খাওয়াবেন, আর যেদিন খাওয়ার প্ল্যান, সেইদিনই সন্ধেবেলা প্রবল ঝড়বৃষ্টি। সাতটা নাগাদ ট্যাক্সি করে পিপিং গিয়ে দেখা গেল সেখানে কোন রিপেয়ার হচ্ছে তাই রেস্তোরাঁ বন্ধ। এর পর নানা রেস্তোরাঁয় ঢুঁ মারা, কিন্তু বর্ষাবাদলার সন্ধেতে কেন যেন একটাও পদস্থ রেস্তোরাঁ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। এদিকে পিসেমশাইয়ের রোখ চেপে যাচ্ছে ক্রমশ, আমরা বলছি পরে একদিন হবে খন, আবার বেরুনো যাবে, কিন্তু পিসেমশাই পিসি বলছেন, না এর শেষ না দেখে ছাড়ব না। 

শেষমেশ বাড়ির কাছাকাছি ফিরে আসা হচ্ছে, পূর্ণর মোড়ের সাঙ্গুভেলি রেস্তোরাঁর দিকে চোখ পড়ল। ট্যাক্সি থেকে নেমে পড়া হল । জিজ্ঞাসা করে জানা গেল খাবার হবে। তখন নটা পেরিয়ে গেছে। কোথাও খাবার পাওয়ার আশা প্রায় তলানিতে। সাঙ্গুভেলি একদা অতি নামী কিন্তু আপাতত সত্তর আশির দশকে পড়ন্ত দশার রেস্তোরাঁ, কোনদিন আমরা ঢুকিও নি সেখানে। পিসিও না। 

বেশ অনেক টা সময় বসার পর যে গরম গরম চাইনিজ খাদ্যটি এল তা যেন অমৃত!!! আমরা অবাক। কী উচ্চমানের, ফ্রেশ রান্না করে দেওয়া চাউমিন চিলি চিকেন, ফ্রাইড রাইস সুইট অ্যান্ড সাওয়ার ( এটাই ছিল আমাদের ফেভারিট কম্বিনেশন, চিনে রেস্তোরাঁয়) এল থরে থরে। সারাসন্ধে ঘুরে আমাদের খিদেও তখন চনমনে। বাইরে ঝড় বৃষ্টি  থামা শীতল কলকাতা। আমরা গবগবিয়ে ধ্বংস করলাম সব সুখাদ্য। হয়ত না পাওয়ার হতাশার পটে ওই প্রাপ্তিটুকুই খাবারের স্বাদ শতগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সাঙ্গুভেলি আমাদের চোখে সেই থেকে জাতে উঠে গেল… 

ফেরার সময় হেঁটে , পূর্ণ থেকে আমাদের রাণীশংকরী লেনের গলি । পিসিরা আমাদের বাড়ি পৌঁছে  দিয়ে নিজেরা হেঁটে ফিরে গেলেন মনোহরপুকুরের বাড়িতে। সেই চাউমিন চিলিচিকেনের স্বাদ সারাজীবনে খাওয়া অন্য সমস্ত “বাইরে খাওয়া”কে মাইল মাইল পেছনে ফেলে এখনো মনের ভেতর শ্রেষ্ঠ আসনে বসে আছে।

১ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন 
২ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন  
৩ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন
৪ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন
৫ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন
৬ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন
৭ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন
৮ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন
৯ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন
১০ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন
১১ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন
১২ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন
১৩ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন
১৪ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন
১৫ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন
১৬ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন
১৭ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

১৮ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

১৯ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

২০ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

২১ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

২২ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

সাম্প্রতিক পোষ্ট
সাড়ে চুয়াত্তরের কেদাররূপী ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের “মাসিমা মালপোয়া খামু” র অনবদ্য হ্যাংলামো আমাদের ভেতরে স্বতঃজাগরূক। ওটা সহজেই মাসিমা আইচকিরিম খামু হতে পারে… সারাজীবনে কতবার যে চেয়েছি সেটা।

হারিয়ে যাওয়া ফেরিওয়ালারা- যশোধরা রায়চৌধুরী

Read More »
কাজী নজরুল ইসলাম ও একটি নির্বাচনী লড়াই। নির্বাচনের প্রাক্কালে এক শ্রেণির মুন্সি-মৌলভীরা কবিকে কাফের অপবাদ দিতে শুরু করল। ভোটের লড়াইয়ে মরিয়া কবি তখন এর জবাবে ইসলাম ধর্ম ও ঐতিহ্যকে ভিত্তি করে প্রচুর গান, গজল ও কবিতা রচনা শুরু করলেও তেমন সুবিধা হল না।

৩০ মে, ২০২১ , রবিবার কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও

Read More »