৩০ মে, ২০২১ , রবিবার

কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও একটি নির্বাচনী লড়াই
এইচ.এম.এ.হক
এইচ.এম.এ.হক

অর্ধ-সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ধূমকেতু‘-তে নিজের লেখা কবিতা ‘আনন্দময়ীর আগমনে‘ এবং এগার বৎসরের বালিকা লীলা মিত্রের লেখা ‘বিদ্রোহীর কৈফিয়ৎ’ প্রকাশের অপরাধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলায় এক বৎসরের সশ্রম কারাদন্ড ভোগ করে ১৯২৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর মুক্তি পান কবি কাজী নজরুল ইসলামের। এরপরই রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯২৪ সালে হুগলিতে মহাত্মা গান্ধীর সাথে সামনাসামনি পরিচয় হয় নজরুলের। গান্ধীজীর আগমন উপলক্ষ্যে তিনি গান ও কবিতা রচনা করেন। তবে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা প্রসংগে আলাদা ধ্যান-ধারণা থেকে কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২৫ সালে কুতবুদ্দীন আহমদ, হেমন্ত কুমার সরকার ও শামসুদ্দীন হুসাইনকে সাথে নিয়ে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অন্তর্ভুক্ত দ্য লেবার স্বরাজ পার্টি অফ দ্য ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস গঠন করেন। কাজী নজরুল ইসলামের স্বাক্ষরে দলটির প্রথম ইশতেহার প্রকাশিত হয়েছিল। দলের মুখপত্র হিসেবে ‘সাপ্তাহিক লাঙ্গল’-এর প্রধান পরিচালকও ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। দলটির বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে তিনি সারা বাংলায় ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। অধিকার বঞ্ছিত-নিপীড়িত সাধারণ মানুষকে রাজনৈতিক ভাবে সচেতন করতে বিভিন্ন সম্মেলনে ভাষন, গান, কবিতা আবৃত্তি করতেন। দেশমাতৃকার স্বাধীনতা অর্জনে তরুনদের উৎসাহিত করতে এবং মুক্তি অর্জনের শক্ত ভিত তৈরির উদ্দেশে কবি ১৯২৬ সালে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক পরিষদে ঢাকা বিভাগে মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত আসনের নির্বাচনে প্রার্থী হলেন। নির্বাচনে অংশ নেবার ব্যাপারে কবির ঘনিষ্ঠ বন্ধু ভারতীয় উপমহাদেশে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত এবং তৎকালীন বাংলায় কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা কমরেড মুজফ্ফর আহমদ সহ অনেকে নিষেধ করলেও  তা কানে তোলেননি কবি। স্বরাজ পার্টির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে আর্থিক সহযোগিতা পাবার সম্ভাবনা এবং ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা দিয়ে ভোটে ইতিবাচক ফলাফল অর্জনের আশায় কবি মূলত নির্বাচনে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। 

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের রাজনৈতিক আদর্শে প্রভাবিত রাজনীতিবিদ, তৎকালীন স্বরাজ দলের নেতা ডা: বিধানচন্দ্র রায়ের (পরবর্তীকালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী ও ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ভারতরত্নে ভূষিত) দেয়া তিনশত টাকা নিয়ে নির্বাচনের কাজে নেমেছিলেন। নির্বাচনে ঢাকা বিভাগের অর্ন্তভূক্ত ছিল ঢাকা, ফরিদপুর, বরিশাল ও ময়মনসিংহ মহাকুমা। সে সময়ে শুধু সম্পত্তির ভিত্তিতে ভোটার হওয়ার নিয়ম থাকায় এই বিরাট এলাকা নিয়ে গঠিত আসনে মোট ভোটার ছিল ১৮,১১৬ জন। বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সীমিত ভোটাদের কাছে যৎসামান্য টাকায় নিজের নামটুকু পৌঁছে দেয়াই ছিল দুঃসাধ্য ব্যাপার। ডা: বিধান চন্দ্র রায় নজরুলের উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব ও ভাবমূর্তিকে ব্যবহার করে নির্বাচণের বৈতরণী পার হতে চেয়েছিলেন বটে, কিন্তু নবীশ এ প্রার্থীকে লড়াইয়ে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও লোকবলের পর্যাপ্ত কোন ব্যবস্থাই রাখেননি। অপ্রতুল দলীয় তহবিল নিয়ে নির্বাচনের মাঠে নজরুল ইসলাম বেশ অসঙ্গতিতে পড়ে অবশেষে নিজের পকেটের টাকা খরচ করে নির্বাচনী প্রচারনা চালাতে বাধ্য হন। নির্বাচনে কবি বাদে বাকি প্রার্থীরা ছিলেন মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন চৌধুরী (বরিশালের জমিদার), আবদুল হালিম গজনবী (টাঙ্গাইলের জমিদার), ঢাকা নবাব বাড়ীর খাজা আবদুল করিম ও তমিজ উদ্দিন আহম্মেদ। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের বেশীর ভাগই প্রভাবশালী ও অবস্থাপন্ন হওয়ায় স্থানীয় নেতাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেও কবি প্রচারণায় তেমন কাউকে পেলেন না। 

আর্থিক অসংগতি আর প্রতিপত্তির সাথে অসম লড়াইয়ের পাশাপাশি দেখা দিল নতুন এক সমস্যা। নির্বাচনের প্রাক্কালে এক শ্রেণির মুন্সি-মৌলভীরা কবিকে কাফের অপবাদ দিতে শুরু করল। ভোটের লড়াইয়ে মরিয়া কবি তখন এর জবাবে ইসলাম ধর্ম ও ঐতিহ্যকে ভিত্তি করে প্রচুর গান, গজল ও কবিতা রচনা শুরু করলেও তেমন সুবিধা হল না। তখন অনেকেই কবিকে ভোটে জিততে ফরিদপুরের প্রভাবশালী পীর বাদশাহ মিঞার কাছ থেকে নজরুলের পক্ষে ভোট দেওয়ার ফতোয়া বা নির্দেশনা আনতে বলেন। সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদের বিরুদ্ধে নজরুল ছিলেন চিরবিদ্রোহী। কিন্তু লড়াইয়ের ময়দানে প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করতে অনন্যোপায় কবি পীরের সাথে দেখা করে ফতোয়া সংগ্রহ করতে রাজি হন। পীর বাদশাহ মিঞা নজরুলের পক্ষ সমর্থন করে প্রদত্ত বাণীটি ছিল নিম্নরূপ-

‘বাংলার শ্রেষ্ঠ বীর, আলেম সমাজের পয়গাম ঢাকা বিভাগের ভারতীয় ব্যবস্থাপক পরিষদের মুসলমান ভোটারদের প্রতি’-

“নজরুল ইসলাম নির্ভীক সত্যদর্শী সর্বজনপ্রিয় যুবক। তিনি দেশের জন্য, জাতির জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করিয়াছেন এবং দীর্ঘদিনের জন্য কারাবরণ পযর্ন্ত করিয়াছেন। তাঁহার অনেকগুলি পুস্তক গভর্মেন্ট কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হইয়া গিয়াছে। সাহিত্যজগতে তিনি বাংলা দেশের মুসলমানদের গৌরব রক্ষা করিয়াছেন। একমাত্র তাঁহার লেখা দেখাইয়া দিয়াছে যে বাংলার মুসলমান সাহিত্য চর্চা করিয়া বিশ্ব সাহিত্য দরবারে আসন পাইতে পারে। আশা করি মুসলমানগন জনগনকে দেখাইয়া দিবেন যে বাংলার মুসলমানও তাঁহাদের জাতীয় কবির এবং তাঁর বিদ্যার ও গুণের কদর করিতে পারে। আর যদি… তবে জগতের লোক হাসিবে ও ধিক্কার দিয়া বলিবে যে, বাংলার মুসলমান বিদ্যা ও গুণের কদর করিতে জানে না। অতএব, আশা করি, আপনারা এমন কাজ করিবেন না যাহাতে লোক হাসিতে পারে। তাঁহাকে দিয়া দেশের ও ইসলামের অনেক খেদমত হইবে। আমার মুরিদানদের প্রতি আমার অনুরোধ তাহারা যেন কাজী সাহেবকে জয়যুক্ত করেন।”

এত সব বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও নির্বাচনে জয়ের বিষয়ে প্রচন্ড আশাবাদী কাজী নজরুল ইসলাম ফরিদপুর নিবাসী পল্লী কবি জসিমউদ্দিনকে বলেছিলেন “ঢাকায় আমি শতকরা নিরানব্বই ভোট পাবো। তোমাদের ফরিদপুরের ভোট যদি আমি কিছু পাই তাহলে কেল্লাফতে।” ভোট গ্রহনকালে জসীমউদ্দীন কবি নজরুলকে ভোট প্রাপ্তির আশায় একটি ভোটকেন্দ্রে পোলিং অফিসারের কাছে বসিয়ে দেন। যেন ভোটারগণ নজরুলকে দেখে তাকে ভোট দিতে আগ্রহী হয়। ভোট গ্রহন শেষে নজরুল ইসলাম জসীমউদদীনকে জানিয়েছিলেন যে, ভোটারদের মুখ দেখেই তিনি বুঝতে পেরেছেন যে তাঁকে অনেকেই ভোট দিয়েছেন। তবে ভোটের ফলাফলে দেখা গেল, পাঁচজন প্রার্থীর মধ্যে কবি ১০৬২ ভোট পেয়ে চতুর্থ স্থান অধিকার করেছেন। জামানত বাজেয়াপ্ত হবার পরে কবি বুঝেছিলেন ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাই নির্বাচন জয়লাভের একমাত্র হাতিয়ার নয়। ভোটের ফলাফলে পরাজিত হলেও নির্বাচনে কবির অংশগ্রহণের রাজনৈতিক ফলাফল ছিল অত্যন্ত সুদুরপ্রসারি। সকল শ্রেনী-পেশার মানুষকে রাজনীতিমূখী করতে ও তরুন প্রজন্মকে নেতৃত্বে আগ্রহী করতে কাজী নজরুল ইসলামের এ পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে ভীষন তাৎপর্যপূর্ন ছিল। 

সাম্প্রতিক পোষ্ট
বর্ষা , উমামাসি আর প্রেমের গপ্পো- হারিয়ে যাওয়া গানের খাতা- যশোধরা রায়চৌধুরী

জল ঠেলতে ঠেলতে দিন কেটে যায় তবু… রোমান্স মরে গেলেও, ওই কাদা জল
ঘেঁটেই চলি তারপর। বাজারে দোকানে যাওয়া… ফিরে আসা হাঁটুজলে। এসে পায়ে
দেখি কার চিঠি লেপটে আছে।

Read More »