৩০ মে, ২০২১ , রবিবার

অসামান্য জীবনবোধের রূপকার বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত
তৈমুর খান
তৈমুর খান

মামা সমরেন্দ্র সেনগুপ্তের সান্নিধ্যেই কবিতায় হাতে খড়ি বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের(জন্ম:১৯৪৪)। কৃত্তিবাসের কবি সমরেন্দ্র সেনগুপ্তই তাঁর প্রেরণা। মাত্র ১৪ বছর বয়স থেকেই নানা পত্রপত্রিকায় তাঁর কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে। কিন্তু কৃত্তিবাসে কবিতা প্রকাশিত হতে থাকলে শক্তি-সুনীলের পরবর্তী কবিতা ধারার নতুন ভাষা অন্বেষণ করার সুযোগ পান। একে একে প্রকাশিত হয়: গভীর এরিয়েলে, কফিন কিংবা স্যুটকেস, হিমযুগ, রোবটের গান, ভোম্বলের আশ্চর্য কাহিনী ও অন্যান্য কাহিনী, ছাতাকাহিনী, উঁকি মারে নীল আর্মস্ট্রং প্রভৃতি ভিন্নরীতির কাব্যকুসুম।

কবিতার পাশাপাশি সিনেমাতেও ভিন্নপথের সন্ধান পেলেন মামার সূত্রেই। ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনে সত্যজিৎ, মৃণাল, চিদানন্দদের সঙ্গী ছিলেন মামা। স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের কাছাকাছি আসার সুযোগ ঘটল। প্রেরণা পেলেন ছায়ালোকের মায়াভুবনে। তথ্যচিত্র পরিচালকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। অন্তর্লোকের ভাষা প্রতিফলিত হল ছবিতে। একে একে পরিচালনা করলেন: দি কন্টিনেন্ট অফ লাভ(১৯৬৮), ঢোলের রাজা ক্ষীরোদ নট্ট(১৯৭৩), ফিশারম্যান অফ সুন্দরবন(১৯৭৪), দি কিং অফ ড্রামস(১৯৭৪)। ‘দি কিং অফ ড্রামস’ শ্রেষ্ঠ তথ্যচিত্রের জাতীয় পুরস্কার পেল। ১৯৭৫-তে এসে নির্মাণ করলেন কথা সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে একটি তথ্যচিত্র ‘শরৎচন্দ্র’। এরপর থেকেই শুরু হল পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছায়াছবি পরিচালনা। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গল্প ‘দূরত্ব’ নিয়ে কলকাতার মধ্যবিত্ত পরিবারের সমসাময়িক নানা সংকট ও শূন্যতাকে তুলে আনলেন। দক্ষ হাতে তা পরিচালনা করে বুঝিয়ে দিলেন নিজ দৃষ্টিভঙ্গির গভীরতা।১৯৭৮-তে মুক্তি পেল এই ছবি। বাঙালির কাছে তা সমীহ আদায় করে নিল। পরবর্তী ছবিগুলো হল: নিম অন্নপূর্ণা, শীত-গ্রীষ্মের স্মৃতি, গৃহযুদ্ধ, বাঘবাহাদুর, ফেরা, অন্ধিগলি, তাহাদের কথা, চরাচর, উত্তরা, লাল দরজা, আমি ইয়াসিন ও আমার মধুবালা, মন্দ মেয়ের উপাখ্যান এবং সাম্প্রতিক ‘টোপ’ ও ‘উড়োজাহাজ’। প্রতিটি ছবিতেই তাঁর নিজস্বতা ফুটে উঠল। বিষয় বৈচিত্র্যে বহুমুখী ব্যঞ্জনার প্রশ্রয় পেল সেগুলি। আত্মিকসংকট থেকে আত্মঅন্বেষণ, দগ্ধচৈতন্যের হাহাকার, মানুষের সামাজিক অবস্থান ও আইডেন্টিটির ক্রাইসিস ফুটে উঠল। মানবিক সম্পর্কের অবক্ষয়ও প্রতিফলিত হল। অর্থনৈতিক শোষণের প্রেক্ষাপট মনন দক্ষতায় রূপ দিলেন। এক একটা ছবিও যেন কবিতার ভাষা পেয়ে গেল। প্রতিটি চিত্রকল্পই নিজস্বতা অর্জন করল। লোককথা তথা লোকফর্মেরও প্রচলন ঘটালেন ছবিতে। ফলে মানুষের আচার সংস্কৃতির সঙ্গে জীবনের গভীর ব্যঞ্জনায় সেগুলি উচ্চারিত হল। আবার ম্যাজিকরিয়ালিজম ও সুররিয়ালিজমের বা পরাবাস্তবতার ব্যবহারেও একটা ভিন্নজগতের সন্ধান পেল দর্শক। কবিতা এবং সিনেমা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ হয়ে উঠল।

ষাটের দশকে বাংলা কবিতার যা বৈশিষ্ট্য তাতে বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত নিজেকে সম্পূর্ণভাবে আলাদা করে তুলতে পেরেছিলেন। তাঁর কবিতার কথনভঙ্গিই বলে দেয় বাংলা ভাষায় তা কতটা নতুন স্টাইল। সিনেমা ও কবিতায় তিনি সেই ভাষারই খোঁজ করেছিলেন। প্রথমত তিনি সময়কে নিয়েই বেশি ভেবেছিলেন। অর্থাৎ সময়ের কী চাহিদা ছিল, সময়ের কী স্বর ছিল, কেমন অভিক্ষেপ দরকার তা তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। আবার এই সময়ের উত্তরণও তিনি চেয়েছিলেন সুররিয়ালিজমের মাধ্যমে। সময়ের কাছেই তিনি মানুষের সামাজিক ও পারিবারিক অবস্থান, মানুষের দেশকাল অর্থনীতির অবস্থাও অনুধাবন করেছিলেন। তিনি বরাবরই গদ্য ভাষায় কবিতা লিখলেও ছন্দের লয়-মাত্রায় অসম্ভব দক্ষতার প্রয়োগ করেছেন। পয়ার ভাঙা আবার বিনির্মাণ করার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে ছিলেন না। ছবি তৈরির আবহাওয়া থেকে যে শূন্যতা ও স্তব্ধতা তিনি নিয়ে আসেন তা কবিতারই বিষয়। স্বপ্ন আর বাস্তবের মধ্যে যেমন একটি সেতু তৈরি করে দেন, তেমনি লৌকিক ও অলৌকিকতার মধ্যেও। ঘটনাক্রমের উপস্থাপনায় মাঝেমাঝেই ‘ম্যাজিক’ এসে পড়ে। এই ম্যাজিকই কবিতাতে ম্যাজিকরিয়ালিজমে পরিণত হয়।

আত্মস্থাপনের জন্য কবিতায় বারবার কবির আকুতি জেগে উঠেছে। ‘গভীর এরিয়েলে’ প্রকৃতির অন্তরালে কবি স্তব্ধতার কাছে পৌঁছাতে চেয়েছেন তা স্পষ্ট। ‘ন্যুব্জদেহে বনতলে চলে যাবো, আমি ওই বনতলে তৃণের উপর’ বলে কবির প্রত্যয় ও সংকল্প জাগরিত হয়েছে। হয়তো এই স্তব্ধতা থেকেই কবির পুনরুত্থানও ঘটবে। চেতনা জেগে উঠবে। এই স্তব্ধতা মৃত্যু নয়, মৃত্যুর মধ্যেও অবিমিশ্র এক অনুধাবন। আমেরিকান লেখক হেনরি মিলারেরও এই বোধ জেগে উঠেছিল। ক্যান্সারের ট্রপিক লিখতে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন:

“I need to be alone. I need to ponder my shame and my despair in seclusion; I need the sunshine and the paving stones of the streets without companions, without conversation, face to face with myself, with only the music of my heart for company”.

(Henry Miller, Tropic of Cancer)

অর্থাৎ আমার একা থাকা দরকার আমার নির্জনে আমার লজ্জা এবং হতাশার বিষয়ে চিন্তা করা দরকার; আমার সঙ্গীবিহীন রোদ এবং রাস্তাগুলির সঙ্গীবিহীন প্রস্তর দরকার, কথোপকথন ছাড়াই, নিজের মুখোমুখি নিজেই, সঙ্গী কেবল আমার হৃদয়ের সংগীত।

এটাই তো একজন কবির ব্যাপ্তিময় স্বয়ংক্রিয় যাপনের পদ্ধতি। তাই স্তব্ধতার ভেতর সূর্যাস্ত ও সমাধির শুভ্রতা এক ধ্যানতন্ময়তার প্রেক্ষণ দান করে। কবি যে বিরাট আত্মাময় আত্মসমগ্রের বিন্যাসে অবগাহন করেছেন তা বলাই যায়। আবার নিজের মধ্যে আশৈশব বেঁচে থাকার দুরন্ত পর্যায়গুলি কখনো ক্লান্ত হয় না। কিন্তু সময়ের তফাতে তা দুর্গম এবং সামাজিক সঙ্কুলে ভর্তি। তাই কবি বলেন: ‘ক্রমশ দুর্গম হয় একদার সারল্য পীড়িত পথগুলি’। তোমার, তোমাকে সর্বনামগুলি কবির খুব নিকটজনের প্রতি সম্মোধন। এই সম্বোধন প্রেমের, আবদারের, ভালবাসার তা বলাই বাহুল্য। আর এই প্রেম প্রকৃতির অনুচারণার কল্লোলিত চিরন্তন মানবীয় প্রবৃত্তির অনুজ্ঞায় বিধৃত। কবি লিখেছেন:

“তোমাকে আমি সকল কথা বলতে পেরেছিলাম।কেননা ছুটে

উদাস মাঠে একলা আমি তোমায় দেখেছিলাম।

বলেছিলাম, সকাল হলে রৌদ্র আমায় ভালবাসতো

ফুল কুড়োতে যেতাম আমি পাহাড়তলির বনে, ঝর্ণা আমায়

কাছে ডাকতো, বুকে রাখতো হাত;

বিকাল হলে আঙিনা জুড়ে মেঘ আসতো নেমে

আমি এক এক করে তাদের নাম ডেকে

কাটিয়ে দিতাম বেলা, আমার গঠিত সারাবেলা—

আঁধার হলে শিরীষ গাছ ভেঙে পড়তো পিঠে। অসংকোচে তোমাকে আমি এসব বলেছিলাম, কেননা, জ্যোৎস্না বাঁকানো গ্রীবা

উদাস মাঠে তোমাকে ঘিরেছিলো।”

(তোমাকে আমি)

এই মানবীয় বোধে প্রকৃতি যে সম্মোহন নিয়ে উপস্থিত হয়েছে তাকে কি বাদ দেওয়া যায়? যায় না বলেই কবি যে সম্পর্ক ও টান উপলব্ধি করেছেন তাতে তো সেই পূর্ণ রক্ত-মাংসেরই স্পন্দন উঠেছে। বর্ণনায়, সৌন্দর্যে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সঞ্চালনায় সময় নিরীক্ষণের পর্যাপ্ত অভিরূপ প্রকাশিত হয়েছে। ‘উনিশশো নব্বই’ সময়ের চমৎকার উপস্থাপনা মানবীয় গরিমাতেই আলোকিত। বাংলা কবিতায় এই বোধ আমার প্রথম বলেই মনে হয়। কবির বর্ণনায় ধরা পড়ে:

“ক্রমে যায় সুদূর মেধার থেকে সেও সরে যায়।

তার বাহু তার বুক নাভি ঊরুদেশ প্রচণ্ড শুভ্রতাসুদ্ধ

সরে যায়

ক্রমশ বুকের থেকে বুকের ওপরে ক্রমশ মেধার থেকে

মেধার ওপরে তার বাহু তার চোখ কণ্ঠার নির্জন

দেখা যায়, ক্রমে যায় যায়….”

সময় যে শুধু মেধা নয়, বাহু বুক নাভি ঊরুদেশ সরে গেলেও তবু বুকের মেধার ওপরে বাহু ও চোখ এবং কণ্ঠার নির্জন দেখা যায়। এই নির্জনতা দৈহিক মায়ামোহ থেকে আলাদা। মেধারও ভিন্নমাত্রায় উন্নীত করা এক প্রাখর্য নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। কবি বুঝতে পেরেছেন নব্বই দশকের প্রাচুর্যে বিন্যস্ত সেই আবহাওয়ার গভীর তাৎপর্যকে। তাই এক জায়গায় বলেছেন:

“ভালোবাসার সাথে হ’ল দেখা

এখন সন্ধেবেলা।”

আমাদের অস্তিত্ব ঘিরে এই ভালোবাসার নার্সিসাস উচ্চারণই সময়ের নিদর্শ স্বরূপ। তাই বাহির নয়, অন্তরিক্ষেরই পর্যায়। আমাদের নিজের সঙ্গে নিজেরই দেখা হওয়া। হেনরি মিলারের মতোই “face to face with myself, with only the music of my heart for company”. মনে রাখতে হবে বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত এমন এক কবি যিনি সর্বদা অন্তর্দৃষ্টিকে বাহিরের আলোয় মেলে দিতে চেয়েছেন। বাহিরকে অন্তরের উঠোনে বসতি করে দিয়েছেন। ‘কফিন কিংবা স্যুটকেস’ কাব্যেও সত্তর দশকের উত্থান-পতনে বৈপ্লবিক কেতনের তলায় বসে তিনি কবিতা লিখেননি। অস্থিরতার মধ্যেও নিজস্ব সময়কে যাপন করেছেন। নিজেকে তৈরি হওয়ার জন্য সতর্ক করেছেন:

“তৈরি হও তুমি তোমার ওই কাঠের অফিসঘরের ভেতর

বেড়ে ওঠার জন্য, কেননা পাগলের মতো

আজ বাতাস বইছে এলোমেলো এই পুরনো শহর জুড়ে

বহুদিন এর মধ্যে শরীর ডুবিয়ে রেখে

হঠাৎ

তুমি হেসে উঠলে নিজের জন্য ঘৃণায় ও করুণায়,”

(তৈরি হও)

একইসঙ্গে ঘৃণা ও করুণায় হেসে ওঠার মধ্যে দিয়েই ভালোবাসার দুর্ভোগ, দুশ্চিন্তা, শুকনো ঠোঁট প্রভৃতি বিসর্গের ভেতর দিয়েই অগ্রসর হয়েছেন, আর আগামীর জন্য সান্ত্বনাও পেয়েছেন: ‘তুমি ভুলে যাবে, ভুলে যাবে এইসব, এই অদ্ভুত সময়’। সত্যিই সেটা ‘অদ্ভুত সময়’। কেননা কফিন কিংবা স্যুটকেস যেকোনো একটা বেছে নিতে বলা হয়েছিল। একদিকে মৃত্যু, অন্যদিকে দেশান্তর; একদিকে যুদ্ধ, অন্যদিকে পলায়ন। সেই ইতিহাসেই ব্যক্তিজীবনের অন্বয় থেকেই তিনি আত্মবীক্ষণের পাঠ নিয়েছেন।

‘হিমযুগ’ সত্তর দশকের দোলাচলে অন্ধকারাচ্ছন্ন আর এক পরত। স্বাভাবিকভাবেই কবির বোধ গর্তচারী, ক্ষুদ্র পৃথিবীর অধিবাসী হয়ে ওঠে। এখানে কবি বলেন:

“আমাদের আগামী যে দিন সেও ঠিক আসে না কখনো”

কিন্তু দিন না এলেও ভোর আসে, অর্থহীন বোঁচা কালো ভোর। প্রেমকে তখন ভয়ার্ত হাতের আঙুলেই জড়িয়ে ধরেন। আত্মগোপনের বিষাদে পিঁপড়ে হয়ে যান। সেইসব দিনে যখন কলকাতাও কৃত্রিম ছন্দে মেতে উঠছে; চিৎকার আর সার্কাসের দাপটে ক্রিয়াপদের টুকরো টুকরো শরীর উড়ে যাচ্ছে;সুতানুটির রাখাল ছেলের শরীর রাস্তা খুঁড়ে খুঁড়ে উপড়ে আনছে আর আগামী পরিকল্পনার স্টাম্প পড়ছে—তখনও কবির আশ্চর্য পৃথিবীর অন্বেষণ। সেখানে আমরা পেয়ে যাই অদ্ভুত সুন্দর চোখের মাগুরমাছদের। পিচ্ছিল মাগুরমাছদের স্বতশ্চলতা আমাদের বিস্মিত করে। মাগুরমাছের রূপক তো আসলে মানবচরিত্রের দর্শনেই প্রতিফলিত। কবি বলেন:

“অদ্ভুত শিস দিতে দিতে

মাগুরমাছেরা সারারাত এ-ঘর ও-ঘর করে

আর খুঁজে বেড়ায় সেই শান্ত সুন্দর বৌকে।”

(মাগুরমাছ)

শুধু মাগুরমাছই নয়, লালপিঁপড়ে, চিনির বলদ হয়ে ওঠা জন্মবৃত্তান্তকে কবি স্মরণ করেছেন। জীবিকার রসদ যোগানোর প্রক্রিয়া থেকে পরিশ্রমী হওয়ার কাহিনিটি বুঝিয়ে দিয়েছেন। ছাত্র পড়ানো থেকে সিনেমায় পৌঁছানোর মধ্যে ব্যক্তিজীবনের নানা ছায়া উঠে এসেছে কবিতায়। নানা প্রশ্নের উত্তরও খুঁজছেন তিনি। বৈপ্লবিক অস্তিত্ব সঞ্চার ঘটেছে বন্দুকের মধ্যে। বন্দুক যেন সময়ের যুবক। লজ্জা দুশ্চিন্তা ঘৃণার মধ্যে বন্দুকের অপেক্ষা আর শক্ত হয়ে ওঠা কবি উপলব্ধি করেছেন। মেটাফোর অলংকারের মধ্যে দিয়ে জীবন ও সময়কে ধরার, ইতিহাস ও প্রাত্যহিকের মধ্যে প্রাণসঞ্চার করার প্রয়াস কবিতাগুলিতে লক্ষ করা যায়। তবে হুজুগ বা মিথ্যার প্রচারও যে ছিল না তা নয়। তেলেসমাতি কারবারের দৃষ্টান্তের মধ্যেও এক ব্যঙ্গের অভিনব ছবিও কবিতায় তুলে আনেন:

“একটা কান দেখতে চায় আর একটা কানকে।

একটা কান

বলতে চায় আর একটা কানকে

অনেক অনেক কথা।

দেখা হয় না কোনোদিনই, কথা গর্ত দিয়ে ঢুকে

অন্য গর্ত দিয়ে ছুটে যায়, শেষে

হাওয়ায় হাওয়ায় মিশে যায়। দুঃখে ও লজ্জায়

কুঁকড়ে যেতে-যেতে

কান ঝরে পড়ে, খসে পড়ে একদিন। পৃথিবীতে

শুরু হয় কানহীন মানুষের যুগ। আজ

একটা কানকাটা মানুষের সঙ্গে কানকাটা মানুষীর বিয়ে,

লম্বা হয়ে বসেছে তাদের কানকাটা বন্ধুরা, ওই

তারা কনুই ডুবিয়ে

দই খেতে-খেতে কী এক কথায়

হেসে লুটিয়ে পড়ছে,

কেঁদে, ঘুমিয়ে পড়ছে বিছানায়।”

(কান)

সত্তর দশকের বিমূঢ়তা ও গড্ডালিকা প্রবাহকে বোঝাতে চেয়েছেন। এভাবেই ডিম ও মুরগির মধ্যে দিয়ে, কাঠঠোকরা ও গাধার চরিত্রে, যান্ত্রিক সম্পর্কের ভেতর মেশিনবৌদিকে আবিষ্কার করেছেন। তারপর সাঁড়াশি, প্রেসার-কুকার, হ্যাঙ্গার প্রভৃতিকে পারিবারিক জীবনের রহস্যময়তায় প্রতীক করে তুলেছেন। কবি উপলব্ধি করেন: ‘গরম হয়ে যেতে থাকে আমাদের মাথা’ অথবা ‘বছরের পর বছর, এক জন্ম থেকে আর এক জন্ম/ ঝুলে থাকা যায়…’

শুধু পারিবারিক জীবনই নয়, নিসর্গজীবনেও আকাশের ভেঙে পড়ার বোধ জন্মায় কবির। তারারাও নিভে যায়। নদী আঁকার নকশার ভেতর তবুও কি প্রত্যয় জেগে ওঠে? বাঘ হয়ে শুয়ে থাকারই নামান্তর ছিল সেই সময়ের। আশ্চর্য সুন্দর বিশাল একটা বাঘ। বাঘের ভেতর হয়তো গর্জনও ছিল। গায়ে ডোরাকাটা ছিল। সময়কে এভাবেই ধরেছিলেন।

‘রোবটের গান’ কাব্যে রোবটের প্রশ্ন: ‘কার কাজে লাগে পদ্য? কিছু কি বদলায়?’

না, তেমন কাজে লাগে না। কিছু বদলায়ও না। তবু লেখা শুরু হয়। যেমন কেউ কাউকে না ভালবাসলেও গম্ভীর ভালোবাসার ছবি তৈরি হয়। লোকে সুখী ভাবে। নিজের জন্য নিজের মতো একটা পৃথিবী তৈরি করে নিতে পারে, তবে সেই পৃথিবীও যান্ত্রিক। লোহার পা লাগানো মানুষ। কেউ কারো খোঁজ না রাখা মানুষ। রোবটের গান মানুষের মতোই। একটা রোবটের মৃত্যু হলে আর একটা রোবটের জন্ম হয় অবিকল মানুষের মতো। লোহার পুরু চামড়া ছুঁয়ে দেখতে হয়। বিশ্বাসহীন, ভালবাসাহীন, মেধাহীন অসম্ভব স্বার্থপর রোবট। এই রোবট প্রাত্যহিকের কড়া নেড়ে জীবনের দরজা খোলে। নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্রের ভেতরে টেনে নেয়। তবু তো নিজের সঙ্গেই এক দ্বন্দ্ব চলতে থাকে:

“আমরা গলা টিপে ধরছি দু’জন দু’জনের, জিব

বের করে আনছি দু’জন দু’জনের আর

চোখের ভেতর থেকে

তীব্র নীল বিষ

ছুঁড়ে দিচ্ছি

তার দু’চোখের রক্তমণির দিকে।”

(অপেক্ষা কোরো)

নিজেকে হত্যার মতোই এই আয়োজনে মননধর্মিতার এক স্বয়ংক্রিয় অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত হয়েছে।

‘ভোম্বলের আশ্চর্য কাহিনী ও অন্যান্য কাহিনী’ এক মরমি কাব্যকথায় দীর্ঘকবিতার সম্ভার। কবির ব্যক্তিগত জীবনের ফাঁকফোকর দিয়ে আলো এসে পড়েছে। কবির বন্ধু সমসাময়িক আর এক কবি শামসের আনোয়ারকে নিয়েও লিখেছেন কবিতা। শান্ত নির্বিবাদী বিষণ্ণ অভিমানী শমসেরকে আমরা পেয়েছি। ঘন ঘন দুধ চিনি ছাড়া চা ও সিগারেটের মধ্যে ডুবে থাকতেও দেখেছি। নিঃসঙ্গ কবির মৃত্যুর মধ্যেও পলায়নবাদ ফুটে উঠেছে:

“তুমি

ট্যাক্সি করে ফিরে যাচ্ছ বাড়ি, টনটন করে উঠছে তোমার

শিরদাঁড়া, তোমার পা তুমি আর

মেলে দিতে পারছ না সামনের দিকে

আর, দ্রুত-চলা ট্যাক্সির বাইরে এই পুরনো শহর জেগে উঠে

তোমাকে জানাচ্ছে বিদায়, তোমার হাত


নড়ে উঠছে তোমার মুখের ওপর”

(আনোয়ারকে)

‘হুল্লোড়বাজ বিষণ্ণ উদাসীন কবি তিন’ নামক গদ্যেও ভাস্কর চক্রবর্তী, সুব্রত চক্রবর্তী ও শমসের আনোয়ারের কথা লিখেছেন কবি। সেখানে উল্লেখ করেছেন: “সেই সময় থেকেই ‘মা কিংবা প্রেমিকা স্মরণে’র কবি শামসের ভাবতে শুরু করল, কবিতা-ফবিতা কিচ্ছু হচ্ছে না। কী একটা খেয়ে পিজি হাসপাতালের বেডে একটানা একমাস ঘুমিয়ে থাকল, এই ঘুম থেকে নীচে নামতে নামতে, নামতে নামতে এক্কেবারে মাটির তলায় পচে গেল।”

পুলিশ এবং শুয়োরে শহর ঘিরে ফেলা সেই সময়টি কতটা বিষণ্ণতায় ও একাকিত্বে এই কবিদের বিচ্যুত করেছিল তা বুঝতে পারি। এক রহস্যময় ষড়যন্ত্র যেন চারিপাশে। ‘উকিল সিরিজ’ কবিতাতেও এই মামলাবাজ উদ্বিগ্ন সময়ের ছবিটি মারাত্মক হয়ে উঠেছে। স্বার্থপর প্রতিহিংসাপরায়ণ সেই ইতিহাস এভাবেই উল্লিখিত হয়েছে কবিতায়:

“ওগো নোংরা সময়

নোংরা জীবন

নোংরা মিষ্টির দোকান

নোংরা রাস্তার ওপর দিয়ে ছুটে চলেছে

ট্যাক্সি।

অন্ধকার উকিলের বাড়ি।”

আমরা ভুলতে পারি না মানুষের জীবন সংগ্রামের কাহিনিকে। বিচ্ছিন্নতা, হতাশা এবং নির্মমতার ছবিও। কবিতায় বলেছেন:

“সমস্ত স্তব্ধতা ভেঙে হাহাকার করে ওঠা

কিছু মানুষের স্বর

তোমার কানেও যাবে না কোনওদিন।”

(নীরক্ত করুণা)

এই নীরক্ত করুণা নিয়েই সময়ের দ্রবণ ঘেঁটে ঘেঁটে কবি অগ্রসর হয়েছেন। সম্পর্ক ভালবাসার মধ্যেও করুণার উপস্থিতিটাই হয়তো বড় হয়ে উঠেছে। তবু যে কবির এক দায় থেকেই এসেছে তা না বললেও চলে। ‘ভোম্বলের আশ্চর্য কাহিনী’ ফ্রিজের ভেতর হাত-পা মুণ্ডু নিয়ে একতাল জ্যান্ত বরফ হয়ে যাওয়া। ভোম্বলের আশ্চর্য আলো দর্শন ফ্রিজের ভেতরে তাকে টেনে নেয়। ঠাণ্ডা বেগুন, আলু ও এক ফালি কুমড়োর পাশে তার জায়গা হয়। ম্যাজিক রিয়ালিজমের মধ্য দিয়ে এই পরিণতি পাঠক কে সচকিত করে। এই আশ্চর্য আলোর জন্য শুধু ভোম্বলই নয়, কবিকেও আয়নার মধ্যে ঢুকে পড়তে হয়েছিল। সে এক সুখের জন্যই পদ্য লেখা এবং সিনেমা করাও। হাসিমুখের গম্ভীর মানুষ এবং পদ্যকে গিলে খাওয়া সিনেমা। আয়নার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসার ইচ্ছাও প্রবল হয়েছে। তখন মাথা গরম হয়ে গেছে। শরীরে টগবগ করে ফুটতে শুরু করেছে রক্ত। দাঁত কিড়মিড়। আয়নার ভেতর বাহিরে রিয়ালিজম আর ম্যাজিকরিয়ালিজমের সংঘাত। পদ্য আর ক্যামেরার মাধ্যমেই সেগুলি প্রতিফলিত।

‘ছাতাকাহিনী’তেও বাস্তব চেতনার অভিজ্ঞতায় ‘লালুবাবু’র মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে:

“কবিতা কবিতার জন্য, সিনেমা সিনেমার জন্য,

মেয়েমানুষ পুরুষমানুষের জন্য, কিংবা

মেয়েমানুষে ক্লান্ত হ’য়ে গেলে পুরুষমানুষ

পুরুষমানুষের জন্য, টেলিফোন কথা বলার জন্য,

ধুলো বন্দুকের ওপর জমে থাকার জন্য।”

(লালুবাবু)

কার্যকারণের নিদর্শনগুলি নতুন করে কবিতায় এল। মানুষের জটিল জীবনকাহিনিও ধূমায়িত হল। স্বকীয়া পরকীয়া হল। পরকীয়া স্বকীয়া হল। ‘ছাতাকাহিনী’ আড়াল আনলো, আবার প্রকাশিতও হল। বহু ছাতার ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া ছাতা খুঁজতে লাগল অন্য ছাতাকে। তারপর ছাতাও একদিন উদোম শরীরে বৃষ্টিতে ভিজল। সম্পর্ক ও মান-অভিমানের জীবনরসায়নে এক রূপকোচ্ছল রসময় ‘ছাতাকাহিনী’র বাতাবরণ কবিতার ভিন্নতা দাবি করে। এর কথনভঙ্গির সঙ্গে রসিকতার অপূর্ব মেলবন্ধন বেশ অনাস্বাদিত। কবি নিজেই এই কবিতা সম্পর্কে বলেন:

“লেখো, যেভাবে খুশি, একটা কবিতা। যে-কোনোভাবেই হোক,

অন্তত আট বা ছ-লাইন কিছু একটা লেখো।

যে-কোনো জিনিসই ঢুকিয়ে দেওয়া যায় কবিতার ভেতর। শুধু

শুধু প্রকাশ কোরো না

রক্ত ঝরে পড়ার গোপন কথা।

লেখো।”

(ওই)

কবিতার নাম ‘ওই’, চরিত্ররা শার্ট প্যান্ট পরা ভূত। স্থানের নাম ভুতুড়েপাড়া। তাদের কফি দেওয়ার কথাও বলেছেন। এই কাব্যে থকথকে ঘুম, থুতু ছিটিয়ে ভেজানো ভাড়াটে মানুষের মুখ, লোহার স্বর্গ, বরফের মতো ঠাণ্ডা হাত, আয়নার ভেতর থেকে এগিয়ে আসা থাপ্পড় সুররিয়ালিজমের ভাষা হয়ে ওঠে। একটা স্বয়ংক্রিয়তার অভিরূপ ইমেজারি পাঠককে নতুন অভিজ্ঞতা এনে দেয়। পাখি, হাতি, আরশোলা, চুরুট প্রভৃতি কবিতাগুলিও এই পর্যায়ের। রহস্যময় ছবির ভেতর এক নব উত্থানের সংবাদ প্রতিটি কবিতা। স্মৃতির ভেতর, প্রাত্যহিক জীবনযাপনের ভেতর আমাদের যে গোপন উড়ান আছে, আশ্চর্য বারান্দা আছে, মোহময় শাদা বিছানা আছে, ইচ্ছা ও অনিচ্ছার সিঁড়ি আছে—কবি সেগুলিকেই গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। আমাদের চোখের সামনে শাদা দেওয়ালের নড়ে ওঠাও আছে। তেমনি নীলাকাশ মহাকাশ গ্রহ-নক্ষত্র পৃথিবীও। আমরা জীবনকে তবু এভাবেই উপলব্ধি করি:

“সকালবেলা

হাজার হাজার টবের ওপর স্তব্ধ হ’য়ে ফুটে থাকি আমরা।

দিন যায়।”

(ফুল)

আবার আমরা ঝরেও যাই। কবি দার্শনিক হয়ে ওঠেন। সব রহস্যময়তা ভেদ করে আপন প্রাণের কাছে দাঁড়িয়ে মহাজীবনের অন্বয়কে এড়াতে পারেন না।

‘উঁকি মারে নীল আর্মস্ট্রং’ কাব্যে রাষ্ট্র ও সমাজের হানাহানি, অনুন্নয়ন, বেকারত্ব, দারিদ্র্য, স্মাগলিং, বন্যা প্রভৃতি নব্বই দশকের সেই দিশাহীন জীবনের ছবি ভেসে উঠেছে কবিতায়:

“পুরুলিয়ার হাসপাতালে

মাটিতে রোগীর পাশে শুয়ে আছে কুকুর,

চারমাস মাইনে পায়নি বলে

ব্ল্যাকবোর্ডের ওপর

পেচ্ছাপ করে দিচ্ছে হারুমাস্টার,

বসিরহাটের নির্মল

এম-এ পাশ করে সাত বছর চাকরি না পেয়ে

গলায় দড়ি লটকে সটকে পড়েছে,

মুর্শিদাবাদে

এক বুক জলে দাঁড়িয়ে আছে রফিকুল সাত দিন,

তার পাশে দিশাহারা সাপ

বন্যায় ভেসে গেছে আমিনার শব।”

(নন্দনমেলা)

আমরা দেখেছি সেই চিরপরিচিত রাজনৈতিক নেতাদের। গ্রামদখল, বুথদখলের কাহিনিও। তারপর রাজনৈতিক দাঙ্গা-হত্যার ঘটনাও। এই কাব্যে তা প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। নন্দনে কবিতাপাঠের প্রসঙ্গও এসেছে। জীবন ধূসর হয়েও এক নতুন মহিমায় স্বাধীনতা পেয়েছে। জীবনের দুঃখ-সুখগুলো একে একে বলতে পারার ক্ষমতা এসেছে। কিন্তু এত মৃত্যুময় সভ্যতা, রক্তারক্তি, ভাঙাভাঙি আদর্শের কারবার কবি দেখেছেন যা থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখতে পারেননি। গল্পগুলিও সেভাবেই তৈরি হয়েছে। টিভির সিরিয়াল বাস্তবের মুখোমুখি হয়েছে। সমকামিতা, ধর্ষণ ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। সব মিলিয়েই কবিতা হয়ে উঠেছে জীবনের গল্প। আচরণের ধর্ম এবং অলৌকিক এক মুক্তির দিশারী। প্রথম যৌবনের ঘোড়া যখন এই পুরুষ তখন কবি লেখেন:

“একটি ঘোড়ার জন্য বসে থেকে থেকে

একটি পুরুষ ঘোড়া বুড়ো হয়ে যায়। সূর্য

ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে

শেষে আকাশের গায়ে মুছে গেলে

পুরুষ ঘোড়াটি

পুরোনো দিনের কথা ভাবে,

যখন বয়স ছিল তার। যখন বিচুলি, ঘাস

বস্তা বস্তা ছোলা খেয়ে দৌড় শুরু হতো

আর সেই দেখে হেসে ঠেস দিয়ে

যুবতী ঘোড়ারা ঢলে যেত একে একে

নিজেরাই নিজেদের গালে।”

(জীবন)

তারপর তার বয়স ঢলে পড়লে ঘোড়াটি তখন দার্শনিক হয়ে যায়। তখন তার ভাবনারও পরিবর্তন ঘটে:

“বুড়ো ঘোড়া জানলার পাট খুলে

ঘরের ভেতর উঁকি মারে, দ্যাখে

তার মাদী ঘোড়া কাদা হয়ে গ্যাছে

কাল ঘুমে।

জীবন শুধুই কাদা কাদা—এই বলে

বুড়ো ঘোড়া আকাশে চাঁদের দিকে ছোটে।”

(জীবন)

তখনতো চাঁদের দিকে ছোটা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। শুধু অধরাই চলতে থাকে তার। বিখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব উইনস্টন চার্চিলের একটি উক্তি মনে পড়ে যায়: “There’s something about the outside of a horse that is good for the inside of a man.” – (Winston Churchill)

ঘোড়ার যা বাইরের সামর্থ্য তা একজন মানুষের ভিতরের সামর্থ্য হলেই বেশি ফলপ্রদ। জীবন তো সেই ঘোড়াই। ছোটে আবার স্থির হয়ে যায় অন্তিমে এসে। রূপকের মধ্য দিয়ে গল্পগুলি বহুমুখী ব্যঞ্জনা পেয়েছে। প্রত্যয় ও জোশ নিয়ে মুগ্ধতার ছবি ফুটিয়ে তুলেছে। তেমনি নিথর বিবর্ণতায় নেমে এসেছে পরিণতিও। স্বপ্নে ও ইচ্ছায় কতকী ঘটে চলে। ভালবাসায় ও কান্নায় ভর্তি হয় জীবন। পথে-ঘাটে কত আলাপ-পরিচয়। সেসব কথা-বার্তাও উঠে আসে কবিতায়। সাধারণ থেকে কোনো অসাধারণকে খুঁজে পান কবি। কখনো শূন্যতায় মিলিয়ে যায় চেনা মুখগুলি:

“বনগাঁ স্টেশনে

গগন গগন বলে

অন্ধকারে ছুটে গেল ওকে, ওকে, ওকে?”

(গগন অন্ধকার)

নীল আর্মস্ট্রং নিমাইয়ের বিছানায় উঁকি মেরে দ্যাখে চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে নিমাই, বিছানা আর ক্যানিং লোকাল। গল্প যেন পরকীয়ায় আঁকা রোমান্টিক এক ছবি। শেফালী নিমাইয়ের বউ। ঘোষদের দিঘিতে সাঁতার কাটতে কাটতে পৌঁছে যায় জলের গভীরে। যুবতী শেফালী কবির বর্ণনায়:

“শেফালীর খোলা বুক

খোলা নাভি

হাত ও নিতম্ব

আশ্চর্য মেঘের মতো যোনি”

ঘোষেদের মেজো ছেলে জানালার খিড়কি দিয়ে দ্যাখে তাকে। গোঁফ ছাঁটা, জুলপিতে কলপ করা সে যেন এক কালবোস। সে জলের তলায় শেফালীকে টেনে নেয়। অদ্ভুত মায়াবী আলোয় কবিতার গাল্পিক ফর্ম পাঠককে দীক্ষা দেয়। আদিম প্রবৃত্তির জলাশয়ে এভাবেই ডুব মেরে নিষিদ্ধ স্বপ্ন পূরণ হয়।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত সময়কে নিরীক্ষণ করেও সময়ের অভ্যন্তরে মানবীয় প্রবৃত্তির কলাকুশলীর ভূমিকায় যে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তা বাংলা সাহিত্যে এক ভিন্নতর রূপ দর্শন। অসামান্য সূক্ষ্ম জীবনবোধ থেকে সামগ্রিক জীবনের পরিচয় তুলে ধরেছেন। কথনভঙ্গির সঙ্গে ছবির অপূর্ব মেলবন্ধন যেন সবাক ও নির্বাকের পরম্পরা থেকে রূপদর্শী তাত্ত্বিক শিল্পীর শিল্পকর্ম। একঘেয়েমি নয়, বহুমুখী স্বয়ংক্রিয়তায় তা পর্যাপ্ত বিশ্বজীবনের মহাকাশ হয়ে উঠেছে।

Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
সাম্প্রতিক পোষ্ট
বর্ষা , উমামাসি আর প্রেমের গপ্পো- হারিয়ে যাওয়া গানের খাতা- যশোধরা রায়চৌধুরী

জল ঠেলতে ঠেলতে দিন কেটে যায় তবু… রোমান্স মরে গেলেও, ওই কাদা জল
ঘেঁটেই চলি তারপর। বাজারে দোকানে যাওয়া… ফিরে আসা হাঁটুজলে। এসে পায়ে
দেখি কার চিঠি লেপটে আছে।

Read More »