ব্রহ্মা জানেন গোপন কম্মোটি- যে ছবি বলেছে কন্যাকে সম্প্রদান না করার কথা, বরের কপালে সিঁদুর ছোঁয়ানোর কথাওঃ যশোধরা রায়চৌধুরী

পরিচালনাঃ অরিত্র মুখোপাধ্যায়

সম্প্রতি দেখলাম ব্রহ্মা জানেন গোপন কম্মোটি…নানা বিরোধাভাসে ভরা জোড়া তাপ্পি দেওয়া ছবি। জনপ্রিয় ছবি করবই, কমেডি বানাবই। এসব ভেবে অন্তরে রিগ্রেসিভ ও শো অফে প্রগ্রেসিভ এক রকমের তেলেজলে ছবি।   টার্গেট অডিয়েন্সের বুদ্ধি বৃত্তিকে একেবারে গসাগু কষে সর্বাধিক নিচুস্তর এর ভেবে করা ছবি।

এ ছবিতে হিরো হিসেবে দেখান হয়েছে এক মেয়ে পুরোহিতকে, এ ছবি বলেছে কন্যাকে সম্প্রদান না করার কথা, বরের কপালে সিঁদুর ছোঁয়ানোর কথাও। এগুলো এক অর্থে পজিটিভ বার্তা কাজেই নিন্দা নয়, প্রশংসাই প্রাপ্য এ ছবির।
 
তাও কেন নিন্দা? কেননা,
 
১। এ গল্পের কেন্দ্রে এক মেয়ে। এক মেয়েকে “হিরো” করে সিনেমা বানানো অবশ্যই সাধুবাদযোগ্য ও এগিয়ে থাকা ব্যাপার। অথচ, এ ছবিতে মেয়েটির চরিত্র নির্মাণে এতটুকুও যত্নবান নন পরিচালকদ্বয়। তাঁরা দেখালেন এক সংস্কৃত বিষয়ের অধ্যাপিকাকে এক অর্ধ ক্লাউন অর্ধ বালক, অপরিণত যুবক,  ছলেবলে বন্ধুত্ব করে বিয়ের সম্বন্ধ পাঠায় ও প্রাচীন যুগের মত করে মেয়ে দেখতে আসে তার বাড়িতে। বালখিল্যতার মোড়কে তাদের বিয়েও হয় ও বিয়ের আগে মেয়েটি নিজের পৌরোহিত্যকে পেশা হিসেবে নেওয়ার কথাটি স্পষ্ট করে বলেনা, ভাসা ভাসা ভাবে বলে “আমি পুজো করি”। এবং তারপর পৌরোহিত্যর কাজটি করতে যায় লুকিয়ে চুরিয়ে, কেননা তার শ্বশুরবাড়ি প্রাচীনপন্থী এবং অত্যন্ত রক্ষণশীল।

২। কমেডির কী মূল্য তা আমরা আগেও দেখেছি। ক্ষুরধার সামাজিক টীকাটিপ্পণী দিতে সক্ষম কমেডি , কমেডি পারে হাসির মোড়কে কঠিন বিষয়কে তুলে ধরতে। উদাহরণ গুপি গাইন বাঘা বাইন বা হীরক রাজার দেশে। সেই মেধা ও ধার কোথায় গেল? এখানে প্রতি পদে প্রাচীন পন্থী শাশুড়িকে হাস্যাস্পদ দেখানো হচ্ছিল, যেন তাঁর বিরুদ্ধে কিছুই বলা যায়না তিনি হাস্যকর এটা দেখান হয়েছে বলে। অথচ গোটা ছবিতে কোন শ্লেষ নেই। মায়ের দ্বারা অত্যাচারিত বাবা, বা বড় ভাইয়ের চোর চোর ভাবের কোন ব্যাখ্যা নেই। মূল ঘটনার ভেতরে কোন শ্লেষ নেই। ফলত কমেডি ভাঁড়ামো হয়ে উঠতে দেরি হয়নি।
৩। পুরুষ পুরোহিতের চরিত্রকে একেবারেই মার্কামারা ভিলেন বানাতেই হল, প্রক্ষিপ্তভাবে তাকে কদাচারী ও দুশ্চরিত্র দেখিয়ে। অর্থাৎ যদি সত্যিই বিদ্বান কোন পুরোহিত চিত্রে আসতেন, তাহলে মেয়েটির পৌরোহিত্য করার সুযোগ বা যোগ্যতা প্রশ্নাতীত থাকত না? যুক্তিহীন পরিহাসের মত এক পটবয়লার আখ্যান তৈরি না করলে , মেয়েটির পড়াশুনো ও মেধাবী পৌরোহিত্যের কোন দাম দেখান যেত না কি?
৪। পুজো আচ্চার অস্বাভাবিক বাড়াবাড়ির ভেতরে গোটা ছবিকে মুড়ে রাখা হয়েছে আর মাঝে মাঝে ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে কিছু ঘটনার কথা, যা পাসিং রেফারেন্সের মত হয়ে গিয়েছে। যেমন মন্দিরে মেয়েদের প্রবেশাধিকারের কথা, অথবা মাসিকের দিনে মেয়েদের ঠাকুর ঘরে যাবার ইস্যু। তলিয়ে দেখা সম্ভব না এতগুলি বিষয় তাই কোনকিছুই তলিয়ে দেখা হয়নি।
 
ব্রহ্মা জানেন এ সংলাপ লিখেছেন কবি সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায়। জানি, যে, দীপ জ্বেলেই রাখা দরকার। যে পজিটিভ বার্তা সিনেমাটায় আছে তাকে সাধুবাদ দিতেই হয়, কিন্তু ব্রাহ্মণ্য তন্ত্রের উদয় আর বেদ উপনিষদের দর্শন এ নিয়ে বিস্তৃত শিক্ষা ও আলোচনা র অনেক অবকাশ এ ছবিতে ছিল যা কমেডির আবরণে রাখতে গিয়ে ছবিটি হেলায় হারাল। তাই কোন সিরিয়াস আলোচনা করতেই ইচ্ছে করে না এ নিয়ে।

এসব নিয়ে বলতে বা ভাবতে, এখন ক্লান্তও লাগে। তবু, ২০০ বছরের নবজাগরণের ইতিহাস পেরিয়ে আসা এই বাংলায় আদৌ পুজো আচ্চা করার অধিকার মেয়েদের কতটা আছে তা নিয়ে ছবি করতেই বা হবে কেন। আর সে আখ্যানকে মেইনস্ট্রিমের নামে নায়িকার শাশুড়ির চোখ দিয়ে দেখানো, তাঁর মত পশ্চাৎপদ মহিলাকে দিয়ে মেয়েটির পৌরোহিত্যকে অনুমোদন দেওয়ানোর পথটি বলে দেয়, ভেতরে ভেতরে এই ধরণের দর্শকের মন কাড়ার পরিকল্পনাতেই পরিচালকদ্বয় নেমে পড়েছেন, কারণ তাঁরা ধরেই নিয়েছেন এঁরাই তাঁদের ৯৯% দর্শক। এ থেকে প্রমাণ হয়,  এতদিনে সমাজটি আগু না হয়ে পশ্চাৎপদই হয়েছে। ৩৪ বছরের বাম শাসনে কোন সামাজিক আন্দোলন হয়নি উল্টে বাংলার পাড়ায় পাড়ায় গজিয়ে ওঠা নানা মন্দির বৈধতা পেয়েছে এবং একাধিক গুরুর আখড়া, বাবাজির আশ্রম বিশাল থেকে বিশালতর হয়ে উঠেছে। যাঁরা মনেপ্রাণে জাত পাতে বিশ্বাসী, ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের ধ্বজাধারী! হায়! আর তাই, এখনো সিনেমা বানিয়ে লোকশিক্ষে দিতে হয় এসব বিষয়ে!  হায়!
 
কেমন অবাস্তব বলে মনে হয়, পঁচিশ বছরের কাছাকাছি আগে আমার বিবাহে আমার মা আমাকে সম্প্রদান করেন নি যে,  এবং রাধারাণী দেবীর মিলনের মন্ত্রমালা বই থেকে পাঠ করে অধ্যাপক সোমনাথ ভট্টাচার্য যে আমাদের বিয়ে দিয়েছিলেন, হোম যজ্ঞ না করে নিছক মোমবাতি জ্বেলে… , এই ঘটনাটাও।  এগুলো নিয়ে যে পঁচিশ বছর পরেও নতুন করে  আলোচনা করার অবকাশ থাকবে আর তা নিয়ে  সিনেমা বানালে আমরা মাথা মেড়ে নেড়ে ‘জরুরি’ বলব, ভাবিনি। আমার মা তার ও পাঁচ বছর আগে স্টেজে বেদপাঠ করার সময়ে পুরীর শঙ্করাচার্যের  ” নারী বেদপাঠের অধিকারী নয়” শুনেছিলেন ও অকাতরে বাকি জীবন বেদ উপনিষদের পাঠ পারফরম্যান্স ও চর্চায় ছিলেন। ১৯৯৩ সালে বিষয় টা বেশ হইচই ফেলেছিল।আবাপ ও সানন্দায় প্রচুর লেখালেখি ও হয়েছিল।
এই বিষয়টা  নতুন করে আবার  আলোচিত, এ নির্দেশ করে এখনকার সময়টা কুড়ি বছরে অনেক পিছিয়ে গেছে। বহুদিন আগেই এসব আলোচনার বৃত্তে এসে পুরোপুরি রফা হওয়ার কথা ছিল। এখন ত রোহিণী ধর্মপাল  নিয়মিত বিবাহ দিয়ে থাকেন।  তাঁর মা, আমাদের প্রিয় সংস্কৃত অধ্যাপিকা,  অসামান্য লেখক গৌরী ধর্মপালের তোইরি করা বৈদিক বিবাহপদ্ধতিকেই তিনি অনুসরণ করেন। গৌরীদি কিন্তু আশি দশক থেকেই বিবাহ দিয়েছেন তাঁর ওই পদ্ধতিতে। এবং শুনেছি তিনি অপর্ণা সেনের কন্যার বিবাহেও পৌরোহিত্য করেছিলেন।


আরও পড়ুনঃ বাবার প্রিয় গাড়ি নাকি বাবার দেহ শ্মশানে পুড়তে যাবার পর, নিজে নিজে চীৎকার করে উঠেছিল। আমরাও, অনেক পরে দেখেছি, সেই স্ট্যান্ডার্ড হেরাল্ডের আর্ত কান্না। – হারিয়ে যাওয়া গানের খাতা- ১৬ পর্বঃ যশোধরা রায়চৌধুরী



আরও পড়ুনঃ  জৌগ্রাম ‘অগ্রগামী’ সংঘের উদ্যোগে আয়োজিত একদিবসীয় এক ‘নাট্যসন্ধ্যা’য় জৌগ্রাম এলাকার সংস্কৃতি মনস্ক মানুষ খুঁজে পেল অনাস্বাদিত মানসিক খোরাক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *