সুপ্রিয় দত্ত ও বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে অমল আলোয় উদ্ভাসিত এক অনুভবী আড্ডার বিষয় নতুন সময়ের থিয়েটার ও অন্য স্পেস

অসীম দাস

এ যেনো অনেকটা এলেন, দেখলেন আর সকলকে সাহস দিয়ে গেলেন এবং বলে গেলেন। নতুন সময়ের থিয়েটার এবং অন্য স্পেস বিষয়ক একটি দারুণ মনেরম থিয়েটারি আড্ডা বসেছিল গত ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ রবিবার ‘অশোকনগর নাট্যমুখ’-এর বিদ্যাধরী মেঘেদের রান্নাঘরে। যা একটি  পাহাড়ের কাঠের বাড়ির আদলে নির্মিত অতিথিশালা, আড্ডাজোনও বলা যেতে পারে। লোহার  সিঁড়ি বেয়ে একতলায় উঠে চোখ দাঁড়িয়ে যাবে সকলেরই। বাঁ হাতে হেঁসেল  আর ডানদিকে বাংলার প্রবাহ মান নদীর নামে বিদ্যাধরী।  একসময়ের পেশাদারি থিয়েটারের ও বহমান সময়ের বহু বাংলা সিনেমার খলনায়ক, বলিষ্ঠ চরিত্রাভিনেতা সুপ্রিয় দত্ত এবং সিরিয়াল ও থিয়েটারের আরও এক দক্ষ সু-অভিনেতা পরিচালক বিপ্লব বন্দ্যোপাধায় সহ ‘অশোকনগর নাট্যমুখ’-এর কর্ণধার নির্দেশক অভি চক্রবর্তী। সঞ্চালক তমাল মুখোপাধ্যায়। অমল আলো একবিংশ দশকের এক দলিল যা এই সময়ের স্পেস থিয়েটারের নিদর্শন  ব্ল্যাক বক্স। কলকাতা প্রাচ্য ও অশোকনগর নাট্যমুখের যৌথ উদ্যোগে এই আয়োজন দুপুর ৩টেতে মফস্বলের এক আধা আশি বছরের প্রাচীন শহরে,  এ এক অভাবনীয় আন্দোলন বাংলা থিয়েটারে।

পৃথিবীর ইতিহাসে প্রতি একশো বছর  অন্তর কালীন মহামারি শুধু ধ্বংসই করেনি, আমাদের মনোবলকে হারিয়ে দেওয়ার চরম প্রচেষ্টা। শ্রী দত্ত আরো বলেন থিয়েটার থেকে দীর্ঘদিন নির্বাসনে ছিলেন। সেই তিস্তাপারের বৃত্তান্ত এর পর গত বছর কোভিভের আগে ব্রাত্য বসুর নাটক রাণী ক্রেউসাতে এবং  আফটার লকডাউন বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইচ্ছের প্রতি সম্মান দিয়ে প্রাচ্য নাট্যদলের হয়ে আজাদী (মূল নাট্য গিরিশ কারনাড) নাটকে একবার বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার বাসনাকে পাথেয় করে পশ্চিমবঙ্গের অমল আলোর মতো  গড়ে ওঠা বিভিন্ন থিয়েটারের জন্য নির্মিত স্পেসগুলি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এক নবদিগন্তে উজ্জীবিত হয়ে অমল আলো তাকে চমকিত করেছেন শুধু নয় বললেন বর্তমান থিয়েটারের শিল্পীদের একই সাথে কুর্নিশ জানিয়েছেন। নতুন করে বাঁচার অক্সিজেন নিয়ে গেলেন অশোকনগর থেকে। তিনি মজার সাথে আরো বলেন যে জীবিত কালে যত স্পেস আমি দেখে যাচ্ছি  মৃত্যুর পর যমরাজ আমার সাথে কথা বলতে আসবে তাঁকে বুঝিয়ে দেবো যে আমাকে অন্তত স্পেস দেখাবেন না। জীবিত অবস্থায় আমার এক জন্মে যত স্পেস দেখেছি তাতে আপনি চারজন্মেও পারবেন না মশাই! তিনি আরও বলেন রামকৃষ্ণ মিশনে পড়ার সময় ছোটবেলায় প্রতিবছর বনমহোৎসব হতো। সেখানে একবছর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (বাংলা ১৩০৪ সালে রচিত) পঞ্চভূত কাহিনির পাঁচ পাত্র পাত্রীর মিলিত এক তর্কসভা যা নাট্যের রূপদানে ক্ষিতি,স্রোতস্বিনী, দীপ্তি, সমীর ও ব্যোম চরিত্রে প্রকাশ পায়। তাতে ব্যোম  চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। ব্যোম মানে স্পেস। পেশাদারি থিয়েটার দেখেছেন প্রচুর। বিদেশের ব্রডওয়ে থিয়েটার, পৃথ্বী থিয়েটার তাকে আকৃষ্ট করেছিল। আক্ষেপ ঘূর্নায়মাণ সারকারিনা মঞ্চে তিনি অভিনয় করতে পারেননি। বিভিন্ন মঞ্চের ভাষার কথা তিনি এই সেমিনারে উল্লেখ করেন যা থিয়েটারের বা  শিক্ষানবিশদের কাছে এক অভূতপূর্ব চেতনার উন্মেষণ। অভি চক্রবর্তী বলেন যে বিপ্লবদাদের পরবর্তী জেনারেশন আমরা হলে আমার একটু জানার আছে যেকথা সুপ্রিয়দা বললেন যে এই থিয়েটারটার একদিন পেশাদার হয়ে ওঠার সাহস রাখে তা আপনার চোখে কিভাবে ধরা দিয়েছে যদি বলেন। শ্রী বন্দ্যোপাধ্যায় অল্প কথায়  আজকের অন্তরঙ্গ থিয়েটার এর বাস্তবিকতা নিয়ে বলেন যে দেশে একটি ছেলে একটি মেয়ে পাশাপাশি অন্তরঙ্গ ভাবে বসে প্রপোজ করতে পারে না চাইলে চুমু খেতে পারে না, মা তার সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারে না  সেখানে এই অন্তরঙ্গ থিয়েটারের যৌক্তিকতা নিয়ে সন্দেহপোষণ করেন। দেবশংকর হালদার, গৌতম হালদার তাঁরা কলকাতার প্রচুর দলে অভিনয়ের শ্রীবৃদ্ধি ঘটিয়েছেন পাশাপাশি ভালো খারাপ, ছোট বড় দলকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। লকডাউন পরবর্তী সময়ে আমরা সেভাবে আজও থিয়েটার নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারিনি। মুখাপেক্ষা হয়ে সর্বক্ষণের থিয়েটারকে পেশায় পরিণত করার  সাহস যদি কেউ দেখিয়ে থাকেন তবে নিশ্চিত ওঁদের নামই বারংবার উঠে আসবে। গ্রুপ থিয়েটার যখন শুরু হয় তখন ক্লাবগুলোতে একাংক প্রতিযোগিতা চলতো। সেই সময় দেখেছি কেউ শিক্ষকতা বা অফিসের কাজ সেড়ে থিয়েটারে থেকেছেন। আজকের দিনে নাটক নিয়ে সংসারে বেঁচে থাকা তাও রাষ্ট্রের ইচ্ছা অনিচ্ছায় সঙ্গ দিয়ে এভাবে কতদিন টিকে থাকা যাবে তা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেন।পাশাপাশি এই থিয়েটারটা নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন এই সেমিনারে। বর্ধমানে তেপান্তর,  খরদহতে আঙিনা বা দেবাশিসের থিয়ে এপেক্স কিংবা অমল আলোকে ঘিরে বাঁচার অনেক এলিমেন্টস আছে।

তিল তিল করে বেড়ে ওঠা অনেক স্বপ্নমাখা ইচ্ছে নিয়ে আমাদের লড়াইটা চালিয়ে যেতে যেতে একটি থিয়েটার নির্মাণ আজ এখানে দুপুর ৩টেতে অভিনীত হল। সত্যব্রত রাউতের ডিজাইন ও নির্দেশনায় গান্ধারী  নাটকটি দেখে আমরা মুগ্ধ হয়ে ফিরছি নগরের পথে। নাম ভূমিকায় গান্ধারীর চরিত্রে সঙ্গীতা চক্রবর্তীর বলিষ্ঠ অভিনয় ও আলো ছায়ায় আলোক ভাবনা সুদীপ সান্যালের এবং সর্বোপরি কোরাসে যারা সঙ্গত দিলেন তাদের পরিশ্রম কম নয় এই নাট্যে। অনুষ্ঠানের শেষভাগে অভি চক্রবর্তীর দ্বিতীয় নাট্যাপন্যাস ভীমসেন্টের ধূমাবতী আনুষ্ঠানিক উন্মোচন করেন এই বিখ্যাত মানুষদ্বয়।

আপনার সংস্থা বা এলাকার নাট্য সংবাদ ছবি সহ ই-মেল করুন। ই-মেল ঠিকানাঃ keyapatamagazine@gmail.com



কেয়াপাতা এখন টেলিগ্রামে। আমাদের চ্যানেলে (Keyapata-কেয়াপাতা) যোগ দিয়ে কেয়াপাতার সকল তথ্য সবার প্রথমে পাওয়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *