হারিয়ে যাওয়া গানের খাতা- ১০ পর্বঃ যশোধরা রায়চৌধুরী


প্যার দিওয়ানা হোতা হ্যায় মস্তানা হোতা হ্যায়
হর কিসিসে হর পল সে বেগানা হোতা হ্যায়

हर ख़ुशी से हर गम से बेगाना होता है
प्यार दीवाना होता है मस्ताना होता है
हर ख़ुशी से हर गम से बेगाना होता है
शमा कहे परवाने से परे चला जा
मेरी तराह जल जायेगा यहाँ नहीं आ
शमा कहे परवाने से परे चला जा
मेरी तराह जल जायेगा यहाँ नहीं आ
वो नहीं सुनता उसको जल जाना होता है
हर ख़ुशी से हर गम से बेगाना होता है
प्यार दीवाना होता है मस्ताना होता है
हर ख़ुशी से हर गम से बेगाना होता है
सुनो किसी शायर ने ये कहा बहुत खूब
मना करे दुनिया लेकिन मेरे मेहबूब…

প্রেমকে আমার শৈশব কৈশোরে দেখলাম হিন্দি ছবির গানের ক্যানভাসেই ত। অথচ তার আগের প্রজন্মের প্রেমকেও ত চিনেছি আমরা, সিঁড়িভাঙা অঙ্ক কষতে কষতেই নিজেদের প্রজন্মের পহেচানে এসে নেমেছি।
 
আমার মা প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়তে গিয়েছিলেন। সহপাঠিনীদের সংগে তাঁরা বসতেন এক দিকে। অন্য দিকে ছেলেরা। মেয়েরা অংক ক্লাসে সংখ্যালঘু। তাই তাঁদের দিকে তাকাত ছেলেরা বিপুল হতাশাময় কামনা নিয়ে। একদিন এক ছেলে বিরাট সাহসের কাজ করে বসল। মায়েদের কাঠের ডেস্কে রেখে দিল চিনি মাখানো ছোট্ট ছোট্ট মৌরি লজেন্স।
 
মায়েরা সিটে এসে বসার সময়, সেটা দেখে, সব বুঝে, রাগি রাগি মুখ করে, শাড়ির আঁচল দিয়ে ঝেড়ে ফেলে দিয়েছিলেন।
 
মায়ের জন্ম ১৯৩৫। আমার এক মামা, যাঁর জন্ম ১৯৪২ এ, তিনি কিন্তু পরিবারের প্রথম প্রেম করে বিয়ে করা ছেলে। তার ওপর আবার বেজাতে। মানে, মামা কায়স্থ কিন্তু মামি ব্রাহ্মণ ছিলেন। সে প্রেমের কাহিনি গল্পের বইয়ের মত। বন্ধুর বোনের সংগে প্রেম করেছিলেন মামা। আমাদের ছোট্টবেলায় কিন্তু, স্পষ্ট মনে আছে, সে খবর আমরা প্রায় গুড়গুড়ে বয়স থেকেই জানতাম। মায়েদের আলোচনা থেকেই জেনেছিলাম নিশ্চিত। অর্থাৎ, প্রেমের গল্প শোনার অভ্যাস সে সময়েও শিশুদের ছিল, এখনকার শিশুদেরই শুধু দোষ দেওয়া হয় যে তারা সব জেনে ফেলেছে!
 
তো সেই মামু মামির অভ্যাস ছিল গঙ্গার ধারে যাওয়া, দোতলা বাসের সামনের সিটে বসা, ট্রামে চেপে ঘুরতে থাকা। ট্রামই এক মাত্র যান যা ডিপো থেকে ডিপো গিয়ে আবার রওনা হয়ে যায়। এ এক অনন্ত গোলাকৃতি পথ। ট্রামের সামান্য কয়েক পয়সা ভাড়া দিয়েই এভাবে ঘন্টার পর ঘন্টা কলকাতার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত যাওয়া যায়, ট্রামের সিটে বসে বসে। কেউ নামিয়ে দেয়না।
 
তাছাড়া ছিল চায়ের দোকান। হামেশাই যা বাংলা সিনেমার উপাদান। কত না ছবিতে দেখা গেল সেই কাটলেট চপ সাজানো, কাঁটাচামচ দেওয়া সাদা চিনেমাটির প্লেট, নুন মরিচের ডিবে আর লাল পর্দা ঢাকা চায়ের কেবিনের ছোট্ট ঘর। সেযুগে, নস্টালজিয়ার নিয়ম মেনে, ছেলে ও মেয়ে মুখোমুখি বসিবার আয়োজন সেটাই। সেটাই আসল উন্মেষস্থল রোম্যান্স এর। 
 
এই সব চা দোকানে বাঙালি ছেলেমেয়েরা বসবে। রমাপদ চৌধুরীর গল্পের ছেলেমেয়েরা বন্ধুত্ব থেকে প্রেমের দিকে যেতে যেতে নিজেদের, আজকের ভাষায় এক্সপ্লোর করবে। সুধীর মৈত্রর আঁকা ছবির মত সেই সব লম্বা বিনুনি শাড়ি পরিহিতা মেয়েরা আসবে, আর ছেলেদের গায়ে একটা আঙুল ছোঁয়ালেই অগ্ন্যুৎপাত হবে ছেলেটির ভেতরে।
 
এইসব সময়ে কাকা মেশো পিশেমশাইরা থাকতেন ঝোপেঝাড়ে বাসে ট্রামে। কোন পারিবারিক পরিচয় থাকলেই, ছেলেটি বা মেয়েটির সম্বন্ধে বাড়ি বয়ে দিয়ে আসতেন খবর। ছেলেটিকে কোন মেয়ের সংগে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা গেছে। “তোমার মাইয়াডারে দ্যাখলাম য্যান! ট্রামে বইস্যা কার না কার বাড়ির পোলার সঙ্গে কথা কয়!”
 
অর্থাৎ এই সময়ের ছেলেমেয়েদের ভেতরে চাপা সন্ত্রাসের মত এই বুঝি কেউ দেখে ফেলল ব্যাপারটা কাজ করত। আনুষঙ্গিক হল সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে তুমুল চোপা, যার নাম আমাদের প্রজন্মে এসে হবে ঝাড়।
 
 এর পর এল আমার প্রজন্ম। আমরা কলেজে পড়ছি যখন, রোজ রাত আটটায় কি সাতটায় বাড়ি ফিরে গল্প দিতাম জ্যামের। একটাও মা বিশ্বাস করতেন না। একবার কলেজ স্ট্রিটে বৃষ্টি হয়ে জল জমল। ভবানীপুরে সত্যি জ্যামে আটকে নটায় ফিরে মাকে বিশ্বাসই করাতে পারিনি, ভবানীপুরে একটূও বৃষ্টি হয়নি সেদিন।
 
এসব তথাকথিত দুষ্টূমির সঙ্গে মাখা সন্দেশের মত ছিল আমাদের প্রেম । প্রেমে পড়া, প্রেম করা। এক তরফা প্রেম তখনো প্রচুর। কয়েকটা ঠিকঠাক লেগে গেলে দু তরফা হত। তার আবার নিয়ম ছিল। অলিখিত। তিন মাস ঘুরলে একটা চুমু। তখনো জীবনের প্রথম চুমু খাওয়ার জায়গা ছাতের ধার, ট্যাঙ্কের পেছনদিক। কিন্তু তার চেয়েও বেশি আসছে মেয়েবন্ধু ছেলেবন্ধুদের মেলামেশা। অ্যাসেক্সুয়ালের ভেতর যৌনতার চোরাটান, তবু যেন লুপ্ত নাশপাতির মত নির্বীজ ও নিষ্পাপ। ক্যান্টিনের বেঞ্চি ভাগাভাগি করে গায়ে গা ঠেকিয়ে বসার পর্ব। কিন্তু শরীরী নয় তবু। এক আধখানা কেচ্ছাকাহিনি ঘোরে বাতাসে। অমুককে অমুকের সংগে সন্ধে অব্দি কলেজের পেছনে জলের ট্যাংকের ওপরে দেখা যায় ( যাকে ডিরোজিওর কবর বলে ডাকতাম আমরা)। তমুক  অমুকের হোস্টেলে ঢুকে বিছানায় সেঁধিয়েছে। ‘শোয়া’ শব্দ কীভাবে জানি তখন থেকে আমাদের জবানিতে একটি সংকীর্ণতর অর্থে ব্যবহৃত হতে থাকবে।
 
আমরা জানব নানারকমের বন্ধুত্ব, রঙ পালটানো হবে তারও। কিছু কিছু সম্পর্ককে প্রান্তিক সম্পর্ক নাম দিয়ে দাগিয়ে দেব। কিছু সম্পর্ক ফ্লপ, কিছু ঢপ। সরস্বতী পুজোর শ্যাম্পু চুল, হলদে শাড়ির সঙ্গে হলদে পাঞ্জাবির চোখে চোখে কথা। পুজো প্যান্ডেলে অঞ্জলি দিতে গিয়ে তাকাতাকি। বারান্দা বা ছাত থেকে ফেলা চিরকুট। অথবা কালো হোঁতকা টেলিফোনে ফোঁশ ফোঁশ নিঃশ্বাস ফেলা… এই হল পূর্ব রাগ। তারপর কোচিং ক্লাস থেকে সঙ্গ ধরা প্রেম, রবীন্দ্রসদন নন্দন থেকে পাশাপাশি বসা প্রেম, থার্টি সিক্স চৌরঙ্গি লেনের সেই প্রাইভেসি খোঁজা প্রেমে পালটে গেছে। বন্ধুর ফাঁকা বাড়ি বা নিজেদের ফাঁকা বাড়িতে ‘প্রেম করা’ ইন থিং হয়েছে।
 
তবে ততদিনে বোধ হয় ওই না ছোঁয়া, না ধরা, রোমান্স আর কলকাতায় নেই। জায়গাবদল করে চলে গেছে শ্রীরামপুরে, চন্দননগরে। ফুচকা ওয়ালারা সেসব রোমান্স জানবে। জানবে সাইকেল স্ট্যান্ড্ রা।
 
ততদিনে আমাদের সব ভালবাসার গল্প বইতে ঢুকে গিয়েছে। সিনেমায় ঢুকে গিয়েছে। আর এসে গিয়েছে অন্য এক প্রজন্ম । যে প্রজন্মে ছেলেরা আর মেয়েরা একসঙ্গে বসে ব্লু ফিল্ম দেখে।
 
ডিজিটাল ডিভাইডের আগের সব প্রেমকে মনে হবে আজ সিপিয়া রঙ এ আঁকা। আমার বারো বছরের মেয়ে যখন ডি ডি এল জে (দিলওয়ালে দুলহনিয়া ইত্যাদি ইত্যাদি) তে, শাহরুখের সঙ্গে রাত কাটানো নিয়ে কাজলের জড়তার গপ্পো দেখে হেসে ফেলে বলবে, মা, নব্বই সালের পরেও এরকম গাধার মত বোকা বোকা প্রেমের গল্প বানান হত?  তখন বুঝি ডিজিটাল ডিভাইডের পরবর্তী প্রজন্মরা কেবল টিভির তেয়াত্তর চ্যানেল, বে ওয়াচ, কার্টুনের যৌনতা, সব প্যাকেজ করা অবস্থায় অডিও ভিসুয়ালি পেয়ে গিয়েছে, তাই অদের কাছে প্রেম=যৌনতার সমীকরণে কোন আধো আধো কথা নেই। বাধো বাধো ভাব নেই। 
 
এখন আমাদের ১৮ তে যা যা হত, সেগুলো ১৩ তে হয়। ১৫ বরাবর এসে ছেলেমেয়েরা এক্সপ্লোর করে ফেলে চুম্বন-আলিঙ্গন আদি আমাদের ডিকশনারির অসভ্য শব্দ। আমাদের অশ্লীলের সংজ্ঞাগুলো সব পাল্টে গিয়ে এখন জলভাত হয়ে গেছে ছবির যুগে। যাবতীয় চিত্রায়ণে বিস্ময়বোধ হাওয়া। কেউ আর অবাক হয় না কোনকিছুতে।
 
 
 
এবার বলি একেবারেই দলছুট, অনন্য এক প্রেমের কাহিনি। যার নায়িকা আমার মায়ের ছোট পিসিমা।
 
আমার চোখে দেখা অনেক নারীর মধ্যে একজন। যাঁদের দিকে তাকিয়ে থেকেছি ভালবাসা আর বিস্ময় নিয়ে। দেখেছি তারা এক একটি ছোট্টখাট্ট স্টিম ইঞ্জিন। কর্মক্ষমতায়, এনার্জিতে, কথার তোড়ে।  তাকানোর তীক্ষ্ণতায় । সহজাত বা পরিশীলিত, যেরকমই হোক, মেধার ধারে, এক একজন আশ্চর্য মানুষ। ছোটখাট অতি সাধারণ পোশাকে, অতি সামান্য সাজে, তারা অনন্য ছিলেন, কেননা তাঁদের ব্যক্তিত্বটা বেরিয়ে আসত অন্য দিক থেকে।
 
একাধিকবার আমার নিজের দিদা শোভারাণি ঘোষ,  আর মায়ের পিসি, প্রথমযুগের নারীবাদী, স্বাধীনতা সংগ্রামী শান্তিসুধা ঘোষকে নিয়ে লিখে ফেলেছি, দুজনেরই আমার ওপর প্রভাব অপরিসীম। আর এঁরা সেই আলোকপ্রাপ্তা নারী, যাদের স্বামী/দাদা ছিলেন সে সময়ের অগ্রগণ্য অধ্যাপক, চিন্তক, স্ত্রী বা বোনকে সঙ্গে নিয়ে কংগ্রেসের অধিবেশনের টিকিট কেটে গান্ধীজির বক্তৃতা শোনাতে নিয়ে যাওয়া বা রবি ঠাকুরের অভিনয় দেখতে যাওয়া, ট্রামে চাপিয়ে, এসব ভয়ানক স্নবিশ কাজ কর্ম অনায়াসেই করে ফেলেছেন যিনি। মাঝে মাঝেই মনে প্রশ্ন জাগে, এঁরা যদি সেই সময়ে, সেই আলোক অভিসারের যাত্রার ভেতরে না জন্মে, অন্য কোথাও, অন্ধকার কোন খুপরিতে জন্মাতেন? কেমন হতেন এঁরা? কেমন হত এঁদের জীবন?
 
আমার কোনদিন লেখা হয়নি মায়ের অন্য একজন পিসিমাকে নিয়ে । ছোট্ট খাট্টো চেহারা। শুভ্রশ্বেত বস্ত্র পরিহিতা। মানে সরু পাড় থান। নরুনপেড়ে শাড়ি আর কি। তার তলায় সাদা কাপড়ের সেমিজ। সেমিজ দেখলে আমরা হাসতাম কারণ তখন ম্যাক্সি চালু। দিদুরা আমাদের ম্যাক্সি দেখলে হাসতেন, বলতেন সেমিজখান পরসস, শাড়ি পরতে ভুইল্যা গ্যাসস।
 
ইনি মায়ের ছোটপিসি। আমার দিদার সবচেয়ে ফেভারিট ননদ। দুজনে বৃদ্ধবয়স অব্দি দিনের পর দিন এক সঙ্গে আড্ডা দিয়ে, স্ক্র্যাবল খেলে, ভাল ভাল রান্না করে ও রেসিপি আলচনা করে, কাটাতেন, দিল্লির বাস ছেড়ে, শীতকালের দিল্লিকে এড়াতে, গোটা ডিসেম্বর জানুয়ারি যখন এই দিদা এসে থাকতেন কলকাতায়। আনন্দের হাট বসে যেত যেন বাড়িতে। এই দিদার কাছে আমারো শেখা, প্রাপ্তি, জানা, বিস্তর। সেসব ক্রমশ প্রকাশ্য।
 
ওঁর নাম রাণীদিদু। ভাল নাম অপরাজিতা। অন্য বোন জ্যোতির্ময়ী ও তিনি দুজনেই বরিশালের ব্রজমোহনে লেখাপড়া করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নেন। অপরাজিতা লেখাপড়া করেছিলেন দর্শন নিয়ে। অন্য বোনেদের মতই ইনিও অত্যন্ত উচ্চ শিক্ষিতা।  তুখোড়, অসম্ভব বুদ্ধিমতী । তবে আমি কখনো তাঁকে বিদ্যাগৌরব করতে দেখিনি।  বাড়ির ছোট হওয়াতে , অথবা সেজদিদি শান্তিসুধার বিদ্যার ছটায় , আমার মতে বেশ খানিকটা চাপা পড়ে গিয়েছিল রাণীদিদুর বা তাঁর মেজদিদি জ্যোতির্ময়ীর বিদ্যাখ্যাতি। শান্তিসুধা ঘোষ অবিবাহকে বেছে নিয়েছিলেন , তারও আগে বীর সংগ্রামী সতীন্দ্রনাথ সেনের সঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামে জড়িয়েছিলেন, আমরা আজকের মেয়েরা  বলি, হয়ত সতীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর কোন অন্য, হৃদয় ঘটিত সম্পর্কও থেকে থাকবে, কিন্তু দেশরক্ষা দেশসেবার ব্রতে সেই দিকে তাঁরা আর মন দেন নি। তবে, এইসব বললে আমাদেরই আত্মীয় মহলে গুনগুন উঠবে, আপত্তি করবেন সবাই।  ডেটল ফিনাইলে চোবানোর মতই,  এক মহৎ জীবনকে  আমরা অতিমানবিক আলোতে ধুইয়ে রাখতে চাই। সেখানে প্রেমের মত নগণ্য বিষয়ে টেনে আনা চলবে না।
 
সুন্দরদিদু আমার, অর্থাৎ শান্তিসুধা ছিলেন কৃতী, অনন্যা। অধ্যাপক, অংক শাস্ত্রের। পরে হুগলি উইমেন্স কলেজের অধ্যক্ষা। তাঁর দিকে সকলে সবিস্ময়ে তাকাত। পাশাপাশি রাণীদিদু খুব ক্যাজুয়াল আটপৌরে যেন।
 
পরে জেনেছি তাঁর জীবন নাটকে ভরা। আমি যখন দেখেছি তখন রাণীদিদু ছিলেন বিধবা, তিন সন্তানের মা, ঘটনাক্রমে চার সন্তানের। এবং দিল্লি বাসিনী। বৈধব্যের বেশেই দেখেছিলাম ওঁকে।
 
তখন বুঝতাম না, কিন্তু বড় হয়ে শুনেছিলাম ওঁর জীবনে অনেক গল্প ছিল। উনি ওঁর স্বামীর দ্বিতীয় পক্ষ, কিন্তু এই দ্বিতীয় পক্ষ হবার পেছনে ছিল এক অনুচ্চারিত কিন্তু নিঃসন্দেহে জবরদস্ত প্রেমকাহিনি। মায়ের এই ছোট পিসেমশাই  বিদ্বান ছিলেন। নাম শ্রী মনোহর রায়। অংকশাস্ত্রের কৃতী ছাত্র। বর্ধমানে বাড়ি। কলকাতায় লেখাপড়া করার সময়ে তিনি শান্তিসুধা ও অপরাজিতা দুজনের প্রতিই আকৃষ্ট হন। একজন বিদ্বান পুরুশ বিদুষী মেয়েদের প্রতি আকৃষ্ট হতেই পারেন।  এসব কাহিনি আমি আমার নবতিপর মেজমামা শ্রী অমিতাভ ঘোষের কাছে পুঙ্ক্ষাণুপুঙ্ক্ষ জেনে নিলাম। যখন শান্তিসুধা তাঁর অবিবাহের পণ বশত মনোহরের প্রতি আগ্রহহীনতা দেখান, তখন অপরাজিতাকে বিবাহ প্রস্তাব দেন তিনি। কিন্তু সেই সময়েই জানা যায়, ছেলেটির আগের বিয়ে আছে। স্ত্রী ও সন্তান থাকে বর্ধমানের বাড়িতে।  আগের পক্ষের স্ত্রী ছিলেন তথাকথিত ভাবে স্বল্পশিক্ষিত ও গ্রাম্য।
 
এই নিয়ে জল ঘোলা হয়। রাণীদিদুকে সম্প্রদান করতে অসম্মত হন তাঁর পিতৃদেব। মনোহরের আত্মীয়রা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। সব মিলিয়ে একটা স্ক্যান্ডাল হয়। বিষয়টা ধামাচাপা পড়ে যায়।
 
এর পর দীর্ঘ দিনের বিরতি। সেটা অবিভক্ত ভারত। দর্শনে এম এ পাশ করে অপরাজিতা অ্যাপ্লাই করলেন লাহোরের কোন কলেজে দর্শনের অধ্যাপনার কাজে। এবং চাকরি পেয়ে চলেও গেলেন। কিমাশ্চর্যম অতঃপরম। সেই কলেজেই মনোহর রায় অঙ্কের অধ্যাপক।
ঘটনাটা, আমার মামার মতে , অর্থাৎ বাড়ির ভার্শান অনুযায়ী কাকতালীয়। তবে আমার মন অন্য কথা বলছে। যাই হোক, এর পর বেশ কিছুদিন কাটল। শোনা গেল, মনোহর রায়ের স্ত্রী তাঁর সন্তানসহ লাহোরেই আছেন। তথাপি রাণীদিদু মনোহর রায়কে বিয়ে করলেন।  বাড়ির ও সমাজের সঙ্গে সমস্যা করেই। একেবারেই গান্ধর্ব বিবাহ। সমাজকে সাক্ষী রেখে নয়, নিজের মত করে মনোহর ও অপরাজিতা কোর্ট ম্যারেজ করেছিলেন। এর পর , চিঠিতে সেই বিয়ের খবর তিনি দাদাকে জানান। তারপর, লাহোর থেকে সুদূর কলকাতায় আসেন, এসে দাদার বাড়িতে না উঠে, হোটেলে ওঠেন, কেননা বাড়ি কীভাবে তাঁদের গ্রহণ করবে তা ত জানা নেই।
 
কিন্তু আমার দাদামশাই ও দিদা তাঁদের সঙ্গে সেতুবন্ধন করেন। সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যায় । আবার, সমাজকে নিজেদের বিবাহিত অবস্থা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল করে তাঁরা ফিরে যান লাহোর। দুজনেই অধ্যাপনা করতে থাকেন।
 
মামা জানালেন, এর পর মনোহরের প্রথমা স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন মানসিক ভাবে। তিনি বর্ধমান ফিরে আসেন। কিন্তু কন্যা থেকে যায় অপরাজিতার তত্ত্বাবধানেই। লেখাপড়া করে খুব ভাল ভাবে। রাণীদিদুই সম্পূর্ণ ভার নেন তাঁর। একে একে এরপর জন্ম নেয় রাণীদিদুর তিন ছেলেমেয়ে।
 
দেশভাগের পর ওঁরা চলে আসেন আগ্রায়। আগ্রার ড্রামন্ড রোডে ওদের বিশাল বাড়ি। ততদিনে রাণীদিদু সংসারের ভার পুরোপুরি নিতে গিয়ে নিজের চাকরি ছেড়ে গৃহবধূ হয়েছেন। বৃহত পরিবারের দক্ষ সুগৃহিণী তিনি । মামার স্মৃতিতে অমলিন আগ্রার সেই বাড়িতে গিয়ে থাকা। ১৯৪৫ তখন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। রাণীদিদুর তিন ছেলেমেয়েই অতি কৃতী হয়েছিলেন। এবং প্রথম পক্ষের কন্যাও সুশিক্ষিত।
 
মনোহর রায় পূর্ণ বয়সে মারা যান। তার পরে নাকি তাঁর প্রথমা স্ত্রীর মানসিক রোগ ঠিক হয়ে গিয়েছিল। এইখানটাতে আমি এক “কাব্যে উপেক্ষিতা”-র আঁচ পাই। আশ্চর্য সব জীবন ছিল এই মানুষদের। আমার দাদামশাইয়ের সবচেয়ে ছোট ভাই সেযুগে এক বাল্যবিধবাকে বিয়ে করেন, তাঁর শ্বশুরবাড়ি থেকে ইলোপ করে। তখনকার দিনে ইলোপ শব্দটি ছিল ট্যাবু শব্দ। সেই শ্বশুরবাড়ি অতি শিক্ষিত সম্মানিত, এবং তাঁরা খড়্গহস্ত হয়ে ছোটদাদুর নামে পুলিশে নালিশ ও করেছিলেন জেনেছিলাম। এই কাহিনি তপন রায়চৌধুরীর বাঙালনামায় কিছু কিছু আছে। রঙিন সব জীবন ! ছোটদাদু সাংবাদিকতায় বিখ্যাত হয়েছিলেন পরে, এবং দিল্লিতে চাকরি করেছিলেন বহুদিন, পরে বম্বেতে সেটল করেন।
 
ভাবলে আজ অদ্ভুত লাগে, বছর বাইশে তেইশের এক মেয়ে একাকী পাঞ্জাব প্রভিন্সে চাকরি নিয়ে চলেছে, তারপর ঘনঘটাময় প্রেমের বিয়ে করেছে।
 
রাণীদিদুর কাছে শিখেছি জীবনের প্রতি লগ্নতার পাঠ। কোন জিনিসটিই ছোট ছিল না তাঁর কাছে। আবার কোনকিছুকে অতি মহান, অতি বিশাল করে দেখাননি। নিজের বিবাহিত জীবনকে মহার্ঘ করে জাস্টিফাই করেননি। সংসার করেও, ছেলেমেয়েদের সম্বন্ধে কোন অতিশয়োক্তি, আবেগভারাতুর কথা ছিল না।
জীবনযাপনের ভেতরে একটা ঝরঝরে স্মার্টনেস ছিল রাণিদিদুর। যে কোন সমস্যার কথা বললেই তুরন্ত সমাধান বাতলাতেন। যে কোন চিঠি বা লেখা দেখালে, দারুণ উৎসাহ দিতেন, আবার ভুলটাও চোখা চোখে ঠিক ধরা পড়ত।
 
 সবচেয়ে আশ্চর্য সুন্দর সম্পর্ক ছিল বৌদি-ননদের। দিদু বাকি দুতিন ননদের  সঙ্গে সূক্ষ্ম ইগোর লড়াইতে ভুগতেন। তাঁদের উপস্থিতিতে কোথাও তাঁর টেনশন ছিল। রাণীদিদুই ছিলেন ১৪ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে ঘোষ বাড়িতে যাবার পর দিদার একমাত্র বান্ধবী। তাই রাত অব্দি গল্প চলত তাঁদের। সেই গল্পের ভাগ পেয়েছি এক রাত দু রাত যখন শীতের ছুটিতে আমিও থেকেছি দিদুর বাড়িতে। দুই বৃদ্ধার মাঝখানে শুয়ে তাঁদের গল্পের আস্বাদন। যেন ইশকুলে তাড়িত আমি, বাড়িতে মায়ের শাসনে নাজেহাল আমি, এঁদের মধ্যে সমবয়সীসুলভ আচরণ পেয়ে, প্রথম সম্মানিত হয়েছিলাম।
 
বেশ আলাদা ছিলেন রাণীদিদু। সেযুগের নিরিখেও, আজকের নিরিখেও।


প্রথম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন 
দ্বিতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন  
তৃতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন
চতুর্থ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন
পঞ্চম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন
ষষ্ঠ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন
সপ্তম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন
অষ্টম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন
নবম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

চলবে…

ছবি ঋণঃ গেটি ইমেজেস

শেয়ার করুন

One thought on “হারিয়ে যাওয়া গানের খাতা- ১০ পর্বঃ যশোধরা রায়চৌধুরী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাহিত্যিক বিভাস রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার

X