৫ পর্বঃ হিন্দু, ইসলামিক, ডাচ, পর্তুগিজ ও ব্রিটিশ স্থাপত্যরীতির সমন্বিত ভাবধারা – দিগন্ত রক্ষিত

হিন্দু, ইসলামিক, ডাচ, পর্তুগিজ ও ব্রিটিশ স্থাপত্যরীতির সমন্বিত ভাবধারা

পলাশীর যুদ্ধের পেছনে যদিমুর্শিদাবাদের নবাব রাজপুরুষদের যদি ষড়যন্ত্র হয়, তাহলে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল মুঘল, আমির, ওমরাহ ও অভিজাত মহলের গুপ্ত ষড়যন্ত্র। যেখানে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকেও ব্যবহার করা হয়েছিল। তৎকালীন সমাজের কাঠামো থেকে এটাকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা চলবে না। মুর্শিদাবাদের মুঘল ওমরাহরা দিল্লি কেন্দ্রীয় শক্তি থেকে যত বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করেছিলেন ততো তারা বাংলার দেশীয় ও বাণিজ্যিক শক্তিগুলির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন। মুঘল যুগের ঢাকার দরবারের মনসবদাররা সর্ব ক্ষমতার অধিকারী হয়েছিলেন। বাংলার সমস্ত জমিদার ও সওদাগররা তাদের মুখাপেক্ষী ছিলেন কিন্তু মুর্শিদাবাদের দরবারে এই সম্পর্ক পাল্টে গিয়ে জমিদার ও সওদাগররা বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে, নবাবী দরবারকে প্রভাবিত করেছে। ফলত পলাশীর যুদ্ধের অনেক আগে থেকেই মনসবদার, জমিদার, সওদাগর এদের নিজস্ব কায়েমী স্বার্থের পাশাপাশি যুদ্ধ হয়েছিল ওলন্দাজ(পর্তুগিজ), ডাচ, ইংরাজ, ফরাসি ইত্যাদি বিদেশি কোম্পানি গুলির সাথে । আর এই কোম্পানিগুলি দক্ষিণ ভারত হয়ে হুগলি বন্দরে যে স্থায়ী ঘাঁটি গড়ে তোলার সুযোগ পেয়েছিল তাতে বাংলার জমিদারদের যোগ অবসম্ভাবিক ভাবে ছিল। আর হুগলির অন্তর্গত ভুরসুট পরগনার জ্ঞাতিশত্রু রাজবল্লব ছিলেন বর্ধমান রাজা কীর্তি চন্দের দেওয়ান। কথিত আছে কীর্তি চন্দের ফৌজ হুগলি দখল করেছিল এবং রাজকর্মচারী মানিক চন্দের অধীনে কীর্তি চান্দের ফৌজ নবাবদের পক্ষেই কাজ করেছিল। শুধু তাই নয় কীর্তিচন্দের পরবর্তী তিলক চন্দের সময় ইংরেজদের সঙ্গে নবাব সিরাজ সিরাজ-উদ-দৌলার সংঘর্ষকালে প্রথম দিকে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পক্ষে যোগ দিয়েছিলেন, পরবর্তীকালে নবাবের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী জেনে যুদ্ধ বিরতি ঘোষণা করেন। পলাশীর যুদ্ধের সময় বর্ধমান মহারাজা তিলক চন্দের জমিদারির আয়তন ছিল ৫ হাজার ১ শত ৭৪ বর্গমাইল। পরবর্তীকালে বর্ধমান হুগলি ও মেদিনীপুরের কিছু অংশজুড়ে ইংরাজ  কালেক্টরির সবচেয়ে বড় জমিদারি বিস্তৃত ছিল। খাজনা জমার ক্ষেত্রে বর্ধমান ছিল বঙ্গের বৃহত্তম জমিদারি। তাই পলাশীর যুদ্ধকে কেন্দ্র করে কোম্পানির অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক শাসন ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা ও অপরপক্ষে ডাচ, পর্তুগিজ ও ফরাসিদের বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক পরাজয় সব কিছুরই অনেকাংশে কেন্দ্রীয় ভূমিকা নিয়েছিল বর্ধমান মহারাজা, ফলত স্থাপত্যের ক্ষেত্রে ইন্দো ইসলামিক ধর্মীয় অনুশাসনের বাইরের উপনিবেশিক বহুস্তরিয় স্থাপত্য বিন্যাস রীতিধর্মী এক রুচিরও আত্মপ্রকাশ করেছে।

           উক্ত প্রবন্ধের আলোচনা ক্ষেত্র নির্মাণের কিছু স্থাপত্য বিন্যাস রীতি এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্যঃ

খাজা আনোয়ার বেড়ের (১৭১৫-১৬ খ্রিষ্টাব্দ)

সমগ্র ভারতবর্ষের প্রেক্ষিতে খাজা আনোয়ার বেড়ের সমাধি এক অদ্বিতীয় স্থাপত্য। স্থাপত্যটি প্রথমেই যা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তা হল স্থাপত্যটি মাঝখানে একগম্বুজধর্মীতা,  যার দুপাশে দুটি দুচালা বিশিষ্ট জোড়-বাংলা মন্দিরের আদল।

এখানে আমরা মূলত চারটি স্থাপত্য দেখতে পাই। যেটি একটি নির্দিষ্ট চৌহদ্দির মধ্যে সীমাবদ্ধ। চৌহদ্দির মধ্যে উদ্যান, জলাশয় এবং তার সাথে গুরুর প্রতি শরণাগত হওয়ার অধিষ্ঠানস্থল। এই চৌহদ্দির মধ্যে ঢুকতেই আমরা যে স্থাপত্যটি পাই সেটি হল নহবতখানা বা দেউরির ন্যায় এক স্থাপত্য। যেটি বিবিধ আর্চ এবং খিলান দ্বারা পরিবেষ্টিত। জলাশয়ের মাঝখানে একটি জলটুঙ্গি। ঈই জলটুঙ্গির দান দিক দিয়ে গিয়ে তিন গম্বুজ যুক্ত মসজিদ। মসজিদের ঠিক অপর দিকে জলাশয়ের ঠিক মাঝখানে জলটুঙ্গিতে যাবার খিলান সেতু স্থাপত্য বর্তমান। যেটি নবাবের অধিষ্ঠানস্থল ছিল বলে মনে করা হয়। স্থাপত্যটি লক্ষ করলে দেখা যাবে এটিতে রাজপুত স্থাপত্যের বিভিন্ন উপাদান বর্তমান। এই স্থাপত্যের দক্ষিণ দিকে খাজা আনয়ারের সমাধি সৌধ। যেটি বাংলা এবং ইসলামিক স্থাপত্যের সমন্বিত ভাবধারার বহিপ্রকাশ।

মহন্ত অস্থল

শহর বর্ধমানের স্থাপত্যের সমন্বিত ভাবধারার বহিপ্রকাশের আর এক বড় নিদর্শন হল মহন্ত অস্থল। এটি একটি বিশাল অট্টালিকা। সামনে একটি প্রধান সদর দরজা এবং তার দুদিক থেকে দুটি বাঁকা সিঁড়ি উঠে গিয়েছে উপর দিকে। মঠের উত্তর দিকে মূল সিংহদুয়ার ছাড়া মাঝে একটি প্রবেশপথ। প্রবেশদ্বার পার করে খোলা মাঠ পেরিয়ে পশ্চিম দিকে মোহন্ত অস্থলের আবাসস্থল।

মূল মন্দিরে প্রবেশ করলে প্রত্যক্ষ করা যায় রাধা দামোদরের মন্দিরের গর্ভগৃহ। গর্ভগৃহের বাইরে রয়েছে দুই দ্বারপালের মূর্তি। গর্ভগৃহের ভিতরে ছাদের অর্ধগোলাকৃতি কেন্দ্রস্থল অবস্থিত। সিলিং ও কেন্দ্রের গোলকের চারপাশে দশাবতারের মূর্তি। ছাদের মূল অর্ধচন্দ্রাকৃতি গোলকটির অলংকরণ দেখে এখনো মুগ্ধ হতে হয়।

মাটি থেকে প্রায় ৪০ ফুট উঁচু এই মঠের শীর্ষ। হিন্দু, বৈষ্ণব, খ্রিস্টান, ইসলাম স্থাপত্য শিল্পের অপূর্ব নিদর্শন এই স্থাপত্যটি। এই গর্ভগৃহের সামনের ছাদে সারি সারি কৃষ্ণ লীলার মূর্তি দেখা যায়। তার মাঝে শ্বেতকায় ‘হংস ভাবনা’ ভাস্কর্যটি বর্তমান। এখানে পঙ্কের কাজ গুলি দেখলে আরও একবার রাজস্থানী স্থাপত্য শৈলীর কথা মনে করিয়ে দেয়।

স্থাপত্যের বহিরঙ্গের শীর্ষে চারপাশে মিনার ধর্মী চারটি স্থাপত্য বর্তমান, সামনের দিকে একটি বৌদ্ধ স্তূপ-এর ন্যায় গোল গম্বুজ এবং পিছনে চতুষ্কোণ বিশিষ্ট একটি চূড়া-যেটি, প্রায় একটি বিন্দুতে গিয়ে মিলিত হয়েছে। যেটির উচ্চতা লক্ষণীয়। এই স্থাপত্যটি দেখলে মনে হয় কোন একটি পর্তুগিজ স্থাপত্য। যার গায়ে বিবিধ খিলানের কাজ বর্তমান।

সোনার কালীবাড়ি

সোনার কালীবাড়ি শহর বর্ধমানের স্থাপত্যের প্রেক্ষিতে এক উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য। স্থাপত্যটি গথিক, ইসলামিক স্থাপত্যের এক যুক্ত উপস্থাপনা। স্থাপত্যের উপরে দুদিকে করিন্থিয়াম পিলার লক্ষ করা যায়। উপরের দুই পিলারের মাঝখানে ‘Rose Window’-র ন্যায় স্থাপত্যের নির্মাণ রীতি। স্থাপত্যটি নিম্নাংশে এক বৃহৎ Multiffoil Arch রয়েছে। যার উপর স্ট্যাকো দ্বারা নির্মিত ইসলামিক অলঙ্কার শৈলীর উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। শহর বর্ধমানে স্থাপত্যের প্রেক্ষিতে এই স্থাপত্য বিশেষ বিশিষ্টের দাবি রাখে।

প্রথম পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

দ্বিতীয় পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

তৃতীয় পর্ব পড়তে  ক্লিক করুন

চতুর্থ পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাহিত্যিক বিভাস রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার

X