বাংলার আলপনায় চিহ্ন ও প্রতীক- ৭ পর্বঃ আলপনায় পদ্ম- দীপঙ্কর পাড়ুই

‘উত্তম সাইলের চাউল জলেতে ভিজাইয়া।
ধুইয়ি মুছিয়া কন্যা লইল বাটিয়া।।
পিটালি করিয়া কন্যা পর্থমে আঁকিল।
বাপ আর মায়ের চরণ মনে গাঁথা ছিল।।
জোড়া টাইলা আঁকে কন্যা আর ধানছড়া।
মাঝে মাঝে আঁকে কন্যা গিরিবালার পারা।।
শিব-দুর্গা আঁকে কন্যা কৈলাস ভবন।
পদ্মপত্রে আগে কন্যা লক্ষীনারায়ন।।’

ময়মনসিংহ গীতিকার ‘কাজল রেখা’ পালায় লক্ষ্মীপুজোর আলপনা দেওয়ার সুন্দর দৃশ্য এখানে দেখা যায় । লক্ষ‍্যনীয় পদ্মপাতার ভেতরে আঁকা হচ্ছে লক্ষ্ণী-নারায়ণের ছবি।এই দৃশ‍্যকল্প সতত অবাক করে।
লক্ষ্মীপুজোর দিন বিকেলে উঠোনে কলমী লতায় লতায় তুলসীমঞ্চ থেকে সদর দরজায় পৌঁছায় আলপনা। জোড়া পায়ে পায়ে দোপাটি লতার সঙ্গে সদর দরজা দিয়ে মা লক্ষ্মী পা ফেলে ফেলে ঘরে পৌঁছান। গিয়ে বসেন পদ্মের আসনের উপর। তিনি পদ্মস্মিতা। পদ্মের উপর তার অধিষ্ঠান। গ্রামবাংলায় দেয়ালে আলপনা ওজল চৌকিতে আলপনা দিয়ে তার ওপর পালি বালির মধ্যে ধান রেখে তাতে করিও লক্ষ্মী পেঁচা রাখা হয়। এই সাজান কে মহিলারা বলে থাকেন ‘লক্ষ্মী পাতা’।


পদ্ম পঙ্কজ, পদম, কমল ইত‍্যাদি নামে পরিচিত। পদ্মফুল সাদা, রক্তের মত লাল ও বর্ণভেদে নীল রঙের হয়ে থাকে। ভারতবর্ষে পদ্মফুল কে পূর্ণজন্মের দ্যোতক মনে করা হয়।গ্রীষ্মকালে নদী নালা গরমে শুকিয়ে যায়,আর সেই সময়ই পদ্ম ফোটে। পদ্ম যখন ফোটে তখন বর্ষা আসার আর দেরি থাকেনা। এই যে প্রবল গ্ৰীস্মের মধ্যে পদ্ম  ফোটে।  গ্রীষ্মের মধ্যে বর্ষার সূচনা হয় পদ্ম ফোটার মধ্য দিয়ে। গ্রীষ্মে মরে যাওয়া প্রকৃতি আবার নতুন রূপে গড়ে ওঠে বরষার জল পেয়ে, এই কারণেই পদ্ম পুর্ণ জন্মের প্রতীক। এই কারণেই প্রাচীন সাহিত্যে পদ্মফুলকে দেবদত্ত ফুল বলা হয়েছে। পদ্ম অমরতা ও নবজন্মের প্রতীক হিসেবে বিবেচ্য।প্রাচীনকালে খ্রিস্ট জন্মের ৫২৪ বছর আগে ভারত বর্ষ থেকে পদ্মের বীজ নিয়ে যেতেন পারসিক বণিকেরা। মিশর চীন কম্বোডিয়া মালয়েশিয়া ইন্দোনেশিয়া জাপান ও তাইওয়ানের শিল্প-সংস্কৃতিতে পদ্মফুল জনজীবনের কৃষ্টিগত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছে। মিশরে পবিত্র রাজকীয় এবং মৈত্রের প্রতীক হিসাবে পদ্যও শালুক স্থান পেয়েছে।


হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো মৃৎপাত্র বহু রকমের পদ্মের মোটিফ দেখা যায়। গোলাকার মন্ডলের মত পদ্ম পত পাতাসহ পদ্ম প্রভৃতি ।ভারুহত সুপেয় পদ্মের কুঁড়ি ও পুষ্প তিতো পদ্মের মত দেখা যায়। অজন্তা গুহাচিত্রের নানা রকমের পদ্মের ছবি অঙ্কিত হয়েছে। অজন্তা গুহা চিত্রের দেওয়ালে সবথেকে বেশি যে জিনিসটি রয়েছে তা হলো পদ্ম ফুল, এধরনের পদ্মফুলের মোটিভ অজন্তা গুহাচিত্র কালী নন্দলাল বসু অংকন করেন। নানা ভঙ্গীতে সেসব পদ্মের মোটিভ ও অলংকরণ পদ্মজনিত অলংকরণ ও তার সুষম বিন্যাস সেটিও অংকন করেন। এই ভাবনা থেকেই পরবর্তীকালে তিনি শান্তিনিকেতনের আলপনা ডিজাইন বিষয়টির প্রসার ঘটান।

নদীকে অসিত কুমার হালদার ও মণীন্দ্র গুপ্ত অজন্তা অজন্তা পরিদর্শনকালে স্বীকার করেছেন যে অজন্তায় যে ধরনের অলংকরণ বিন্যাস দেখা যায় তার সঙ্গে বাংলার আলপনার সাদৃশ্য রয়েছে। এ সম্পর্কে শিল্পী মণীন্দ্রভূষণ গুপ্ত উল্লেখ করছেন- ‘বাঘের ফেস্কোতে ও  অজ পদ্মলতা আছে। গুপ্তযুগের ভাস্কর্য মুখের বেষ্টনীতে আলংকারিক কর্ম দেখা যায়। অজন্তার দেওয়ালে, ফ্রিজে ও ছাদের নিচে বৃত্তের পদ্মলতা আছে; বাংলার যাত্রা কলসের আলপনায় এই ধরনের পরিকল্পনা দেখা যায়; তবে অজন্তার পরিকল্পনা জটিল আর বাংলার আল্পনা সহজীকৃত।’

বৌদ্ধধর্মে পদ্ম পবিত্রতা ও আত্মত‍্যাগের প্রতীক।একটি প্রস্ফুটিত পদ্ম পূর্ণতর চক্রের বা মণ্ডলের দিক নির্দেশ করে।এই চক্র মোক্ষ লাভ ঘটায়।
হিন্দুধর্মে সূর্য দেবতার দুই হাতে দুটি  প্রস্ফুটিত পদ্ম দেখা যায়।বিষ্ণু বা নারায়ণের নাভি থেকে পদ্মের সৃষ্টি হয়েছিল।একে নাভিপদ্মও বলে।এই পদ্মের উপর অধিষ্ঠান করেন ব্রহ্মদেব বা প্রজাপতি,যিনি সৃষ্টির প্রতীক হিসেবে বিবেচ‍্য।ইনি মানবদেহ সৃজন করে থাকেন‌ তন্ত্রশাস্ত্রেও দেহের ভেতর ষট্চক্র বা পদ্ম কল্পিত হয়েছে।যথা-হৃদপদ্ম,নাভীপদ্ম,।হাতীর মাথায় ও সুরের মধ‍্যে পদ্মের চিহ্ন দেখা যায়।প্রচীনকালে পূর্বভারতে তথা বাংলায় হাতীর মাথায় ও শরীরের নানা জায়গায় আলপনা দেওয়া হত।মাথায় পদ্মের চিহ্ন আঁকা হত।
 বাংলার আলপনায়  যে ধরনের পদ্ম গুলি দেখা যায় সেগুলি হল-
১. একদল পদ্ম :  আলপনায় একটি বিশিষ্ট অর্থাৎ কুড়ি পদ্ম হল একদল পদ্ম। এই একদল পদ্ম দিয়ে পদ্মলতা আঁকা হয়ে থাকে।
২. দ্বিদল পদ্ম :  দুটি পাপড়ি বিশিষ্ট পদ্ম, একে জোকস আসতে আজ্ঞা পদ্য বলে। মানুষের চোখের ভ্রুর মাঝে অবস্থিত, শ্বেত বর্ণের পদ্ম।
৩. চতুর্দশ পদ্ম :  চারটি দল অর্থাৎ চাকরি পাকড়ি সমন্বয়ে অঙ্কিত পদ্মকে চতুর্দশ পদ্য বলে। যোগশাস্ত্রে  চতুর্দশ যুক্ত পদ্মকে মূলাধার পদ্ম বলা হয়ে থাকে এর বর্ণ লাল এই চারটি পাপড়িতে ব,শ,ষ,স বীজমন্ত্র লেখা থাকে।
 ৪.ষড়দল পদ্ম :  ছটি পাপড়ি বিশিষ্ট পদ্ম হলো ষড়দল পদ্ম। যোগশাস্ত্রে মানবদেহে ষট্চক্র কল্পিত হয়ে থাকে। ছটি পাপড়ি বিশিষ্ট পদ্ম কে  স্বাধিষ্ঠান চক্র বলে,যা  মূলাধার চক্রির  উপরিস্থলে অবস্থিত। এই চক্রটি লিঙ্গ  সুষুম্নার  মধ্যে অবস্থিত, সিঁদুরের মতো লাল  ছটি পাপড়ি বিশিষ্ট একটি পরিকল্পনা করা হয়েছে। আলপনা বাহ্যিক হলেও তা কল্পিত  অন্যদিকে দেহের ভিতরে ষট্চক্রও কল্পিত হয়েছে। এই ছটি পাঁপড়িতে ব,ভ,ম,য,র,ল বীজমন্ত্র লেখা হয়।
৫. অষ্টদল পদ্ম : আটটি পাপড়ি সমন্বিত  একটি ফুল বা গোলাকার মন্ডল একেই অষ্টদল পদ্ম বলে। ঐতিহাসিক দীনেশচন্দ্র সেন একে পানিপথ বোবা মানুষ পদ্ম আখ্যা দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন-‘ পান-পদ্ম– এই পদ্ম প্রাচীন কাল হইতে চলিয়া আসিয়াছে। জাপান হইতে ব্যাবিলনিয়া পর্যন্ত ইহার অনুরূপ পদ্ম দৃষ্ট হয়।’
৬. দশদল পদ্ম :  আলপনায় দশটি পাপড়ির সমন্বয়ে আঁকা পদ্ম বিশেষ। যোগ ও তন্ত্র শাস্ত্রে ষট্চক্রের মধ্যে মনিপুর পদ্মকে দশদল পদ্ম বলা হয়ে থাকে। এই পদ্ম নাভিমূলে কল্পিত হয়ে থাকে। দশটি পাপড়িতে ড,ঢ,ণ,ত,থ,দ,ধ,ন,প,ফ বীজমন্ত্র লেখা থাকে।মণিপুর পদ্ম বা দশদল পদ্ম নীলরঙের হয়।
৭. দ্বাদশদল পদ্ম :  বারোটি পাপড়ি বিশিষ্ট পদ্মফুল।টেরাকোটা মন্দির ও ভারতীয় অনুচিত্র  এই দ্বাদশদল পদ্মের  মোটিফ দেখা যায়। যোগশাস্ত্র একে অনাহত চক্র বলে।দ্বাদশটি পদ্মের পাপড়ির মধ্যে ক,খ,গ,ঘ,ঙ, চ,ছ,জ,ঝ, ঞ,ট,ঠ বীজমন্ত্র লেখা হয়। এই পদ্ম রক্তবর্ণের হয়।
৮. ষোড়শদল পদ্ম :  ষোলটি পাপড়ির  সমন্বয়ে গঠিত পদ্ম বিশেষ, বাংলার আল্পনা ষোড়শদল  পদ্ম প্রায়ই দেখা যায়। যোগশাস্ত্রে ষোড়টি পাপড়ি বিশিষ্ট পদ্মকে বিশুদ্ধ চক্র বলে। বিশুদ্ধ চক্র ধূম্র বর্ণের।
৯.শতদল পদ্ম  :  আলপনায় একশটি পাপড়ি বিশিষ্ট পদ্ম আঁকা হয় লক্ষ্ণী পুজোর সময়। উঠোনের মাঝখানে এই বৃহৎ শতদল পদ্ম আলপনা আঁকা হয়।এই পদ্ম জ‍্যামিতিক।বহুক্ষণ সময় লাগে আঁকতে।আঁকার সময় অঙ্কন একমনে হওয়া দরকার।মাপঝোক করে আঁকতে হয়,আঁকতে আঁকতে কথাবার্তা বললে ভুল হওয়ার সম্ভবনা বেশি।
৯. সহস্রদল পদ্ম :  বাংলার আল্পনা পদ্ম কল্পিত হয়েছে তবে কম দেখা যায় এই পদ্মের নিদর্শন। যোগশাস্ত্রে মানবদেহে যে ষট্চক্র কল্পিত হয়ে থাকে, সেখানে আজ্ঞাচক্র রয়েছে। আজ্ঞা চক্রের উপরিতলে অর্থাৎ শিরোদেশে অবস্থান করে সহস্রদল চক্র। সহস্র  অর্থাৎ হাজারটি পাপড়ির সমন্বয় বিশিষ্ট পদ্মফুল। শুভ্র বর্ণ। এই চক্র  সম্বন্ধে বৈষ্ণব,শৈব,শাক্ত প্রভৃতি বর্গের নিজ নিজ ধারণা রয়েছে। যেমন শৈবরা  এই সহস্রদল পদ্মকে শিব স্থান বলে জানেন,  বৈষ্ণবরা পরমপুরুষ হরির  পাদপদ্ম, শাক্ত সাধকেরা দেবীর পাদপদ্ম বলে জানেন। সাংখ্য যোগীরা পদ্ম বা স্থানকে প্রকৃতি-পুরুষের স্থান বলে মনে করেন।

প্রাচীন যুগ থেকেই মানুষ নিজ নিজ শিল্পকলায়  বিভিন্ন ধরনের নকশা সৃজন করেছেন। বহুবিধ নকশার মধ্যে পদ্মও একটি নকশা।হরপ্পা মহেঞ্জোদারো থেকে একবিংশ শতকের সময়েও বাংলার আল্পনায় পদ্মের উপস্থিতি দেখা যায়। পদ্ম কখনও কখনও ধর্মীয় প্রতীক, টোটেম চিহ্ন,  রাজকীয়  ছবিটি চিহ্ন হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। ভারতের জাতীয় ফুল হিসেবে পদ্মের স্বীকৃতি হয়েছে।পদ্মের সমগোত্রীয় ফুল শালুক বাংলাদেশের জাতীয় ফল হিসেবে স্বীকৃত। অবনীন্দ্রনাথ তার ‘বাংলার ব্রত’ গ্ৰন্থে বলছেন- ‘এই যে লক্ষ্মীপূজার আলপনাতে মানুষ বিচিত্র রকমের পদ্মফুল এঁকেছে একটির সঙ্গে যার আর-একটির মিল নেই―এমন-কী, আসল পদ্ম ফুলের সঙ্গে নয়, এরই উদ্দেশ্য কী? মানুষের মনে কোথাও একটি গোপন উৎস রয়েছে,যেখান থেকে এই সব আলপনা নতুন নতুন এক-একটি সৃষ্টির বিন্দুর মতো আসছে।’

এই সৃষ্টির মূলে প্রকৃতি চেতনা মহিলাদের মধ্যে কাজ করছে। প্রতিদিন প্রতিনিয়ত প্রকৃতি থেকে তারা বহুবিধ উপাদান সংগ্রহ করছেন। এইগুলি যে সরাসরি আলপনার মহিলারা আলপনায় ব্যবহার করছেন তা নয়। মস্তিষ্কের অবচেতনে রয়ে যাওয়া ঐসমস্ত চিত্রগুলি যখন তারা আলপনায় ব্যবহার করছেন তখন তা একান্তই নিজস্ব মনের মাধুরী মিশিয়ে হয়ে উঠেছে অনন‍্য নির্দশন।বাংলার মায়েরা আজও তা বহন করে চলেছেন।

ছবি পরিচিতি :


১.হরপ্পা ও কালীবঙ্গান মৃৎপাত্রে পদ্মের মোটিফ।
২. পদ্মের রেখাচিত্র গুলি নন্দলাল বসুর অঙ্কিত।
৩.অজন্তা গুহাচিত্র সিলিঙ ও স্তম্ভের ভাস্কর্যে নানাবিধ পদ্ম ও পদ্মলতা।
৪.বাংলার আলপনায় পদ্ম ও পদ্মলতার বিভিন্ন মোটিফ।
৫.উঠোনে শতদল আলপনা।এঁকেছেন শিল্পী প্রিয়বালা মণ্ডল,নদীয়া


গ্ৰন্থঋণ :
১. সেন,দীনেশচন্দ্র –বৃহৎ বঙ্গ, দে’জ পাবলিশিং, ফাল্গুন ১৪০৫।
২. গুপ্ত,মণীন্দ্রভূষণ–শিল্পে ভারত ও বহির্ভারত,আনন্দ, জুলাই ২০১৪।
৩. মুখোপাধ্যায়, উপেন্দ্রনাথ -যোগশাস্ত্র, বসুমতি কর্পোরেশন লিমিটেড, এপ্রিল ১৯৯৮।
৪. বসু, নন্দলাল- দৃষ্টি ও সৃষ্টি, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, আষাঢ় ১৪১০।
৫.বসাক,শীলা-বাংলার ব্রতপার্বন,পুস্তক বিপণি,সেপ্টম্বর ২০০৮।
৬. ঠাকু্র,অবনীন্দ্রনাথ-বাংলার ব্রত, বিশ্বভারতী, ফাগুন ১৪১৭

প্রথম পর্ব পড়তে ক্লিক করুন
দ্বিতীয় পর্ব পড়তে ক্লিক করুন 
তৃতীয় পর্ব পড়তে ক্লিক করুন 
চতুর্থ পর্ব পড়তে ক্লিক করুন
পঞ্চম পর্ব পড়তে ক্লিক করুন
ষষ্ঠ পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাহিত্যিক বিভাস রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার

X