অর্ঘ‍্য দে – সোনা ক্ষ্যাপা

ন’টা আটচল্লিশের বর্ধমান লোকালটা ধরব বলে বেরলাম। মোড়ের মাথায় ঠিকঠাক অটো পেয়ে গেলে আর চিন্তা নেই। আজকে বেরতে দেরি হয়ে গেছে। পাঁচ মিনিটের গ্রেস টাইম টপকে গেলেই ব্যাস। ঘচাং করে একটা সিএল কাটা যাবে।

ভুলেই গেছিলাম আজকে ২৫ শে বৈশাখ। রাস্তার পাশে সেজে উঠছে অনুষ্ঠানমঞ্চ। ইতিমধ্যেই চলে এসেছে মিউজিক প্লেয়ার আর বক্স। এই সবে সকাল ন’টা বাজে। কিন্তু পরিবেশ দেখে মনে হচ্ছে দুপুর। এবারে তেমন কালবৈশাখী হয়নি। অথচ বৈশাখের দিন ফুরিয়ে এলো। মেঘেরই দেখা নেই, বৃষ্টি তো দূরের কথা। একটা সময় ছিল বিকেলে দুর্যোগ বাঁধাধরা ছিল। বিকেলের সেই অশান্ত ঝড়বৃষ্টিতে ধুয়ে যেত রাস্তা। সমস্ত রাস্তা জুড়ে তখন জলের আধিপত্য। বৃষ্টিবিধৌত রাস্তায় জলছবির মতো ভেসে উঠত একটুকরো মফস্বলজীবন। জল থৈ-থৈ বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে আসত। মেঘের পর্দা সড়িয়ে চাঁদ তার মুখ দেখালে ছাদ থেকে খুঁজে নিতাম রুপোলি তার মুখ বহতা জলে। মাথার ভাঁজে উঁকি মারছিল এইসব সাতপাঁচ চিন্তা। কিছুটা অন্যমনস্কভাবে হাঁটছিলাম। ‘হবে না… হবে না!’ কানে আসতেই নড়ে উঠলাম। কাচের মতো ভেঙে গেল আমার অন্যমনস্কতা। কিন্তু কোথা থেকে কথাটা এল সেটা বোঝার জন্যে এদিক ওদিক তাকায়েই নজর আটকাল সোনা ক্ষ্যাপার ওপর। তার শুকিয়ে যাওয়া মুখে অযত্নে বেড়ে-ওঠা দাড়ি গোঁফের মধ্যে চোখ দুটো অস্বাভাবিক রকমের উজ্জল। মনে হয় যেন ঝোপঝাড়ের ভিতর জ্বলন্ত দুটো জোনাকি আমার দিকে চেয়ে আছে। সোনা ক্ষ্যাপা হাত থেকে চায়ের গ্লাসটা নামিয়ে রাখল। তার আবার চায়ের নেশা। তবে যা-তা দোকানের নয়। যে কোনও দোকানের চায়ে তার আমেজ আসে না। গুলের দোকানে ঠিক সময় হাজির হলেই ব্যাস। তার হাতে চলে আসে দুধচায়ের গ্লাসটা।  সোনা ক্ষ্যাপা দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালেই গুল বেশ আদর ক’রে তাকে চা খাওয়ায়। হাতের কাজ সেরে ব্যস্ততার মাঝেও গুলের এই আপ্যায়নে কোনও রকম ঘাটতি নেই। আসলে সত্যি বলতে কী গুলেরও সোনা ক্ষ্যাপার ওপর একটা মায়া পড়ে গেছে।  

‘হবে না… হবে না!’ একই ঢঙে আবার বলে ভ্রু নাচাল সোনা ক্ষ্যাপা। তার ভুরু দুটোর নাচন শৈলী দেখতে দেখতে এগিয়ে গেলাম। এগিয়ে গেলাম বলার চেয়ে বলা ভাল ভ্রু দুটো যেন আমায় তার দিকে টেনে নিয়ে গেল। ‘করিস না? করিস না?’ সোনা খ্যাপার এই আলটপকা প্রশ্নে হকচকিয়ে গেলাম। মনে হল সত্যি তো! এমন এলোমেলো চিন্তা করতে করতে হিসেবের কাজে ভুল হয়ে গেলে তো আর রক্ষে নেই। এমনিতেই বস দাঁত খিঁচিয়ে আছে। একটা চোরা ভয় যেন সরসর করে নেমে যাচ্ছে শরীর দিয়ে। ঘেমে যাচ্ছি। সোনা ক্ষ্যাপার ভ্রু দুটো আর ওঠা নামা করছে না। ভ্রু দুটোতে ভাঁজ পড়ে কাছাকাছি সরে এসেছে। দেখে মনে হল আমার মনের অবস্থা সে পড়ে ফেলেছে।

    ‘পাস? পাস’ ? আবার একটা বেখাপ্পা প্রশ্ন। আমাকে বিঁধল। ‘ফেল… ফেল…’  বলতে বলতে একটা ছেলে হাওয়ার মত পাশ দিয়ে চলে গেল। ‘তবে রে শালা…’ তেড়ে উঠে সোনা ক্ষ্যাপা তীক্ষ্ণ প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল অদৃশ্যমান সাইকেলটাকে লক্ষ্য করে। মাথার ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। কাঠফাটা রোদ আর গরমে মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। ঘামে জবজব করছে সমস্ত শরীর। বুঝতে পারছি পুরো ঘেঁটে গেছি। কতক্ষণে যে বাড়ি ঢুকব? বাড়ি ঢুকেই বাথরুমে শাওয়ারের তলায় দাঁড়াতে হবে। একটু বৃষ্টির খুব দরকার।

‘হোস? হোস’? কড়কড়ে গলায় বলে উঠল সোনা ক্ষ্যাপা। যেন বাজ পড়ল। কথাটা শেষ হতেই কানে এল ‘না,’। পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি একটা বাচ্চা ছেলে। ফের সোনা ক্ষ্যাপা বলল, ‘হোস, হোস’? ‘না, আমি ঘোষ নয়। দত্ত’। বলেই অদ্ভুতভাবে ছেলেটা হাসতে লাগল। হাসির আওয়াজটা ভাঙা বাঁশের মধ্যে দিয়ে হাওয়া চলাচলের মত। শুনে আমিও হাসতে লাগলাম। ছেলেটা আরও প্রবলভাবে হাসতে লাগল। আমাদের হাসিতে নির্দ্বিধায় নিজের হাসি জুড়ে দিল সোনা ক্ষ্যাপা। এরপরই হাসির শব্দে সামিল হল একটা গুরু গম্ভীর আওয়াজ। মেঘের ডাক। দেখতে দেখতে ঘন কালো মেঘের ঠান্ডা ছায়া ঢেকে ফেলল আমাদের তিনজনকে। আমাদের নিরবিচ্ছিন্ন হাসির শব্দ কলকল শব্দ করে বইতে লাগল।

2 thoughts on “অর্ঘ‍্য দে – সোনা ক্ষ্যাপা

  1. নাড়া দিয়ে গেল :
    “অন্তরে অতৃপ্তি রবে সাঙ্গ করি মনে হবে
    শেষ হয়ে হইল না শেষ…”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *