অদিতি ঘোষদস্তিদার – ঘরবাড়ি

প্রায়ই দেখি পাশের বাড়ির জোনাথন আমার গিন্নির পায়ে পায়ে ঘুরছে আর বকবক করছে। বছর পাঁচেক বয়েস। কথার ফুলঝুরি।

আমাদের ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে গেছে। একজন চাকরি করছে, আর একজন কলেজের হোস্টেলে। কালেভদ্রে ছুটিতে আসে। সোম থেকে শুক্র আমরা থাকি কাজে।

উইকেন্ডে সকাল থেকে জোনাথন এসে যায়। আজও এসেছে আর শুরু করেছে খবরের সাতকাহন। গিন্নি ঝাড়পোঁছে ব্যস্ত। তাই সে বসেছে আমার সামনের টুলে। হাতে চিপসের প্যাকেট।

“তুমি কি জানো দিদির দুটো বেড়ালের সঙ্গে আর একটা বেড়াল এসে খেলছে?”

জোনাথনের দিদি ওর থেকে অনেকটা বড়। সামনের বছর কলেজে যাবে।

 উত্তর দেবার আগেই কানে এলো পরবর্তী ঘোষণা।

“নতুনটা সাদা। ওটা মেয়ে।”

একটু ফাঁক পেয়ে যেই না বলে ফেলেছি, “তাই বুঝি?”

সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞের মত জবাব, “হ্যাঁ! তুমি কি জানো না কালো বেড়ালরা সবাই ছেলে হয়?”

সাদা কালোর লিঙ্গ বিভাজনতত্ত্বে প্রায় হেসে ফেলব ফেলব, ধেয়ে এলো প্রশ্নবাণ।

“তুমি কি জানো, দিদির পুরোনো বয়ফ্রেন্ড আর নেই? নতুন বয়ফ্রেন্ড হয়েছে। তারই এই সাদা বেড়াল।”

বিড়াল রহস্যের সুষ্ঠু সমাধান করে জোনাথন চললো রান্নাঘরে।

“জল দাও তো আমাকে! বরফ বেশি জল কম, আমাদের ফ্রিজে বরফ জমছে না!”

গলা ভিজিয়ে আবার সংবাদ সম্প্রচার।

“তুমি কি জানো কেন বাবা আজ সকাল থেকে জিনিসপত্র গোছাচ্ছে?”

আমার জানার পরিধি সীমিত। তাই ঘুরিয়ে প্রশ্ন করি, “কোথাও যাচ্ছেন বুঝি অফিসের কাজে?”

” তুমি দেখছি কিছুই জানো না। বাবা তো কাল থেকে অন্য বাড়িতে থাকবে।”

আমি চুপ মেরে গেলাম। অন্যদিকে মুখ লুকোতে গিয়েই দেখি আমার গিন্নির চোখের কোণে জল চিকচিক।

“বাবা বলেছে সামনের শুক্রবার আমাকে যেতে, দিদি নিয়ে যাবে!”

জোনাথনের দিদি ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়েছে কয়েক মাস। এদেশে চারচাকা, দেশের সাইকেলের মতন। না থাকলে জীবন অচল।

হঠাৎ জোনাথন উঠে এসে আমার কোলে বসল। মুখ তুলে আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করল, “বাবা আর কোনদিন আমাদের সঙ্গে থাকবে না, তাই না গো?”

পরিস্থিতি সামলাতে জোনাথনের স্ট্রাটেজিই কাজে লাগাই।

“তুমি কি জানো তোমার এখন দু’দুটো বাড়ি হবে থাকার?”

উত্তরটা বুঝতে সময় লাগল খানিকটা। বড় বড় চোখ মেলে তাকিয়ে রইল আমার মুখের দিকে খানিকক্ষণ। ধীরে ধীরে মেঘ কেটে মুখে হাসি।

“ঠিক বলেছ তো! ঠিক ঠিক!”

বলতে বলতেই একলাফে রান্নাঘরে গিয়ে গিন্নিকে জড়িয়ে ধরে হুকুম জারি, “শোন, আমি সামনের শুক্রবার বাবার কাছে যাবো। শনিবার রাতে ফিরবো। রবিবার সক্কাল বেলা এখানে আসব। তোমার পপকর্ন, চিপস সব কমে এসেছে, আইসক্রিমও খুব বেশি নেই। বাজার করে রেখো কিন্তু!”

আজই লিস্টি মিলিয়ে সব এনে রাখতে হবে। 

3 thoughts on “অদিতি ঘোষদস্তিদার – ঘরবাড়ি

  1. অপূর্ব গল্প ত!! বলার ভঙ্গি কী চমৎকার ঝরঝরে মেদহীন। আরো গল্প চাই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *