সংগ্রামী লাহিড়ী – ইমনকল্যাণ

সকালবেলায় দীপুর ঘুম ভেঙে গেল মায়ের হিসহিসে আওয়াজে|

‘আজ দু’সপ্তায় একটা পয়সা ঠেকিয়েছো বাড়িতে? ভাঁড়ারে টান, সে খেয়াল আছে?’

বাবা আজ একমাস হলো বাড়ি এসেছে| থাকেই না বাবা| যাত্রাপার্টির সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়| কি না কি সব রোগ ছড়িয়েছে, তাই এখন যাত্রার আসর বন্ধ|

কি ভালো গায় আর কত রাগ-রাগিণীর কথা বলে বাবা| দীপু আদ্ধেক বোঝে না সেসব কিন্তু নামগুলো ওর মনে গেঁথে যায়| ললিত,মধুমন্তী, ইমন| সে জানে, ললিতের সুরে সকাল হয় আর মধুমন্তীতে বিকেল নামে|

মা এসব শুনলে মুখটা বিচ্ছিরি করে বলে, ‘যেমন বাবা, তেমনি ছেলে| দুজনেই যাত্রাপার্টির সং| আমারও যেমন কপাল!’

বাবার মাথাটা কেমন ঝুলে যায়| বাজারের ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে যায় বাবা|

অথচ বাবা যখন থাকে না? মা যে কি ভালো| বিকেলে সুন্দর করে সাজে মা| আর ঠিক তখনি এসে হাজির হয় তপনকাকু| মার মুখ কিরকম আলো হয়ে ওঠে| সেই আলো-আলো মুখে মা বলে, ‘দীপু, পড়তে বোস|’ অনিচ্ছায় দীপু চলে যায় পাশের রান্না-খাওয়ার ঘরটায়|

দীপুর ইশকুলও বন্ধ| একদিকে বেঁচেছে সে| ইশকুলে কয়েকটা ছেলে মাঝেমাঝেই তাকে নিয়ে পড়ে| খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জানতে চায় তপনকাকু তাদের বাড়ী কখন আসে, কতক্ষণ থাকে, তার জন্যে কী নিয়ে আসে| দীপু অবাক হয়, ওরা কি তপনকাকুকে এতোই ভালোবাসে যে তার কথা আর শেষ হয়না? দীপুর অবশ্য খুব ভালো লাগে তপনকাকুর আনা চকলেট| কিন্তু রান্নাঘরে গিয়ে বসতে তার মোটেও ভালো লাগেনা| আর সেকথা বললেই ওদের কি হাসি! দীপুর মাথায় ঢোকে না এতে এতো হাসবার কি আছে|

মা আজ আর থামছেই না| বাবা ঘরে ঢুকে পাঞ্জাবী পরছে| দীপু একলাফে উঠে বসে, ‘কোথায় যাচ্ছ বাবা?’

‘যে চুলোয় ইচ্ছে যাক | খেতে দেবার ক্ষ্যামতা নেই, যাত্রাগানের গোঁসাই| তুমি কি পুরুষমানুষ?’ মার শানানো গলা|

মাথা নিচু করে বেরিয়ে যায় বাবা| দীপু ভয়ে ভয়ে উঠে মুখ ধুয়ে বই নিয়ে বসে|

মুড়ির বাটিটা ঠক করে বসিয়ে দেয় মা, ‘খেয়ে আমায় উদ্ধার করো|’

বেলা গড়ায়, ঝকঝকে রোদ্দুরেও মার মুখের আঁধার কাটে না| আজ কি সবই অন্যরকম? দুপুরের রোদ গায়ে মেখে ঢোকে তপনকাকু | আজ আর দীপুকে কিছু বলতে হয় না| নিজেই আস্তে আস্তে রান্নাঘরের জানলার পাশে গিয়ে বসে|

হঠাৎ চটকা ভাঙলো বাবার ডাকে| দু’হাতে তাকে তুলে ধরেছে, এখানে ঘুমোচ্ছিস যে? মা কোথায়?

দীপুর মনে পড়ে, দুপুরের পর মাকে আর দেখেনি সে|

বাবা শোবার ঘরে ঢোকে| তপনকাকুর দেওয়া মার হাতে-ঝোলানো ব্যাগটা নেই| আলমারীর তাকগুলো ফাঁকা| বাবা সন্ধানী দৃষ্টিতে কি যেন খুঁজছে| টেবিল থেকে তুলে নেয় একটা চিরকুট| আলুথালু বসে পড়ে| কিছুক্ষণ চুপচাপ |

মা কি তবে চলে গেছে কোথাও? মা তো কত বকতো, গাল দিতো| কই, বাবাকে তো কোনোদিন এমন ভাঙাচোরা দেখায় নি? দীপু কেমন করে যেন বুঝে নিয়েছে বাবাকে এখন কিছু জিজ্ঞেস করতে নেই| চুপচাপ কাছে গিয়ে শুধু বুকে মুখটা গুঁজে দিতে হয়| আর বলতে হয়, ‘আমি তো আছি বাবা|’

বাবার চোখে জল| দীপুকে জড়িয়ে নেয়, ‘মাকে ছেড়ে থাকতে পারবি দীপু?’

দীপু মুখ না তুলেই বলে, ‘তুমি আমায় গান শেখাবে বাবা?’

উফ, বাবা কি জোরে দীপুর মাথাটা চেপে ধরেছে| মাত্র কয়েক সেকেন্ড| তারপরই উঠে দাঁড়ায় বাবা| ‘দুনিয়ার সব সুর আমি তোকে শিখিয়ে দিয়ে যাবো দীপু| চল, আমরা নদীর জলে সূর্যাস্ত দেখে আসি| এখন ইমনকল্যাণের সময়| তারপর বাগেশ্রী হয়ে, মালকৌশ ছুঁয়ে আমরা ফিরবো ভৈরবীতে| নতুন ভোর হবে আবার|’

দীপুকে কাঁধে বসিয়ে নদীর দিকে হাঁটতে থাকে বাবা, অস্তগামী সূর্যের আলোয় মিশে যায় ইমনকল্যাণের সুর|

One thought on “সংগ্রামী লাহিড়ী – ইমনকল্যাণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *