রাখী সরদার – মৃত কদমবাস

সকাল থেকেই মেঘকেশরাশির মধ্যে বিদ্যুৎপর্ণার চকিত উদ্ভাস, তার সাথে ঝোড়ো হাওয়া, আকাশমণি গাছগুলো এমন হেলছে দুলছে মনে হচ্ছে এই বুঝি তাদের হাড়পাঁজর টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। হরনাথ দোতালার বারান্দা থেকে উঠোনের কোল ঘেঁষে থাকা আধবুড়ো কদম গাছটির দিকে তাকিয়ে আছে। বর্ষায় কদমফুলের ভারে গাছটি যেন একটু হেলে পড়েছে,তার উপর ঝড়ের দাপট,গাছটির কিছু ক্ষতি হবে  না তো! এক দলা কষ্ট আর কদমফুলের ভিজে গন্ধ পাক খেয়ে খেয়ে হরনাথের বুকের মধ্যে যেন জমাট বাঁধছে।

স্ত্রী সন্ধ্যার কথা এই ঝড় বাদলের দিনে বেশি করে মনে পড়ছে। সন্ধ্যার বড় প্রিয় ছিল গাছটি। কদমফুল খুব ভালোবাসতো। এরকমই এক ঝড়বাদলের দিনে মাত্র দু’দিনের জ্বরে সন্ধ্যা তাকে ছেড়ে চলে যায়। যাওয়ার দিনের সেই বিকেলের কথা হরনাথ আজও ভুলতে পারে না—

“শুনছো, আমার সময় হয়ে এসেছে, একটা কথা দেবে আমাকে?”

“কি সব বলছো! জ্বর হয়েছে সুস্থ হয়ে যাবে। এসব কথা কেন বলছো!”

“না গো, আমি বুঝতে পারছি, কথা দাও কোনোদিন ওই কদম গাছটি কাটবে না।”

” না,না,কেন কদম গাছ কাটবো! তুমি একটু বিশ্রাম নাও। আমি তো জানি বিয়ে হয়ে এ বাড়িতে এসে ছোট্ট গাছটিকে কিভাবে যত্নে বড় করে তুলেছো। কত সুখ দুঃখের সাথী এই গাছটি,তুমি অস্থির হোয় না।”

” তুমি কথা দিলে। জানো যখন আমি থাকবো না দেখবে রোজ রাতে জোনাকি হয়ে ওর পাতায় পাতায় উড়ে বেড়াব, তুমি ঠিক বুঝবে আমি এসেছি। আর যেদিন গাছটি থাকবে না জেনো তোমাকে নিতে…”

কথাগুলো বলতে বলতে সন্ধ্যা মৃত্যুকোলে ঢলে পড়ে। সেই থেকে হরনাথের যখনই খুব মন খারাপ করত রাতে চুপটি করে বারান্দায় বসে থাকতো, কিছুক্ষণ পর তার মনে হত একটি জোনাকি কদম গাছের পাতায় পাতায় জ্বলছে নিভছে।

আজ সারাদিন পর যত রাত বাড়ছে ঝড়ের প্রকোপ বাড়ছে। হরনাথ কেমন যেন অস্থির হয়ে পড়ে। বারান্দায় বসে বসে কদম গাছটির দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। বড় ব‌উমা রূপা একসময় এসে

বলে যায়— “বাবা ঘরের দিকে যান এবার। বেশ রাত হয়েছে।”

” যাব এবার, ব‌উমা একটা কথা …”

“বলুন বাবা।”

“ব‌উমা যা ঝড় হচ্ছে, ওই কদম গাছটা থাকবে তো? যদি না থাকে! তোমার শাশুড়ি মা যাওয়ার সময় বলেছিল…”

” কী বলেছিল বাবা? “

“বলেছিল যেদিন গাছটা …, থাক্ ব‌উমা, ঘুম পাচ্ছে, কাল বলবো।”

সেদিন অনেক রাত অবধি ঝড়বৃষ্টি হয়। হরনাথবাবু কতক্ষণ বারান্দায় কিসের অপেক্ষায় বসেছিলেন কেউ জানে না। পরদিন সকালে বৌমা রূপা বারান্দায় বেরিয়ে দ্যাখে সমস্ত গাছপালা ঠিক আছে কেবলমাত্র কদমগাছটি ঝড়ে শিকড় শুদ্ধ উপড়ে উঠোন জুড়ে পড়ে আছে। গাছটা যে তার শ্বশুর-শাশুড়ির কতটা প্রিয় ছিল তা জানতো। আর্তচিৎকার করে শশুরের  ঘরে ঢুকে বলে ওঠে— ” বাবা… কদমগাছটা যে ঝড়ে …”

তার মুখের কথা মুখেই থেকে যায়। সে দ্যাখে শ্বশুর মশাইয়ের নিথর নিস্পন্দ দেহটি খাটে পরে। ঘরের চারিদিক থেকে যেন কদমের সুবাস বের হচ্ছে, আর একটি মৃত জোনাকি হরনাথ বাবুর বন্ধ চোখের পাতার উপর স্থির হয়ে …

One thought on “রাখী সরদার – মৃত কদমবাস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *