দেবাশিস রায় – হেডলাইন

দরদর করে ঘামছেন পৃথা দেবী। বড্ড ধকল গেলো। বহুদিন হয়ে গেলো, যবে থেকে সিনেমা থিয়েটারে একটু নামডাক হয়েছে, এই দুপুর রোদ্দুরে বেরোনোর তেমন অভ্যাস নেই। আজও বেরোনোর একদম ইচ্ছে ছিল না। প্রডিউসার কয়েকদিন ধরে খুব চাপাচাপি করছেন বলে বেরোতে হোল। নতুন মুভি রিলিজ হবে অল্প কয়েকদিনের মধ্যে। এত বড় টিআরপি-র সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত হবে না। বাধ্য হয়ে পৃথা দেবী তাঁর আগামী সিনেমার নায়ক রাহুল কুমারকে নিয়ে আজ এই গনগনে রোদ্দুরে মিছিলে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন। হাঁটা বলতে চার কদম। কয়েকটা টিভি চ্যানেলের লোকজন এসেছিল। তাদের ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে দু’চার কথা বলতে হল। প্রডিউসারের  কথামত রাহুলের দিকে মাঝে মাঝে তাকিয়ে রোমান্টিক ভাবে হেসেছেন। ক্যামেরাতে ধরা পড়েছে সেসব। চ্যানেলে চ্যানেলে এবার বিদ্যুৎগতিতে খবর হবে। তবে কি পর্দার বাইরেও জুটি বাঁধতে চলেছেন রোমান্টিক নায়ক নায়িকা?  এবার বক্স অফিস হিট হওয়া কে আটকায় !

শাড়িটার দিকে তাকিয়ে কান্না পেলো। বুটিক থেকে সদ্য আনা। আজকের মিছিলের জন্য বিশেষ ডিজাইন করিয়েছিলেন। সবুজ শাড়ির আঁচলে সাদা পায়রা আঁকা অনেকগুলো। প্রথমবার পরেছেন। ঘামে ভিজে একদম নেতিয়ে গিয়েছে। ড্রাইভারকে বললেন গাড়ির এ সি আরও বাড়িয়ে দিতে। বিদেশী গাড়ির কাঁচে ঠাণ্ডায় বিন্দু বিন্দু জল জমছে। সেই বিন্দু বিন্দু জলকণা দেখে একটু নিশ্চিন্ত হলেন। মনের ভেতরে একটা ঠাণ্ডার অনুভূতি পেলেন। কেন যে এরা এই দুপুর রোদে এইসব মিছিলে মানুষকে হাঁটায়। পুরো ব্যাপারটাই বিরক্তিকর। এত রোদে বেরিয়ে এবার আবার এক প্রস্থ স্পা, জাকুজি, ফেসিয়াল, ম্যাসাজ, ম্যানিকিওর, পেডিকিওর করাতে হবে। যত্তসব! ঝামেলার শেষ নেই। চোখের মোটা কালো ফ্রেমের চশমাটা গাড়ির সিটের ওপর রেখে নিজেকে এলিয়ে দিলেন পৃথা দেবী। চশমাটাও নতুন। রাহুল কুমারের পরামর্শে কেনা। মোটা কালো ফ্রেমের চশমা পরলে না কি বুদ্ধিজীবীদের মত দেখায়। রাহুল কুমার নিজেও তেমন চশমা পরে আজ মিছিলে হেঁটেছেন। কাল সমস্ত খবরের কাগজের হেড লাইনে পৃথা দেবী আর রাহুল কুমারের উপস্থিতি এক প্রকার নিশ্চিত।

ব্যাগ থেকে আয়না বের করতে গিয়ে পৃথা দেবী মোবাইল বের করে ফেললেন। ব্যাগে আবার ফেরত পাঠাতে গিয়ে চোখ পড়লো হোয়াটসঅ্যাপে রাহুল কুমার বেশ কয়েকটা ছবি পাঠিয়েছেন। বেশ উঠেছে ছবিগুলো। আয়না ভুলে পৃথা দেবী মোবাইলে ছবিগুলো দেখতে লাগলেন। তারপর একটা ছবি বেছে নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করলেন। ক্যাপশন দিলেন — আজকের জনতার মিছিলে সামিল আমিও।

ঝটাপট লাইক, কমেন্টস পরছে। পৃথা দেবী নিশ্চিন্ত হলেন। মোবাইলটা ব্যাগে রেখে দিয়ে আয়নাটা এবারে বের করলেন। কখনো কখনো একটু নিজের দিকে তাকানো দরকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *