কৃপাণ মৈত্র- চোর

দরজায় সামান্য ঠেলা দিতে দরজা হাট করে খুলে গেল। রতনচোর ঘাবড়ে গেল। এমন তো হবার কথা নয়। এরা কি তবে জানতে পেরে গেছে যে সে আসবে! নিশ্চয় ভিতরে সকলে ঘাপটি মেরে বসে আছে। ঘরে ঢোকা মাত্র তাকে কব্জা করবে। রতন আস্তে আস্তে দরজা টেনে নিল। দরজায় কান পেতে বসে রইল। অনেকটা সময় গেল তবুও ভেতরে কোন শব্দ নেই। রতন একটা বিড়ি ধরাল। ইচ্ছে করে এক মুখ ধোঁয়া দরজার পাল্লা ফাঁকা করে ভেতরে ঢুকিয়ে দিল।  উদ্দেশ্য দরজার ওপারে কেউ থাকলে ধোঁয়া খোর না হলে কাশবে। কিন্তু না। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। আধখাওয়া বিড়ির মাথাটা মাটিতে ঘষে মাথায়  হাতজোড় করে চোরের কোন দেবতাকে স্মরণ করল সে। তারপরে হামা দিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল।  খবর আছে কর্তামশাইয়ের ঘরে অনেক মাল আছে। দরজায় আগল ছিল না। ঢুকলো সোজা কর্তাবাবুর ঘরে। সবে মশারিটা তুলেছে এমন সময় বুড়ো বলে, এত দেরি হল রতন।

রতন মশারি থেকে মাথা বের করে খাটের তলায় সিঁধিয়ে পড়ল।

বুড়ো বলে, হাঁটুর ব‍্যথায় খুব কষ্ট পাচ্ছি। একটু তেল মালিশ করে দে না বাবা, রতন।

রতন কী আর করে। সে বুড়োর গায়ে পায়ে তেল মালিশ করে দিল। বুড়ো তৃপ্তির একটা আঃ শব্দ করে  বলে, দে না বাবা মাথায় একটু বাম লাগিয়ে। বড্ড যন্ত্রণা হচ্ছে। সারারাত ঘুম হয় না ।

বুড়ো বলে, তুই নাশ্চয় গতজন্মে আমার ছেলে ছিলি। শোন, তোর জন্য গুছিয়ে রেখেছি। যা দেব তা ভাঙিয়ে খেলে তোর সাত পুরুষের ভাতের অভাব হবে না ।

আনন্দে রতনের চোখ দুটো চকচক করে উঠল। বুড়ো বলে, আমাকে একটা ঘরে নিয়ে চল না, রতন।

রতন দরজা পর্যন্ত গিয়ে আর যেতে চায় না। বুড়ো বলে, ভয়! কোন ভয় নেই ।কেউ তোর কোন ক্ষতি করবে না।

একটা ঘরে টিম টিম করে ডিমকি জ্বলছে। কুড়ি পঁচিশটি ঠাকুরের মূর্তি জ্বলজ্বল করছে। বুড়ো বলে, যেটা খুশি সেটা দিতে পারিস। ইচ্ছে করলে সবগুলো নিতে পারিস। সব মূল্যবান ধাতুর। রতন দমে গেল। তার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। চোখ জ্বালা-জ্বালা করতে লাগল। গা থেকে ঘাম ঝরতে লাগল।

বুড়ো বলে, বিক্রি করলে অনেক টাকা পাবি। ঘরে পুষলে অশান্তি পাবি। টাকা দিয়ে কিছুদিনের সংস্থান করতে পারবি। ঘরে রাখলে পায়ে বেড়ি পরিয়ে দেবে।

রতন ধপ করে বসে পড়লো।

– আমি চললাম। তুই ভেবে দেখ। আমি একা থাকি। তোকে বাধা দেওয়ার কেউ নেই। তুই কি চুরি করবি? আমি বলে চুরি হওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছি। যাক বাবা এতদিনে শান্তি দেখি কেমন চোর তুই।

পাখির বাসায় চঞ্চলতা। ভোরের হিমেল বাতাস জানলা দিয়ে ঘরে ঢুকেছে। রতন দুহাতে চোখ ঢেকে দেওয়ালে ঠক্কর খেতে খেতে দরজা দিয়ে বেরিয়ে উর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগল। শুনিয়ে শুনিয়ে বলল, এ আমার কম্মো নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *