মানস দাস – বাবা

অনেকক্ষণ হয়ে গেল ছোট্ট পিকলু ঠাই দাঁড়িয়ে। বাবার একটা হাতকে নিজের দুটো হাত দিয়ে ধরে ট্রেনের দুদিকের সীটের মধ্যি খানের সরু প্যাসেজটায় দাঁড়িয়ে সে। বাবার আর একটা হাত ট্রেনের ছাতের একটা হাতলে।  ট্রেনের  সব কটা হাতল প্রায়  হাত ভর্তি। পুজোর সময়। ট্রেনে ভীড় খুব স্বাভাবিক ব্যাপার তাই। পিকলুর স্কুলে পুজোর ছুটি। তাই সে চললো তার ঠাম্মার বাড়ী। এই সময়টা প্রতিবারই সে ওখানে চলে যায়। গ্রামের পরিবেশ। দিগন্তছোঁয়া মাঠের ক্ষেত,কাশের বন,গাছে ঘেরা শীতল পুকুর আর লাল মাটির ধূলো। বেশ মজা হয়। বারণ করার কেউ নেই। আর বারণ শোনারও। সারাটা দিন শুধু অকারণ এখান ওখান ছোটাছুটি। তাই আবার ঠাম্মার আদর বেড়ে পাওনা। অজান্তেই বাঁধনহারা এক আনন্দে তার মন কল্পনার নানা আঁকিবুঁকি  কেটে চলে সারাক্ষণ।   

কিন্তু এখন এই ভীড়ে  অনেকক্ষণ থেকে দাঁড়িয়ে একটুও ভাল্লাগছিলো না তার। হকারগুলোর একঘেয়ে চিৎকার অসহ্য  লাগছিল।

পিকলুর বাবা খানিক ইতঃস্তত করছিল। টিকিট কেটে ওঠা হয়নি তাদের। আসলে বাস থেকে নেমে নেমেই ট্রেনটা ঢুকে পড়েছিল। কোনোরকমে দৌড়ে পিকলুকে  নিয়ে উঠেছে এইখুব। টিকিট কাটার সুযোগটুকুও পায়নি। আবার মুশকিল হল এসব ছোটখাটো প্ল্যাটফর্মে ট্রেন দাঁড়ায় না বেশিক্ষণ। আর পরের ট্রেন অনেক পরে। অগত্যা বিনা টিকিটেই….।

কিন্তু অনেকক্ষণ হল,ট্রেনটা ছাড়েনি। পিকলুর বাবা ভাবছিল, নেমে টিকিটটা একবার কেটেই আসি তবে। আবার ভয়ও করছিল, পাছে ট্রেন ছেড়ে দেয় ! এদিকে টিটি উঠলে নির্ঘাত অনেকগুলো টাকার জলাঞ্জলি।

শেষমেশ পিকলুকে নিয়ে নেমে এল ওর বাবা। প্রায় আধ ঘন্টা পর। টিকিট কাটতে এগিয়ে গেল কাউন্টারে।

ফাঁকা কাউন্টারে টিকিট কাটা যখন শেষ, ট্রেন তখন হুঁইশল দিল। ঘন কালো চোঙের মত বিশাল ইঞ্জিনটা কালো ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে আস্তে আস্তে এগিয়ে চলল। ছুটে এসে পিকলুর বাবা উঠতে গেল চলন্ত ট্রেনে। পেছন থেকে ভীত পিকলু তখন জাপটে ধরে সমানে তাকে। কিছুতেই উঠতে দেবে না ওর বাবাকে…

*** 

তিতলি একটু বড় হয়েছে এখন। টলমলো পা এখন সোজা হয়ে গেছে। হাঁটতে হাঁটতে দৌড়তেও পারে বেশ।

সেদিন প্রথমবার তিতলিকে নিয়ে পার্কে গেল পিকলু। পার্কে ঢুকে এত বাচ্চাকে একসাথে হৈ হৈ করে খেলতে দেখে তিতলি বেশ আনন্দ পাচ্ছিল। ছোটো ছোটো পায়ে ছুটে ছুটে বেড়াচ্ছিল সবুজ ঘাসের ময়দানে। এটা ওটা নেড়ে ঘেটে দেখছিল নিজের মনে।

পার্কের সাইডে ট্রামলাইন দেখে হঠাৎ টেনে টেনে নিয়ে  গেল পিকলুকে ওখানে। তিতলি কখনো ট্রামগাড়ী দেখেনি। ট্রামের ছোট ছোট ঘর গুলোকে ওর খেলনা ঘরগুলোর মতো মনে হচ্ছিল। আনন্দে অবাক হয়ে গেল !

হঠাৎ ঘড়ঘড় শব্দে ট্রামটা ছাড়তেই  ভয় পেয়ে তিতলি ‘ বাবা ‘ বলে চিৎকার করে ছুটে এসে জাপটে ধরল পিকলুকে।

দীনময়বাবুর  ছবিটা তখন বড় বেশি করে মনে পড়ছিল পিকলুর। কি করবে ! তিতলির বাবা আজ নিজেই যে বাবাহারা! 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *