ধ্রুপদ ঘোষ- বর্ষা এল অবশেষে

অটোটা খাদিনামোড়ে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কিছুক্ষণ, প্যাসেঞ্জার হলে তবেই ছাড়বে। আষাঢ় পড়লেও বর্ষা আসেনি এখনও। স্কুল ফেরত এই সময়টা বেশ কষ্টের। প্রচন্ড তাপদাহে প্রকৃতির অবস্থা অনেকটা তূর্ণার জীবনের মতোই ছাড়খাড় হয়ে গেছে। গত মাসেই কেসটা আলিপুর কোর্টে উঠছে, জানি না কবে সে মুক্তি পাবে।নিখিলকে সে ভালোবাসে না আর – তবে তিন বছরের বিবাহিত জীবন কি তাকে এখনও ভাবায়?

অটো খাদিনামোড় ছেড়ে তালডাঙ্গার দিকে ছুঠছে, এক ছোকরা ড্রাইভারের পাশে বসে ভিউ ফাউন্ডারে তূর্ণাকে দেখছে আর তূর্ণা দেখছে তার বাঁ হাতের অনামিকার এন্গেজমেন্ট রিংটাকে -ম্যারেজ, গাঁজা আর মদ খেয়ে সেক্স, অশ্রাব্য গালাগালি, মারধর – আর কত সহ্য করবে সে? তার উপর এখন নাকি অন্য কোন পরকীয়া সম্পর্কে – ছিঃ ভাবতেও ঘেন্না হয়। পঞ্চাননতলায় এক বৃদ্ধা উঠলেন, বাকি দু’জন নেমে গেল বাগবাজারে। দক্ষিণে কালো করে মেঘ এসেছে। গতসপ্তাহে অনিকেত হোয়াটসঅ্যাপ করেছিল। পাঁচ বছরের পুরাতন প্রেম যেন উঁকি মারছে কালো মেঘের ফাঁক থেকে। অনিকেত এখন বলিউডের উঠতি স্টার – সিনেমার পর সিনেমা, আর তূর্ণার সামান্য স্কুলের চাকরি। অর্থোডক্স শ্বশুরবাড়ির জন্য থিয়েটারটাও ছাড়তে হল – লাভ কি হল বিয়ে করে – সেই তো! আঙুলের রিংটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে। ডিভোর্সের আগে ভেবেছিল নিখিল হয়ত শুধরে যাবে, কিন্তু না – ডিভোর্স হবেই। আরও ভেবেছিল আর ভালোবাসবে না কোনদিন, কাউকে – খুব শিক্ষা হয়েছে। কিন্তু লাস্ট উইকেন্ডের অনিকেতের সাবলীল – সাহসী – সুন্দর ব্যবহার তূর্ণাকে সন্তুষ্ট করেছে… না চাইতেও সকাল থেকে অনিকেতের কথা ভাবতে ভালো লাগছে তার কিন্তু নিখিলকে কি সত্যিই ভুলে যাওয়া যায় না! অনিকেতের চোখে সেই কাছে পাওয়ার যেন এক অদৃশ্য হাতছানি। কেরিয়ারের পিছনে ছুটতে গিয়ে প্রেমকে তুচ্ছ করে পথ হেঁটেছিল অনিকেত, তাই তো এত প্রশংসা – এত সুখ্যাতি – এত সাফল্য। অথচ নিখিল একটাও চাকরি জোগাড় করতে পারেনি বরং বিয়ের আগেরটাও মদ গাঁজার চক্করে খুইয়েছে। আর কত!

গতকালের অনিকেতের হোয়াটসঅ্যাপ বড় ভাবাচ্ছে তূর্ণাকে। কিছু ভুল হচ্ছে না তো! হাতের আংটিটা খুলে ব্যাগে রাখল।ওয়াটসআপে ইয়েস লিখে সেন্ড করল অনিকেতকে।

জ্যোতির মোড়ে ফুলের দোকানের সামনের জেব্রা ক্রসিং-এর উপর এসে দাঁড়াল সে, মাথার উপর কালো মেঘ থেকে গর্জন করে বৃষ্টি নামল। ছাতা আর ব্যাগ থেকে বের করল না তূর্ণা। দু’হাত মেলে দিল দুপাশে, বৃষ্টির ধারা তার চুল চুঁইয়ে – পিঠ খোলা কলমকারির ব্লাউজ ভিজিয়ে – ভিজিয়ে দিল কোমরের ভাঁজ – আহা, কি শান্তি! শহরে বর্ষা এল অবশেষে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *