গোবিন্দ মোদক – জলছবির সপ্তর্ষিমণ্ডল


অফিস থেকে বাড়ি ফিরছিল অজয়। এখনও ছ’টা বাজেনি। সূর্য ডুবে গেলেও এখনও যথেষ্ট আলো। ও বড় রাস্তা ছেড়ে ইঁটের রাস্তায় নামল। হঠাৎই ওর চোখের তারায় একটা সপ্তর্ষিমণ্ডল-এর মতো জলছবি ভেসে গেল— একবার নয়, দু’বার নয়, তিন-তিনবার! তিনবারই স্পষ্ট সেই জলছাপ বা জলছবিটা দেখতে পেল অজয়। ভয়ের একটা অজানা ঠান্ডা স্রোত ওর শিরদাঁড়া বেয়ে নামতে লাগলো! চোখে-মুখে ঘাম জমলো! দমাস্ দমাস্ করে বুকটা যেন জোর কদমে ঢেঁকির পাড় দিতে লাগলো!

এর আগেও খোলা চোখেই অজয় তার চোখের তারা জুড়ে সপ্তর্ষিমণ্ডলের ছবি ভেসে যেতে দেখেছে। একবার নয়! চার-চার বার! আর প্রতিক্ষেত্রেই তিনবার করে জলছবিটাকে ভাসতে দেখেছে! আর তারপরেই ঘটে গেছে অঘটন! প্রথমবার, তা আজ থেকে প্রায় বছর চল্লিশেক আগে— সেদিন সকালে সেই প্রথম বার চোখের ওপর আবছায়া মতো সপ্তর্ষিমণ্ডলের ছবিটা ভাসতে দেখেছিলো অজয় — তিনবার চোখের সামনে দিয়ে ভেসে গিয়েছিল সপ্তর্ষিমণ্ডলের ছবিটা। কিছুক্ষণ পরেই ওর ঠাকুমা মারা যায়! পরের বার সপ্তর্ষিমণ্ডলের জলছবিটা দেখে কলেজ থেকে ফিরতেই শুনতে পায় ভাইটা জলে ডুবে মারা গেছে!

তৃতীয়বারে যেদিন সে চোখে একইভাবে সপ্তর্ষিমণ্ডলের ছবি ভাসতে দেখে, সেদিন সে জোর করে চোখ চেপে ধরেছিল। কিন্তু কোনও লাভ হয়নি! সেদিনই সন্ধ্যায় বাবাকে হাসপাতালে দিতে হয়; রাত্রেই বাবার মৃত্যু হয়! তারপর থেকেই তীব্র আতঙ্কে ভুগতো অজয় — এই কখন বুঝি চোখে ভেসে আসে জলছবির সপ্তর্ষিমণ্ডল, আর ঘটে যায় অঘটন! সব সময় ভয়ে ভয়ে চলতো সে। কিন্তু একদিন যথারীতি সপ্তর্ষিমণ্ডল দেখতে পায় এবং চিৎকার করে ওঠে! সেদিন মা বাড়ি ছিল না, মামার বাড়ি গিয়েছিল। পরদিন মায়ের মৃতদেহ আসে! তারপর থেকে উদাস হয়ে গিয়েছিল অজয়, মনমরা-ও। কিন্তু তার চোখের তারায় সপ্তর্ষিমণ্ডলের জলছবি ভাসার সঙ্গে মৃত্যুর কি সম্পর্ক তা সে আবিষ্কার করতে পারেনি! তারপর বহুদিন হয়ে গেলো এসব ঘটনা আর ঘটেনি। অজয়ও যেন ভুলে গিয়েছিল সে সব কথা। কিন্তু বহুদিন পর আজ এই পড়ন্ত বেলার নিভন্ত আলোয় তিন-তিনবার সপ্তর্ষিমণ্ডলের জলছবি দেখবার পরই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে অজয় । এবারও কি তবে?

তাড়াতাড়ি পা চালায় অজয়। রাস্তা সংক্ষেপ করতে আলপথ ধরে সে। হঠাৎ নজরে পড়ে কালো মৃত্যুর মতো মিশমিশে একখানা কালসাপ ওর চলার পথে এসে পড়েছে ওর হাতদু’য়েকের মধ্যে — ধীরে ধীরে প্রসারিত হচ্ছে সাপটার কালান্তক ফণাটা …!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *