শান্তনু চক্রবর্তী – একটি জীবন


উমারানীর বিয়ে হয়েছে পুতুল খেলার মতো। বারো বছর বয়স তখন। ষোলো বছর বয়স হলে স্বামীর কাছে পাঠানো হয়,পাটনায়। উমার স্বামী সেখানে পোস্টমাস্টার ছিলেন। শুরুর দিকে ভয়ই পেতেন, জবুথবু হয়ে চারটি বছর প্রবাসে কাটিয়ে স্বামীর সাথেই ফেরেন উমা শহর কলকাতাতে। উমার স্বামী চাকরি ছেড়েই ফিরে আসেন। শুরু করেন পৌরোহিত্য। ফলে সম্বল যা ছিল, দ্রুত সেসব শেষ হয়ে এল। ততদিনে উমা অনেক পরিণত। কোনভাবে হার না মেনে সেলাই মেশিন চালিয়ে দুটো পয়সা রোজগার করাও শুরু করেছেন। এর মধ্যে পরপর দুই মেয়ের পরে দুটো ছেলে এল। আর দুটো  পেটেই গেল, যেভাবে যায়। এইভাবে আস্তে আস্তে বাচ্চাগুলো বড় হলো এক এক করে সবাই। দুইমেয়ের বিয়ে দিয়েই কোন এক ভীষণ ঝড়ের রাতে চলে গেলেন উমার স্বামী। তবু দমেন নি উমা। মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু শ্বশুরবাড়ির কল্যাণে কলকাতায় ছিল বলে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই চালিয়ে যান।

বড়ছেলে চাকরি পেল, রেলে। একটু যেন শান্তি পেলেন উমা। মা, ভাইকে নিয়ে একটু সুযোগ পেলে পুরীও নিয়ে গেছে সেই। বিয়ের পরে বৌমা এল, উমার কাজের সাথি। ছোটটাই যেন কেমন ধারা, কিছুতেই মতি নেই। সত্তরের সেই টালমাটালে অনেক কিছুই হলো। একদিন কারা বলে গেল ছেলেটা নাকি শহীদ এখন। তারপর তো কত বদল, বাড়ি বিক্রি হলো। শহরতলির একটা ফ্ল্যাটে সবাই চলে এলো, সেখানেই একটা ছোট্টঘরে বন্দি ছিলেন উমা। যদ্দিন না মহামারি এলো।

সেদিন যখন ওরা হাসপাতালে ভর্তি করে দিল। উমা বুঝলেন সময় হলো। শ্বাস উঠলে ওরা বলল, ভেন্টিলেটার লাগবে। শুধু হাতটা নাড়ার ক্ষমতা ছিল উমার তখন। কোনমতে বোঝালেন, বারণ করো, লাগবে না আমার। পাশের বিছানায় আরো একজনের তখন একই অবস্থা। উমা যেন মনে মনে বললেন, আমার পৃথিবী দেখা হয়ে গেছে,ওই ছেলেটা সেদিন এলো,চাঁদপানা মুখ। ওদের বাঁচাও তোমরা এখন,তাতেই আমার সুখ।

One thought on “শান্তনু চক্রবর্তী – একটি জীবন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *