রবীন বসু- ভাসমান অন্ধকার


টুম্পার মাথা ঠিক মত কাজ করছে না। সারাদিনের ক্লান্তি খিদে, তলপেটে মাসিকের যন্ত্রণা সব ভুলতে একটু বেশি ডেনড্রাইট নিয়ে ফেলেছিল। তাই কাত খেয়ে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। চটকা ভাঙতে দেখে ট্রেনের কামরায় শুধু সে আর একটা মাঝবয়সী লোক। চোখটা একটু বড় করে খুলে দেখে তার দিকে পিটপিট করে চেয়ে আছে। এখনো দু’টো স্টেশন পরে সে নামবে।

হাতে রুমাল নিয়ে তার দিকে এগুচ্ছে এবার লোকটা। লাইনে ভিক্ষে করা টুম্পার অভিজ্ঞতা বলছে লোকটার চোখের ভাষা ভালো না। হয় ক্লোরোফর্ম মেশানো রুমাল ওর নাকে গুঁজে ওকে অজ্ঞান করে শরীর নিয়ে খেলবে। তারপর চলন্ত ট্রেন থেকে রেললাইনের ধারের ঝোপে ঠেলে ফেলে দেবে । না হলে মেয়েপাচারের আড়কাঠিদের হাতে বিক্রি করে দেবে । তারা কিনে নিয়ে অন্য প্রদেশে চালান করবে । অন্ধকার খুপরি ঘরে বেশ্যা হয়ে জীবন কাটাতে হবে । তা না হলে হাত-পা ভেঙে ভিক্ষে করতে বসাবে ফুটপাতে।

টুম্পা উঠে দাঁড়ায় । আড়চোখে একবার দরজাটা দেখে নেয় । আজ এই বিপদে একটা মুখ খুব মনে পড়ছে । স্টেশনের বুড়ো চা-দাদু । মা তাকে ফেলে একদিন কোথায় চলে গেল । দাদুই তাকে মানুষ করেছে ছোট থেকে । প্ল্যাটফর্মে চায়ের দোকান ছিল । দেকানের কাজে দাদুকে সাহায্য করত ।  দাদু হঠাৎ ট্রেনে কাটা পড়তে নিরুপায় হয়ে ভিক্ষে করে । এখন ভয় আর বিপদের মধ্যে টুম্পা ভেবে নেয় তাকে এই অসভ্য লোকটার হাত থেকে যেকোন ভাবেই বাঁচতে হবে ।

লোকটা নিঃশব্দে এগিয়ে আসছে তার দিকে । টুম্পা দেখল তার ময়লা হাতে লম্বা লম্বা নখ গজাচ্ছে । গায়ের চামড়ায় লোমশ লোম । চোখে লালসার মাংসল লোভ । জিভ দিয়ে লালা ঝরছে। রাক্ষসটা তার ওপর ঝাঁপ দেবার আগেই টুম্পা তার হালকা অবসন্ন শরীরটা বাতাসে ভাসিয়ে দিল ট্রেনের দরজার বাইরের অন্ধকার লক্ষ্য করে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *