তিস্তা চক্রবর্তী- বিড়াল


একে তো জষ্ঠিমাসের আগুনে গরম,  তার ওপর সকাল থেকে গ্যাসের সামনে! গাদাখানেক মাছ ভাজতে ভাজতে শরীরটা খুব অস্থির লাগছিল রুমির। এই আঁশটে গন্ধটা…!
 
হালকা কোনো পোশাক যে পরবে, সেই উপায়ও নেই। পিসিঠাম্মির কড়া নজর সব দিকে। অল্প বয়সে বিধবা হয়েছিলেন সুধাময়ী। সুধারসও সেই সঙ্গেই…সাংঘাতিক খিটখিটে মহিলা। একচুল আচারবিচার এদিকওদিক হয়েছে কী বাক্যবাণে জর্জরিত করে ফেলবে সবাইকে।
 
বিয়ের ঠিক দু’মাসের মাথায় বাইক অ্যাকসিডেন্টে সায়কের হঠাৎ চলে যাওয়াটা আজও কেউ মেনে নিতে পারেনি। শাশুড়িমা তো সেই থেকে রুমিকে সহ্যই করতে পারেন না। আত্মীয়স্বজনও সবাই ঠারেঠোরে শুনিয়ে দিয়েছে যে বাপ-মা মরা ভাগ্নীকে ঘাড় থেকে নামাতে রুমির মামা নির্ঘাত কুষ্ঠিতে কোনো গোঁজামিল চালিয়েছিলেন, নাহলে এমন তো হবার কথা নয়!
 
গতকাল সায়কের বাৎসরিক ছিল। রুমির দুই বড় ননদ আজ ফিরে যাবে যে যার বাড়ি। তাদের জন্যই এই সামান্য আয়োজন! রান্নার পাট চুকিয়ে স্নান সেরে তবে একটু শান্তি। নিজের বিছানায় উপুড় হয়ে মোবাইলে খুটখাট করছিল রুমি। তিনটে বাজে প্রায়। খিদেটা চাগাড় দিচ্ছে খুব। রান্নাঘরে যাবার জন্য বিছানা ছেড়ে নামতেই দরজায় টোকা।
 
“পিসিঠাম্মি তুমি!”
 
গম্ভীর মুখে রুমির ঘরে ঢুকেই দরজায় ছিটকিনি তুলে দিলেন সুধাময়ী। ঘরের চারদিকে খর দৃষ্টিতে কী যেন খুঁজছেন। হাতে একটা ঢাকা দেওয়া প্লেট।
 
“পশ্চিমের জানালাটা বন্ধ করে দে নতুনবৌ…”
 
রুমি প্রমাদ গোনে। ফের কিছু ভুলচুক হল নাকি… ভ্যাবলার মত তাকিয়ে আছে দেখে সাথেসাথে ধমক, “কথা কানে যাচ্ছে না নাকি!” রুমি ঝটপট জানালা বন্ধ করে পেছন ঘুরতেই দেখে বুড়ি মিটমিট করে হাসছে। প্লেটের ঢাকনা সরানো। মাছভাজা!
 
“হাঁ করে দেখছিস কী মুখপুড়ি, গিলে উদ্ধার কর আমায়। মাছের গন্ধে যে তোর নোলা টসটস করে সে কী আর জানি না!”
 
জল উপচে আসে রুমির চোখে। ঠোঁটের কোণে হাসি। ওবাড়িতে সবাই তাকে ‘বিলাই’ বলে খেপাতো। প্লেটটা হাতে নিয়ে একটুকরো মাছ ভাঙে রুমি। তারপর সুধাময়ীর মুখে গুঁজে দিয়ে বলে, “নাও দজ্জালবুড়ি, নিয়মভঙ্গ করলাম…”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *