সুব্রত কুমার ঘোষ – নতুন আলো


–হাড় মাস জ্বালিয়ে খেলে। এতো বয়স হল মরেও না । প্রতিদিন কাপড়ে-চোপড়ে করে রাখবে। ছিঃ–  নাকে আঁচল চেপে গজগজ করছিলো অনিমা। তারপর চেঁচিয়ে কর্কশ গলায় বললো –শুনছো–। সদর বাড়ি থেকে ছুটে এলো বিনোদ। –আঃ চিৎকার কোরো না। করে দিচ্ছি।
— করো তাড়াতাড়ি। ঝাঝিঁয়ে উঠল অনিমা –ঘরটা নরক করে তুলেছে–ওয়াক-থু ! বাড়িতে নতুন বৌ –গজগজ করতে করতেই  বেরিয়ে গেলো।

বিনোদ মায়ের কাপড়টা খুলছিল। ছিয়াশির  সরলা ফ্যালফ্যাল করে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলো। এখনো জড়িয়ে জড়িয়ে কথা বলে বটে তবে তার কথা কেউ শোনেও না আর গুরুত্বও দেয় না, তাই প্রায় বন্ধই হয়ে গেছে।  কিন্তু মনের ভিতরে এখনো অনেক কথা কিলবিল করে, বলতে চায়। এই ছয় ফুট বাই ছয় ফুটের প্রায়অন্ধকার ভাঁড়ারঘরে থেকে থেকে চোখের জ্যোতিও আজ প্রায় ম্রিয়মান।সঙ্গী বলতে চার চার কাঠের এই তক্তাপোষ আর চার ফুটের একটি বাঁশের লাঠি–যার অবলম্বনে  দু-এক পা ফেলতে পারে ঘরের ভিতর।
কিন্তু এতে আশ মেটেনা।একবার পাড়া ঘুরতে বড়ো সাধ হয়। কেউ একবার একটুখানি ধরলে ঠিক পারতো। কিন্তু কে ধরবে! নাতবৌটাও এখেনে আসেনা–সেই বিয়ের সময় একবার দেখেছে—
সরলা ছেলের মুখের পানে তাকিয়ে জড়ানো কণ্ঠে বলল –“য্যা-বো-। ভিতর থেকে একদলা ঘরঘর আওয়াজ বেরিয়ে এলো। বিনোদ কি বুঝলো কে জানে, ‘এখনি খেতে দেব, ওর তাড়া আছে’, বলতে বলতে চলে গেলো।
সরলা হতাশ হয়ে গুটুলি পাকিয়ে তক্তাপোষ এ শুয়ে পড়লো।
 
–ও কি করছো বৌমা?
 অনিমা দেখলো উঠোনে একগাদা পুরোনো জিনিস ডাই করা। ওর বিয়ের পুরোনো এটাচি, বেনারসি, বাবুর ছোটবেলার স্লেট,শশুর-শাশুড়ি- বিনোদ আর ওর বাঁধানো সাদাকালো ছবিটা,  শশুরের জীর্ণ কাশিদাসী রামায়ণ, পুরোনো চেয়ার,  ওর দেওয়া প্রথম উপহার ঝিনুকফ্রেম আয়নাটা ——
–এগুলো ঠাম্মির ঘরে রেখে দি ।পুরোনো নষ্ট জিনিস, ঘরে জায়গা জোড়া হয়ে আছে।
অনিমা বৌমার মুখের দিকে একবার তাকালো।  কিন্তু কিছু বললো না। ভিতরে একটা অস্বস্তির কাঁটা খচখচ করছিলো। মাথা নিচু করে কি যেন ভাবলো।তারপর হটাৎই বসে পরে ছবিটা তুলে নিয়ে আঁচল দিয়ে মুছতে লাগলো।
–অনেকদিন পরিষ্কার করা হয়নি। ধুলো জমে গেছে।–আপনমনেই কথাগুলো বললো অনিমা। তারপর বৌমার দিকে চেয়ে — শোনো মা, আজ বিকেলে তোমার ঠাম্মিকে ঘিয়ে রঙের তাঁতের শাড়িটা পরিয়ে দিয়ো তো। একবার পাড়াটা ঘুরিয়ে আনবো।
বৌমা দেখলো শাশুড়ির চোখের কোনে একচিলতে নতুন আলো চিকচিক করছে।

One thought on “সুব্রত কুমার ঘোষ – নতুন আলো

  1. খুব সুন্দর লাগলো। হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া লেখা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *