অরূপম মাইতি – আত্মসম্মান


ছিটকিনি খুলেই প্রশ্নবাণ
-এত দেরি হল?  কোথায় ছিলে?  কিস্তির ঝামেলা মিটল?
অন্য দিনে  মাধব তেড়ে উঠত। আজ চুপচাপ ঘরে ঢুকল।
-কলে জল আছে?   পাম্পে জল উঠেছে?  খোকা ফোন করেছিল?
 
মিনতি জানে কত্তার মুখ থমথমে থাকলে ঘাঁটাতে নেই। খাওয়ার টেবিল থেকে একটা চেয়ার টেনে,  মুখ নীচু করে বসল মাধব। মিনিট দশেক পরে ভিতর থেকে ঘুরে এসে মালতী বলল, -গেঞ্জী, পায়জামা বাথরুমে রেখে এসেছি। যাও,  স্নান সেরে এসো।
ততক্ষণে মাধব তোয়ালে জড়িয়ে নিয়েছে। বাইরে মেঘ ডাকছে। মুহূর্তে একটা বাজ পড়ল।
-চট করে ঢাকনা এনে দাও। গাড়িতে চাপা দিয়ে আসি।
 
পৈতৃক বাড়ির সঙ্গে প্রাপ্তি কিছুটা জমি। সে জমি গাড়ি রাখতে কাজে দেয়। সর্দি-জ্বর থেকে সেরে উঠে দিন পনেরো বাদে আজই প্রথম ভাড়া খাটতে বেরিয়েছিল মাধব। গত মাসে কিস্তির টাকা ভেঙে কলেজের সেমিস্টার ফি দিয়েছে। কিস্তি দিতে ব্যাঙ্ক থেকে বার দশেক ফোন এসেছে।
ভাষা মেঘের বৃষ্টি। এক পশলা হয়ে, এখন থেমেছে। রুটি সেঁকতে সেঁকতে বাথরুমে জল পড়ার দিকে কান পেতে রেখেছিল মিনতি। মানুষটা সারাদিন গাড়ি নিয়ে শহরময় ছুটে বেড়ায়। খুব চিন্তা হয় মিনতির।

-এ মাসেও কিস্তি ঠিক সময়ে দিতে পারব বলে মনে হচ্ছে না।
মাধব একটু স্থির হয়েছে। শান্তিতে কথা বলছে।   
-ওরা যদি গাড়ি তুলে নিয়ে যায়?
 -সেটাই তো চিন্তার। এঁটো বাসন তুলতে তুলতে মিনতি বলে ওঠে।
 -বাথরুমে ঢোকার আগে তুমি কি শোওয়ার ঘরে ঢুকেছিলে?
ভুরু কুঁচকে মাধব উত্তর দেয়, আজকাল কি আমার ওপরে নজরদারি করছ!
 
….

সকালের চা এক সাথে খাওয়া স্বামী-স্ত্রীর অনেক দিনের অভ্যাস। চায়ের কাপ বাড়িয়ে দিয়ে,  আমতা স্বরে মিনতি বলে ওঠে, -ভগবানের দান! তুমি ওখান থেকে দু মাসের কিস্তি শোধ করে দাও।
ধনুকের ছিলার মত ছিটকে ওঠে মাধব।
-তুমি কি করে জানলে?  ব্যাগ খুলে দেখেছ? 
তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে আলমারির ড্রয়ার খুলে ফোলিও ব্যাগটা বার করে ফিরে এসে সোফায় বসে মাধব। চেন খুলে দেখে পাঁচশ টাকার চারটে বাণ্ডিল ঠিকঠাক গায়ে গায়ে সাজানো।
কাঁদো কাঁদো গলায় মিনতি বলে ওঠে, বালা জোড়া ব্যাঙ্কে বাঁধা রেখে কিস্তি মিটিয়ে দাও। আমাকে তুমি এই চিনলে!
স্ত্রীর চোখের জল মুছে দিয়ে মাধব বলে ওঠে, মন্দিরের কাছাকাছি খোঁজ করলে লোকটাকে পেয়ে যাব। ভাবছি ব্যাগটা ফেরত দিয়ে কাজে যাব।
গাড়ি ছাড়ার আগে কাচের জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে মিনতি বলে, আমাকে জানিও। খুশি হয়ে কিছু দিতে চাইলে নিও না। আত্মসম্মান সবার আগে!
 
মিনতির দিকে তাকিয়ে চব্বিশ ঘন্টা বাদে হেসে ওঠে মাধব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *