হায় কে জানিত- অপূর্ব দে


সেদিন ছিল শনিবার।১৫জুলাই,১৯১১।সন্ধ্যার পর থেকেই বৃষ্টি হচ্ছিল। তিনি যখন মিনার্ভা থিয়েটারে উপস্থিত হলেন, তখন মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছিল। খুব কম দর্শক হাজির ছিল। পঞ্চাশ টাকার বেশি টিকিট বিক্রি হয় নি।মিনার্ভার মালিক মহেন্দ্রলাল মিত্র বললেন, ‘এই  দুর্যোগেও এত অল্প বিক্রয়ে, নিস্ফল অভিনয়ে,আপনার ঠান্ডা লাগাইয়া স্বাস্থ্যভঙ্গ করিবার প্রয়োজন নাই।’ যাঁকে বলা হলো তিনি তখন হাঁপানি রোগে ভূগছেন। মাঝে মাঝে কাশী চলে যেতেন। চিকিৎসকের পরামর্শে বিশ্রাম নিতে। ফিরে এসে কাজে ডুবে যেতেন। তখন আর স্বাস্থ্যের দিকে লক্ষ্য রাখতে পারতেন না। সেদিনও শরীর ভালো ছিল না। তথাপি অভিনয় বন্ধ করতে রাজি হলেন না। তিনি মহেন্দ্রবাবুকে বললেন যে, এই ভীষণ দুর্যোগে মুষলধারায় বৃষ্টি উপেক্ষা করে যাঁরা আমার অভিনয় দেখতে এসেছেন, তাঁদের আমি বঞ্চিত করব না। এতে যদি স্বাস্থ্যভঙ্গ হয় তো কী করা যাবে। সুতরাং অভিনয় বন্ধ হল না। তিনি ‘বলিদান’ নাটকে করুণাময় চরিত্রে অভিনয় করবেন। তাঁর অভিনয় দেখার জন্যই সেই দারুণ দুর্যোগেও ক্রমে দর্শকের সংখ্যা বাড়তে লাগলো। বিক্রি বেড়ে দাঁড়াল প্রায় চারশো টাকা। 
 
          মিনার্ভা থিয়েটারে ‘বলিদান’ প্রথম অভিনয় হয় ১৯০৫ সালের ৮ই এপ্রিল। এ নাটকে কৌলিন্য তথা বরপণ প্রথার বীভৎস রূপ তুলে ধরা হয়েছে। নাটকের শেষে বিশেষ এক চরিত্র ঘনশ্যাম বলে, ‘বাঙ্গালায় কন্যা সম্প্রদান নয়-বলিদান!!’ আজকের অতি আধুনিক যুগেও এ সংলাপের গুরুত্ব ম্লান হয় নি। ‘বলিদান’-এর প্রথম রজনীতে ২৮৬টাকা বিক্রি হয়।ষষ্ঠ রজনীতে হয় ৫৪৪টাকা। পরে ট্রামে, বাসে, ঘোড়ার গাড়িতে ‘বাদুর ঝোলা’ অবস্থা দাঁড়াল। এর আগে দর্শক না আসায় মিনার্ভা থিয়েটার দর্শকদের বই উপহার দিতে লাগল। অতুলকৃষ্ণ মিত্রের গ্রন্থাবলি।বাংলা থিয়েটারে বই উপহার প্রথম মিনার্ভাই চালু করে। এ ব্যাপারে বিশেষ সহযোগিতা করেছিলেন ‘বসুমতী’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ও স্বত্বাধিকারী উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়।’বলিদান’ প্রযোজনার সময় থেকে বই উপহার দেওয়ার প্রথা উঠে গেল।আর দর্শক আকর্ষণের জন্য উপহার নয়, দর্শক নিজেই আকৃষ্ট হতে লাগলো। হবেই বা না কেন? অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফি(রূপচাঁদ), দানিবাবু(দুলাল চাঁদ), অপরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়(কিশোর), হাঁদুবাবু(রমানাথ), তারাসুন্দরী(সরস্বতী), সুশীলাবালা(জোবি) কিরণবালা(কিরণময়ী) প্রমুখ সে সময়ের খ্যাতনামা অভিনেতা -অভিনেত্রীরা অভিনয় করেছিলেন। করুণাময় চরিত্রে অভিনয় করতেন স্বয়ং বাংলার গ্যারিক গিরিশচন্দ্র ঘোষ। নাটকটির পরিচালক ছিলেন তিনি ও অর্ধেন্দুশেখর। মেট্রোপলিটন ইনষ্টিটিউসনের প্রিন্সিপাল সুপন্ডিত এন. ঘোষ ‘ইন্ডিয়ান নেশন’ পত্রিকায় লিখেছিলেন ‘The play is an intensely realistic tragedy… Babu Girish Chandra Ghosh, the talented author of the play, plays the part of Karunamoy to perfection. Most of the actors and actress are up to the mark.’ (১৪.০৮.১৯০৫)।
 
      গিরিশ খালি গায়ে করুণাময় চরিত্রে অভিনয় করতেন। সেদিনের দুর্যোগপূর্ণ রাতের শীতল আবহাওয়ায় গিরিশের ভীষন ঠান্ডা লেগে যায়।পরদিন থেকেই তিনি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রচন্ড হাঁপ বেড়ে যায়। সুপ্রসিদ্ধ কবিরাজ ও পন্ডিত শ্যামাদাস বাচস্পতির অধীনে চিকিৎসা করতে থাকেন।গিরিশের বাড়ির সামনে বস্তি থাকায় প্রচুর ধোঁয়ার দূষণ। ফলে শ্বাসকষ্ট আরও বেড়ে যায়। এর আগে তিনি এরকম অবস্থায় কবিবন্ধু সুরেন্দ্রনারায়ণ রায়ের ঘুঘুডাঙ্গার বাড়িতে গিয়ে থাকতেন। এবার সেখানে ম্যালেরিয়া হওয়ায় যেতে পারলেন না।সেবার কলকাতায় প্রচন্ড শীত পড়লো।এদিকে কবিতা লেখা, ‘তপোবল’ নাটকের প্রস্তুতি নেওয়া ইত্যাদি সব কাজই চলতে লাগল। এসবের যোগফল ১৯১২ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি(২৫শে মাঘ, ১৩১৮বঙ্গাব্দ), বৃহস্পতিবার রাত একটা কুড়ি মিনিটে তাঁর নামের আগে ‘ঈশ্বর’ কথাটি বসে গেল। কে হায় জানিত যে, ১৫ই জুলাইয়ের(১৯১১)কালরাত্রি গিরিশের অভিনয়ের শেষ রজনী! 

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাহিত্যিক বিভাস রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার

X