আদি উৎসের নিহিত তাৎপর্যেই অজাচারের বিস্তার- তৈমুর খান

আমার ছোটবেলায় ঠাকুরমা একটা গল্প বলতেন।
বহু বছর আগের কথা। এক গৃহস্থ বাড়িতে পরপর সাতটা পুত্রসন্তান জন্মে। শেষের অষ্টম সন্তানটি হয় কন্যা। স্বাভাবিকভাবেই খুব আদরের।তার নাম রাখা হয় চম্পা। চম্পার ছয় জন দাদারই বিয়ে হয়ে যায়। কেবল ছোটদারই বিয়ে হতে বাকি। একদিন চম্পার ছোটদা একটি পাকা আম কুড়িয়ে এনে চালের বাতায় তুলে রাখে। আর তার ছয় বউদিকে শাসিয়ে বলে :’যে আমার এই আমটি খাবে, আমি তাকেই বিয়ে করব ; এই আমার প্রতিজ্ঞা।’ কথাটি শুনে তার বউদিরা খুব হাসাহাসি করে আর মজা করার জন্য চম্পাকে ডেকে আনে এবং বলে :’তোমার জন্য একটা পাকা আম রাখা আছে, খেয়ে নিও।’
ননদ তো আম পেয়ে মহানন্দে সঙ্গে সঙ্গে এসে খেয়ে ফেলল। ছোট দেবর তখন জানত না। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে আম দেখতে না পেয়ে হুলুস্থুল কাণ্ড করে ফেলে। চম্পা জানতে পারল দাদার প্রতিজ্ঞার কথা। তখন সে মনের দুঃখে ছোট্ট একটা নৌকা নিয়ে মাঝ নদীতে ডুবে মরতে গেল।তখন তাকে বাড়ির সব লোকেরাই একে একে ফেরাতে গেল আর বলল:
‘ফিরে এসো চম্পা তুমি যেও না গো দূরে।
তুমি না থাকলে আমরা থাকব কেমন করে।।’

চম্পা প্রত্যেককেই  সম্পর্ক ধরে ধরে উত্তর দিল। মাকে বলল:

‘মা হয়ে হ’বা শাশুড়ি কেমন করে গা।
ডুব ডুব রে শিমুল কাঠের না।।’

বাবাকে উত্তর দিল:

‘বাবা হয়ে হ’বা শ্বশুর কেমন করে গা।
ডুব ডুব রে শিমুল কাঠের না।।’

বউদিদের উত্তর দিল:

‘বউদি হয়ে হ’বা জা কেমন করে গা।
ডুব ডুব রে শিমুল কাঠের না।।’

সবশেষে তার ছোটদাকে উত্তর দিল:

‘দাদা হয়ে হ’বা স্বামী কেমন করে গা।
ডুব ডুব রে শিমুল কাঠের না।।’

আর ফিরল না সে অনেকদূর ভেসে চলে গেল।

  ওই কম বয়সেই তখন বুঝেছিলাম বোনের সঙ্গে দাদার বিয়ে হয় না। প্রতিজ্ঞা করলেও হয় না। মানসিক ঘৃণা ও যন্ত্রণা দূরে সরিয়ে দেয়।
কিন্তু 'আজাচার' শব্দটা তো এমনি এমনি সৃষ্টি হয়নি।ইসলামের একটি শরিয়তি গ্রন্থ 'কসসুল আম্বিয়া'তে আছে : পৃথিবীতে মাত্র দুটি নারী ও পুরুষ আদম এবং হবার সৃষ্টি হয়েছিল। তাঁদের ওপরই বংশবিস্তারের দায়িত্ব পড়ে। তখন একই পেটের ভাই বোনের মধ্যে যৌন সম্পর্ক অথবা বিবাহ প্রচলিত হয়। সেদিক থেকে আমরাওতো অজাচার জাত সন্তান-সন্ততি। ইডিপাস না জেনেই তাঁর পিতাকে হত্যা করে মায়ের শয্যাসঙ্গী হয়েছিল। পরে জানতে পেরে নিজেকে অন্ধ করে রেখেছিল। কিন্তু যৌনাচার তো অন্ধ আদিম।ছাগলের বা পশুদের মতো মানুষেরও এই যৌনচেতনা অস্বাভাবিক নয়। শুধু বিবেক বৃত্তি জাগরিত হয় বলে কখনো কখনো তা অপরাধবোধের ধারণাকে জাগ্রত করে। আত্মবোধে ঘৃণার উদ্রেক করে। তখন মনুষ্যত্বের দাবিটাই বড় হয়ে ওঠে। তবু কি উত্তেজনাকে নিবারিত করা যায়?
  যায় না নানা কারণেই। পরিস্থিতির চাপ, পারিপার্শ্বিক উত্তেজনার সংবাদ ও দৃশ্য। মিশরীয় সভ্যতা, গ্রিক সভ্যতা এবং ভারতীয় সভ্যতায় অজাচারের প্রভাব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মিশরের টলেমি রাজবংশে ভাই-বোনের মধ্যে একের পর এক বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে। সাম্রাজ্য রক্ষা ও বংশ রক্ষার কারণেই। তাদের মধ্যে পারিবারিক যৌনাচারকেই তখন স্বাভাবিক ধরা হতো। গ্রিক পুরাণে ভগবান জিউস নিজ বোন ও কন্যাতে গমন করেই দেব-দেবীর জন্ম দিয়েছেন। জুপিটারও বোন জুনোকে বিবাহ করেন। ভারতীয় সভ্যতার বৃহদারণ্যক উপনিষদে ব্রহ্মা নিজ কন্যার পেছনে কাম-বাণেই বিমোহিত হয়ে ধাওয়া করেছিলেন। যম-যমী, বৈবস্বত মনু-শ্রদ্ধা, শুক্র ও তাঁর তিন বোনেরও এই অজাচার আখ্যান জড়িয়ে আছে। মহাভারতে পঞ্চ স্বামীর কামতীর্থে দ্রৌপদীকেও অজাচার আখ্যানের নায়িকা বলা চলে। কারণ তাঁর সম্পর্কও মনুষ্যেতর সম্পর্ক।
    শুধু রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্কের কথা ধরলে আমরা তিনভাবে অজাচার ঘটতে দেখি:

১। মায়ের সঙ্গে পুত্রের
২। কন্যার সঙ্গে পিতার
৩। ভাইয়ের সঙ্গে বোনের

এর বাইরেও নিষিদ্ধ সম্পর্কীয়গুলি হল: কাকিমা, মাসিমা, পিসিমা, শাশুড়ি মা ইত্যাদি। পশুরা যা অনায়াসে পারে, মানুষ তা পারে না। আর তা যখন পারে তখনই অজাচার। বিভিন্ন সময়ে সংবাদপত্রে এসবের উপস্থিতি আমাদের সচকিত করে। বাবা মেয়েকে নিয়ে ভ্রমণে গেছেন। নির্জন কক্ষে অঙ্কশায়িনী করে তুলছেন। বাবা দূর প্রবাসে। ছেলে মায়ের শয্যাসঙ্গী হয়ে উঠছে। বাইরের ছেলের সঙ্গে দৈহিক সম্পর্কে সামাজিক কলঙ্কের ভয়। তাই সেটা নিরাপদ নয়। ফলে ভাই-বোনেই যৌন ক্ষুধা তৃপ্ত করছেন। আইবুড়ো মাসি বোনপোকে দিয়েই দেহের চাহিদা পূরণ করছেন। বিধবা পিসি ভাইপোকে শুতে ডাকছেন তার নির্জন কক্ষে। এসব তো প্রতিনিয়তই ঘটছে। আদিম ক্ষুধার কাছে সবাই নত। পারভার্সন বলে, ন্যাক্কারজনক বলে আমরা তো এড়িয়ে যেতে পারি না। আত্মগ্লানির আগুন যতই জ্বলুক, নিয়ন্ত্রণের আস্ফালনে যতই আমাদের বেঁধে রাখার চেষ্টা করুক এগুলি যে সমাজকে চেনার পথ তাকে কি অস্বীকার করার জো আছে? আমাদের সভ্যতার ইতিহাসে, জৈবিক চেতনার ইতিহাসে, এবং বিবর্তনের ইতিহাসে এই প্রবৃত্তিমুখীন সংবাদগুলি এড়াতে পারি না। না হলে যে এই মানব প্রজাতিকেই সম্পূর্ণরূপে জানা হবে না। পাপ-পুণ্যের ধারণা থেকেই জৈবিকতার সামাজিকীকরণ ঘটেছে। পরনারী আসক্তিকেও বাইবেল এবং বৌদ্ধধর্মে পুরোপুরি পাপ হিসেবে গণ্য করা হয়। ইন্দ্রিয়-ভোগসুখ-লালসার উপর্যুপরি বিস্তার দেখেই বৃষ্টিহীন শুষ্ক মরুর রূপ দেখেছিলেন টি এস এলিয়টও। ইন্দ্রিয়ের কুপথগামিতা তাঁর কাছেও অসহ্য হয়ে উঠেছিল।The Waste Land তারই ফসল।রিপুর অগ্নিদহনের তীব্র রূপকে তিনি এভাবে বর্ণনা করেছেন :
‘To carthage then I Came
Burning,burning, burning, burning
O Lord, thou plucket me out
O Lord,thou plucket.’
সভ্যতার এইরূপ যে নিষিদ্ধ সম্পর্কীয়, অজাচার সমৃদ্ধ তা বলাই বাহুল্য। কার্থেজের অশুভ রতিলীলার সংবাদ তাঁর কানেও বেজে উঠেছিল।


বাইবেলের কাহিনিতে আমরা দেখতে পাই, কাকা সিসিফাস ভাইঝি টায়রাকে পাওয়ার আকুলতায় তার নির্দেশে বিপুল এক পাথর খণ্ড পাহাড়ের মাথায় তোলার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও কাকা ভাইঝির সম্পর্ক স্বীকৃত। তবু উত্তেজনা পাথর উত্তোলনে নিয়োজিত হয়েছে। ফ্রয়েড রক্তের সম্পর্কের মধ্যেই নির্জ্ঞান অবস্থায় যৌনসংযোগের সাড়া দেওয়ার ব্যাপারটি সমর্থন করেন। তিনি নিজেও নিজের পালিত মাতার প্রতি আকর্ষণ বোধ করেন। ইডিপাস কমপ্লেক্স হয়তো অল্পবিস্তর সকলের মধ্যেই দেখা দেয়।
অসম যৌনাচার যে পরিবারের মধ্যেই অল্পবিস্তর শুরু হয় তা প্রায় সব ধর্মের দেব-দেবীর প্রভাবেরই ফল বলা চলে। নিষিদ্ধ সম্পর্কগুলি সামাজিকগতভাবে নির্ধারিত। কিন্তু যৌনতা যে নীতিনিয়ম বহির্ভূত একটি ব্যাপার তা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। তবে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় এই সম্পর্ক বেশি ঘটে থাকে। যৌনসঙ্গমে অতৃপ্তি এবং দীর্ঘদিন অভুক্ত থাকার কারণেও নিষিদ্ধসম্পর্কীয় আত্মীয়া কাছাকাছি থাকলে ঘটা সম্ভব। তবে চরম মুহূর্তটি পার হলে অনুতাপ বা অনুশোচনাও জন্মে যা মানসিক রোগের আকার ধারণ করে।


আমাদের দেশের সাহিত্য পুরাণে, চিত্র-ভাস্কর্য এবং ধর্মীয় পূজা-অর্চনায় যৌন আবেদনের ছড়াছড়ি। ইলোরা-কোণার্ক থেকে শিবলিঙ্গ সবেতেই এই যৌন সংকেতের পারম্পর্য একটি ব্যাপার ছড়িয়ে আছে। অর্ধনারীশ্বর রূপে প্রকৃতি-পুরুষের মিলন রূপটিও একই দেহে সমন্বিত। প্রজনন থেকে সামাজিক আচার একে কেন্দ্র করেই। বহির্জগতে পশু-পাখির মিলন এমনকী তাদের মধ্যেও অসম মিলনের প্রভাব লক্ষ করা দুরূহ নয়। সবকিছুই আমাদের মানববৃত্তীয় আচরণকে ঘিরে আছে।যমী তাঁর ভাই যমকে সন্তান প্রার্থনা করে। কিন্তু যম তা থেকে বিরত থাকে। এই ঘটনাকে স্মরণীয় করার জন্য ‘ভাইফোঁটা’র আবির্ভাব হয়। রাম-সীতাও ভাই-বোন বৌদ্ধ দর্শন জাতক অনুযায়ী তা জানা যায়। ঋগ্বেদে আছে দম্ভ নিজ বোন মায়াকে, লোভ নিজ বোন নিবৃত্তিকে, কলি নিজ বোন নিরুক্তিকে বিয়ে করেছিল। এইসব কাহিনি থেকেই অজাচার বা ইন্সেস্ট আজও চলে আসছে তবে তাকে অপরাধ হিসেবেই দেখা হচ্ছে আর যার কারণে শাস্তিদানের ব্যাপারটিও গৃহীত হয়েছে। এই কারণেই জেশ সি স্কট বলেছেন: I felt like an animal, and animals don’t know sin, do they? চৈতন্য তো এর মধ্যেই জাগরিত হয়েছে।


প্রতিটি বালিকা এবং বালক তার শৈশবজীবনে কোনো না কোনোভাবে ইন্সেস্টের শিকার হয়েছে তার স্বীকারমূলক বহু ঘটনা কোথাও-না-কোথাও ব্যক্ত হয়েছে। শুধু যৌন সম্পর্কই নয়, সম্পর্কের ভিন্নরূপটিও দেখা গেছে। বিশেষ করে স্পর্শন মন্থন লেহন অথবা চুম্বন। স্নেহের মাত্রা ছাড়িয়ে তা আদিমতায় পৌঁছে গেছে। সিন্থিয়া ভৈগত(Cynthia Voigt) এইজন্য বলেছেন:’She couldn’t get any father away inside from her skin. she couldn’t get away.'( when she Hollers). এ যে রেফ্ এরই সমতুল্য তা না বলার কিছু নেই।
অজাচার শুধু ছাগলের আচার নয়, সমস্ত প্রাণীরই আচার। মানুষকে উন্নত বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন জীব হিসেবে দেখলেও অজাচারবিহীন ভাবা যায় না। আদিম প্রবৃত্তি তাকেও আবহমানকাল হতে বহন করে নিয়ে আসতে হচ্ছে। তারা যে প্রকৃতি দত্ত এবং অনপনেয় এর ব্যত্যয় কীভাবে সম্ভব? মানুষই জানে না। তবু এক পবিত্রতার ঝলক মানুষের মধ্যে বিরাজ করে। ইন্দ্রিয় দমনের ক্রিয়াটি সাহিত্য-দর্শন, বাউল-মারফতিতে উঠে আসে। নিজেকে সুগঠিত করার এবং চারিত্রিক দৃঢ়তায় অনন্য করে তোলার ও ব্যক্তিসত্তার বিকাশে সহায়তালাভের ক্ষেত্রে আত্মদমনের প্রভাব আছে। পাপ-পুণ্যের ধারণা এবং শাস্তি ও স্বর্গলাভের প্রলোভন সবই এর সঙ্গে যুক্ত।জিনগত বৈচিত্র্য আনতে এবং উন্নত প্রজাতির ক্ষেত্রে রক্ত সম্পর্কের বিবাহ ও সন্তান উৎপাদনও বর্তমানে মানুষ কাম্য মনে করে না। অজাচার তবু আলো-অন্ধকারের ভেতর থেকে যাবে এই সভ্যতায়, কেন না আদি উৎসের নিহিত তাৎপর্যেই এর উত্থান ও বিন্যাস। কে একে উৎখাত করবে?

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাহিত্যিক বিভাস রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার

X