নাট্য বিশ্লেষণ বলতে সাধারণভাবে একজন নাটককারের নাটকের বার্তা, শৈলী, চরিত্রায়ণগুলি উপলব্ধির নিরীক্ষণ বোঝায়।

দেশ-কালে বাঁধা থাকে মানবসমাজ, সরল রূপে তার বাস্তবিক প্রকাশ পরিচয় সর্বদা মেলে না। বিষয়, ভাব, আখ্যান সবকটি সৃস্টিশীল পর্যালোচনার মধ্য দিয়েই এর পরিপূর্ণ সার্থকতা।

বিশ্বভারতী, শান্তিনিকেতনে যে কয়েকটি নাট্য প্রযোজনা দেখার সৌভাগ্য হয়েছে তার মধ্যে অন্যতমভাবে আমার চোখে শ্রেষ্ঠ কলাভবনের শতবর্ষপূর্তিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রণীত, আমন্ত্রিত কলাক্ষেত্র, মণিপুর প্রযোজিত নাট্য ‘ডাকঘর’। যার নির্দেশনার দায়িত্বে ছিলেন হেইসনাম কানহাইলাল মহাশয়।

নাটকটির টেক্সট অর্থাৎ মুলপাঠের বর্ণনায় যদি যাই, তাহলে প্রথমেই বলতে হয়, ‘ডাকঘর’ নাটকের মূলভাব হ’ল সুদূরের জন্য ব্যাকুলতা। কবির জীবন যখন আধ্যাত্মিক জীবনে মিলিত হয়, তখন একটিমাত্র ইচ্ছা প্রাণ জুড়ে বাজে ; তার চিঠি চাই – তিনি কবে আসবেন ? ‘সেইখানেই যে সমস্ত বিচিত্রতার অবসান, সেইখানেই সমস্ত জীবনের পরিপূর্ণ পরিসমাপ্তি।’

কবি স্বয়ং বলেছেন – ‘… এর মধ্যে গল্প নেই, এ গদ্যলিরিক। যাওয়ার মধ্যে একটা বেদনা আছে, কিন্তু আমার মনের মধ্যে বিচ্ছেদের বেদনা ততটা ছিলো না। চলে যাওয়ার মধ্যে যে বিচিত্র আনন্দ তা আমাকে ডাক দিয়েছিলো।’

রাজা যে অমলের মতো ছোটো মানুষের কাছে আসতে পারেন, এই কথাটাই মোড়ল জাতীয় লোক বিশ্বাস করে না – তারা পরিহাস করে উড়িয়ে দেয়, তারা জানে যে তিনি কেবল বড় মানুষকে দেখা দিতে পারেন। অমল এবং মোড়লের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন বালকের সরল বিশ্বাস, অন্যদিকে মোড়লের দাম্ভিকতা ও অবিশ্বাস স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ঠাকুরদার কথায় একটা চিরন্তন সত্যের দিক আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ‘ডাকঘর’, ‘চিঠি’, ‘রাজা’ প্রভৃতি শব্দের তাৎপর্য্য বোঝা যায়। ব্যাকুলতা ও প্রত্যাশা’র দ্বন্দ্বে নাটকটি পরিণামের দিকে এগোয়।

রবীন্দ্রনাথের এইখানেই অনন্য সাধারণ কৃতিত্ব যে তিনি তাঁর সমস্ত জীবন নাট্যের নানান সময়ের বৈচিত্রপূর্ণ অভিজ্ঞতাগুলিকে এমন সরল একটি সূত্রের মধ্যে পূর্ণ করে তুলতে পেরেছেন। কল্পনা, সৌন্দর্য্য, অধ্যাত্মবাদ, সংশয়, দ্বন্দ্ব, অপেক্ষা, শান্তি সবকিছুই হয়তো একটি ছাতার তলায় স্থান পেয়েছে।

‘অমল’ চরিত্রের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথেরই চিত্তের প্রতিফলন ঘটেছে বলে আমি মনে করি। অন্তরের দিক থেকে তাঁর প্রতিভার মর্মে যেমন স্বভাব পরিণামের অধিকারী হয়েছেন, তেমনই বাইরের সর্বমানবের ক্ষেত্রেও সেটির প্রতিফলন লক্ষণীয়। অমল চরিত্রের দ্বিতীয়াংশে রাজার চিঠির জন্য প্রতীক্ষমান অমল – যিনি বিষ্ময় ব্যাকুলতা সহকারে নিসর্গের মধ্যে অরূপের আগমন সংকেত লাভ করছেন। যে অমল রাজার কাছে কোনো প্রয়োজনের প্রার্থনা করে না, কেবল দেশে দেশে চিঠি বিলি করার দায়িত্ব নেয়, সে আর কেউ নয় নাটককার স্বয়ং।

পারফরম্যান্স অর্থাৎ অভিকরণীয় আলোচনার প্রথমেই বলতে চাই, এ নাট্যের অভিনয় দেখি শান্তিনিকেতন লিপিকা প্রেক্ষাগৃহে। এই নাটকের পরিচালক ভারতীয় থিয়েটারের এক স্তম্ভ বলার অপেক্ষা রাখে না। ভূমিকাতেই কলাক্ষেত্রের পক্ষে সঞ্চালক উল্লেখ করেন, দেশ-বিদেশ বহু স্থানে ‘ডাকঘর’ এর অভিনয় হয়েছে, কানহাইলালজী’র ইচ্ছে ছিলো খোদ শান্তিনিকেতনে এ নাট্য অভিনয়ের। কিন্তু দুঃখ এটাই যে তাঁর জীবদ্দশায় ‘ডাকঘর’ শান্তিনিকেতনে আমন্ত্রিত হয়নি। তাই সেই দিনের অভিনয় বিশেষভাবে ওঁর প্রতি উৎসর্গীকৃত।

প্রযোজনায় কয়েকটি বিষয় আমি খুব গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরতে চাই, যেমন প্রবল শরীরী অভিনয়, মুখ-নিঃসৃত নানা মাত্রার ধ্বনি’র ব্যবহার, দলগতভাবে বডি ইমেজ তৈরি করা, কোরাসকণ্ঠের প্রয়োগ সত্যিই খুব স্তম্ভিত করে। নাটকটি মণিপুরী ভাষাতে অভিনয় হলেও সংযোগে এতোটুকু অসুবিধা হয়না।

নাটকের মঞ্চ উপাদান বলতে মাঝখানের গোল ডায়াস এবং পিছনে আপ লেফ্ট থেকে আপ রাইট পর্যন্ত একটি লম্বা ডায়াস। কেন্দ্রীয় চরিত্র অমলের সাথে সিনোগ্রাফিক্যালি বাকি চরিত্রদের সংলাপের আদানপ্রদান সেখান থেকেই হয় মূলতঃ। আলো-আঁধারী পরিবেশ এতো বেশি মায়াবী যে নাটকের একটি অংশ থেকেও নিস্তার পাওয়ার উপায় নেই। এখানেই আলোক পরিকল্পকের মহিমা। আবহের ক্ষেত্রে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সাইলেন্স বা নৈঃশব্দ’কে। কিছু ক্ষেত্রে স্কোর ব্যবহৃত হলেও তার মৃদুতাই এ নাটকের অলংকার। দক্ষ দেহ সঞ্চালনা, জোরালো শরীরীভাষায় দর্শকের সঙ্গে যোগ স্থাপন করতে পারে অভিনেতারা। অনেক বেশি নিপুণ তাঁরা এ বিষয়ে। এক্টর্স বডি’ই সমস্ত সাজ-সজ্জা, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার উপকরণ হয়ে ওঠে। চরিত্রায়ণের ক্ষেত্রে হাত, পা, চুল, চোখ, নাক, কান, রক্তমাংসের দেহ ও তাদের সতেজ সজীব মনই যথেষ্ট। তবেই দেবী সাবিত্রী হেইসনাম ষাটোর্ধ্ব বয়সেও অমল হিসেবে শত শতাংশ বিশ্বস্ততা অর্জন করেন ; কুর্ণিশ তাঁকে। এবং পাশাপাশি কম বয়সীরাও হয়ে ওঠেন ঠাকুরদা, দইওয়ালা, মাধব দত্ত, কবিরাজ ইত্যাদি। এখানেই অভিনয়ের সার্থকতা। সবচাইতে ভালো লাগে ‘বাংলা’ ভাষার গুরুত্ব দিয়ে, পটভূমির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে বেশ কিছু ক্ষেত্রে সঠিক বাংলা শব্দের প্রয়োগ – যা উপস্থাপনায় অধিক মিষ্টতা নির্মাণ করে।

সবশেষে একটি কথাই বলতে পারি – ‘মুভমেন্টস্ (অফ বডি) হ্যাভ টু বি লাইক ওয়েভস্’ – এ কথা হেইসনাম কানহাইলাল এরই। অর্থাৎ আন্দোলন সমুদ্রের ঢেউ এর মতো, যা ধরা থাকবে ছন্দে। উপলদ্ধি, সীমাহীনতার ঢেউ ভেঙে পড়ার পরও তার অন্তরের স্পন্দন থাকবে ক্রিয়াশীল – তবেই তো রবী ঠাকুরের ব্যাকুল-বিকাশী ‘ডাকঘর’ কলাক্ষেত্র সৃজনে আজও সমান প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়ায়।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাহিত্যিক বিভাস রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার

X