প্লেগ রুগীর সেবায় অমরেন্দ্রনাথ-অপূর্ব দে

ডাক নাম কালু। পোশাকী নাম অমরেন্দ্রনাথ দত্ত। এক বুক গর্ব নিয়ে বলতেন-‘আমার জন্ম থিয়েটার লগ্নে, আমি থিয়েটার করব না তো কে করবে?’ কেননা তিনি জন্মেছিলেন মাতুলালয়ে বাগবাজারের বোসেদের বাড়িতে।সেদিন ছিল ১৮৭৬ সালের পয়লা এপ্রিল, শনিবার। ওইদিনই মামাবাড়িতে দীনবন্ধু মিত্রের ‘সধবার একাদশী’-র অভিনয় হয়েছিল।ছোটোবেলা থেকেই যাত্রা,নাটক দেখার সখ।পরবর্তীকালে হয়ে ওঠেন প্রখ্যাত নট ও নাট্যকার।মাত্র একুশ বছর বয়সে, ৬৮নং বিডন স্ট্রিটে গড়ে তোলেন তাঁর স্বপ্নের ‘ক্লাসিক থিয়েটার’ (১৬.০৪.১৮৯৭)।পেশাদারী থিয়েটারের বিজ্ঞাপনের ধারাকেই তিনি পাল্টে দিয়েছিলেন।প্রযোজনায় এনেছিলেন নানা গিমিক।’অশ্বপৃষ্ঠে গোবিন্দলাল’ শব্দদুটি তো থিয়েটারের প্রবাদে পরিণত।বাংলা ভাষায় প্রথম সাপ্তাহিক নাট্যপত্রিকা ‘রঙ্গালয়’ তিনি প্রকাশ করেন-১৯০১ সালের পয়লা মার্চ, শুক্রবার।এছাড়াও তিন তিনটি নাট্যপত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন।নানা সামাজিক কাজে ও মানুষের সেবায় যুক্ত ছিলেন।

১৮৯৮ সালের মার্চের গোড়াতেই কলকাতায় প্লেগ রোগ দেখা দিল।প্লেগ সে সময় ভীষণ ছোঁয়াচে রোগ।এপ্রিল-মে মাসে তা ভয়ঙ্কর রূপ নিল।কলকাতায় প্লেগ মহামারীর আকার নিল।মড়ক লেগে গেল একেবারে। প্লেগ যে বাড়িতে ঢুকছে সে বাড়ি একেবারে উজার হয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসা নেই, সেবা নেই, শুশ্রূষা নেই। প্লেগে যে মরছে, তার সৎকার হওয়া পর্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।প্লেগের মড়াকে কেউ সহজে কাঁধে নিতে চায় না।লোকজন কলকাতা ছেড়ে পালাচ্ছে। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক প্রেক্ষাগৃহের দ্বার।স্টার থিয়েটারে একটানা চল্লিশ দিন(১৫ই জুন থেকে ২৫শে জুলাই) অভিনয় বন্ধ ছিল।গিরিশচন্দ্রও কলকাতা ছেড়ে, থিয়েটার ছেড়ে দলবল নিয়ে চলে গেলেন রামপুর বোয়ালিয়ায়।অমরেন্দ্রনাথ কিন্তু ক্লাসিক থিয়েটার বন্ধ করে দেন নি।পুরো উদ্যমে চালাতে লাগলেন। নাটকের পয়সায় প্লেগ রুগীর সেবা করতে লাগলেন। ক্লাসিকে তখন গিরিশচন্দ্রের গীতিনাট্য ‘দোললীলা’ চলছে অমরেন্দ্রনাথের পরিচালনায়।প্রথম অভিনয় হয় ০৫ মার্চ, ১৯৯৮।নাটকটি নাচে গানে সাফল্য পেয়েছিল।মহামারীর প্রকোপেও ক্লাসিকে কম হলেও দর্শক নাটক দেখতে আসত।

একদিন অভিনয় শেষে অমরেন্দ্রনাথ ক্লাসিক থেকে টমটম গাড়ি(এক ঘোড়ায় টানা দুই চাকার খোলা গাড়ি) হাঁকিয়ে বাড়ি ফিরছেন। সঙ্গে আছেন বন্ধু সাহিত্যিক ও সাংবাদিক পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়। ছাতুবাবুর বাজারের পাশ দিয়ে যাবার সময় দেখলেন, এক বৃদ্ধা আকুল নয়নে কাঁদছেন।কী হয়েছে জানার জন্য পাঁচকড়ির হাতে ঘোড়ার রাশ দিয়ে নিজে টমটম থেকে নেমে এলেন। পাঁচকড়ি অনেক বারণ করলেন অমরনাথকে। কিন্তু কে কার বারণ শোনে?অগত্যা তিনিও টমটম থেকে নেমে অমরেন্দ্রনাথের পিছু নিলেন।অমরেন্দ্রনাথ বুড়ির কাছে এসে জানতে পারলেন যে, বুড়ির একমাত্র ছেলেটি প্লেগে মারা গেছে। কিন্তু সৎকারের জন্য কেউ এগিয়ে আসছে না।অমরেন্দ্রনাথ আগাগোড়া সব ঘটনা শুনে দ্রুত ক্লাসিক থেকে লোক আনালেন। তারপর নিজেও সেই শবের সঙ্গে সঙ্গে শ্মশান ঘাটে গেলেন।মরা পুড়িয়ে তিনি যখন হাতিবাগানে নিজের বাড়িতে ফিরলেন,তখন পূব আকাশে সূর্য উঁকি মারছে।

অমরেন্দ্রনাথ দত্তের অনেক অবিস্মরণীয় মানবিক কাজের একটা স্মরণীয় কাজের কথা তুলে ধরলাম।  আজ যখন করোনা অতিমারির সঙ্কটে  বনগাঁ, বেহালা, সোনারপুর ইত্যাদি জায়গার  নানা ঘটনা সামনে আসছে, তখন আমাদের সামনে অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত অমরেন্দ্রনাথ দত্ত।আমাদের লড়াই করোনা রোগের বিরুদ্ধে, রুগীর বিরুদ্ধে নয়। বরং রুগীর প্রতি আমাদের সহানুভূতি ও সহমর্মিতা থাকা দরকার।সে যাতে সঠিক পরিষেবা পায় সেদিকে লক্ষ্য রাখা উচিত। কে বলতে পারে, কাল আমি, আপনি কিংবা আমাদের পরিবারের কেউ এই রোগে আক্রান্ত হবো না?বিবেকানন্দ, ভগিনী নিবেদিতা, অমরেন্দ্রনাথের কথা স্মরণে রেখে আমাদের এই গভীর সঙ্কটে মানবিক হয়ে ওঠা জরুরি।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাহিত্যিক বিভাস রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার

X