মানুষের কবি, যন্ত্রণার কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র- তৈমুর খান

প্রেমেন্দ্র মিত্র(১৯০৪-৮৮) অসম্ভব প্রাণাবেগের সঙ্গে মানবীয় যন্ত্রণায় মানুষের খুব কাছাকাছি আসতে পেরেছিলেন। যুগচেতনা কবির সৃষ্টির ক্ষেত্রে আকীর্ণ হয়ে আছে। তিনি মানুষের কবি। বাস্তব পৃথিবীর প্রাত্যহিক জীবনের সুখ দুঃখের ভিতর দিয়ে নগ্ন মলিন মানুষকে নিয়েই কাব্য রচনা করেছেন। এবং সর্বব্যাপী সহানুভূতি ও গভীর দৃষ্টিতে দেখেছেন মানুষের বিধ্বংসী রূপ। শুনেছেন কর্মকোলাহল পৃথিবীর আহ্বান। আবার মানুষের পাশে গিয়েও দাঁড়াতে চেয়েছেন। সমকালীন দুঃখ দুর্দশার চিত্র দেখে কবির আন্তরিক আর দৃপ্ত উচ্চারণ আমাদের সচকিত করে:

‘আমি কবি যত কামারের আর কাঁসারির আর ছুতোরের

মুটে মজুরের

—আমি কবি যত ইতরের!’

(কবি :প্রথমা)

একটি কবিতার মধ্যেই প্রাণের সর্বশক্তি কবি ঢেলে দেন। ছুতোর, কামার, মুটে-মজুর, কাঁসারি, কুম্ভকার সবাই কবির আপনজন হয়ে ওঠে। বিশ্বময়  ছড়ানো কবির আত্মীয়। কর্মের প্রবাহে রোমান্টিক স্বপ্ন বিলাসের ভাবনা ভাবার সময় কবির নেই। হতভাগাদের বন্দরটিতে এই জগতের যত ভাঙা জাহাজের  ভিড় লক্ষ করেন। জাহাজ তো জীবনেরই ভার বহন করে ন্যুব্জ ভেঙে পড়া মানুষই নামহীন মানুষের দল। তাদের দুঃখ-দুর্দশা কত মর্মান্তিক এবং বাস্তব কবি তা তুলে ধরেছেন:

‘কোমরের জোর কমে গেল যার ভাই

ঘুণ ধরে গেল কাঠে, আর যার

কলজেটা গেল ফেটে,

জনমের মত জখম হ’ল যে যুঝে;

সওদাগরের জেটিতে জেটিতে

খাতাঞ্জিতখানা  ঢুঁড়ে,

কোন দপ্তরে ভাই,

খারিজ তাদের নাম পাবে নাকো খুঁজে।’

(বেনামী বন্দর: প্রথমা)

মনে রাখা দরকার এই কবিতাটিতেই কবি ‘ভাই’ শব্দটি মোট আটবার উচ্চারণ করেছেন। তখন মনে হয় কবি কতখানি অন্তরঙ্গ ও আপনজন হয়ে উঠেছেন। বৃহত্তর মানব সমাজের প্রেক্ষাপটে কবি মানবতার যেন মহানমন্ত্রে দীক্ষা নিয়েছেন তাই নিজেকে আর আড়াল করেননি। নেমে এসেছেন মানব স্রোতের প্রাণৈশ্বর্যে। জীবনের উত্তাপ পেতে চেয়েছেন কাছ থেকে। এই প্রসঙ্গে কবি জহর সেন মজুমদারের বক্তব্য খুবই প্রাসঙ্গিক:

“কিন্তু চতুর্দিকের পটভূমি আঁধারে আচ্ছন্ন ;  ডুবে আছে জীবন, ছদ্ম আধুনিকতার চিহ্নগুলি প্রকট। এবং সর্বোপরি দৈনন্দিন সেই দুর্ভোগ যা প্রমাণ করে দিচ্ছে যে কোথাও আনন্দ পৃথিবী নেই; আমরা আছি একটা অসহায় ট্রাপ-এর মধ্যে। রাষ্ট্র এবং সমাজ যেন হয়ে উঠেছে উঁকিমারা  ব্যঙ্গ। আর মানব? তুচ্ছ তার জীবনযাত্রা। শান্তি নেই আত্মার। ভবিষ্যৎ বদলে দেবার বিশ্বাস ও যথার্থ গোষ্ঠীগত ক্রিয়াও দেখা যাচ্ছে না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর নৈরাশ্য শাসিত জীবন এবং বাস্তবতার কাঠিন্য—প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতায় অবৈজ্ঞানিক স্বপ্নবিলাসের পরিবর্তে জীবননীতির গভীরতর বোধ এনে দিল, যার ভিতরে সময়োচিত সামাজিক ইচ্ছার প্রকাশ প্রচন্ড বলিষ্ঠতাকে গ্রহণ করতে বাধ্য হল।” এই কবিতাটি বিশ্লেষণে তিনটি অংশ আমরা দেখতে পাই।

প্রথমত: খারিজ হওয়া বা বাতিল হওয়া জাহাজের রূপকে কবি নিপীড়িত শ্রমজীবী মানুষের রূপটি তুলে ধরেছেন।

দ্বিতীয়ত: এইসব মানুষেরা পৃথিবীতে কীভাবে অবস্থান করছে তা দেখিয়েছেন।

তৃতীয়ত: এইসব মানুষেরা কতখানি অবহেলিত বা লাঞ্ছিত বা তাদের প্রাপ্তিই বা কী সেটাও দেখিয়েছেন।

একটি কবিতার মধ্যে দিয়ে যুগযন্ত্রণার এই দুঃসহ রূপ আমরা পাই, সেইসঙ্গে বণিক সভ্যতার শোষণ কীভাবে মানুষের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করেছে সেই নির্মম নিষ্ঠুর ছবিটিও। এক শ্রেণির মানুষ  অন্য শ্রেণিকে চিরদিন পেছনে ফেলে রাখে—তাদের ক্রন্দন শোনে না। তাদের আর্তির শব্দ বেশি দূর পৌঁছয় না। সেই সামাজিক রাষ্ট্রিক নিষ্পেষণের যাঁতাকলে তারা নিঃশেষ হয়ে ফুরিয়ে যায়। কবি সেই দিকেই আমাদের দৃষ্টি ফিরিয়ে দিলেন সহমর্মিতার আপনজন হিসেবে।

বাস্তবকে অস্বীকার নয় বরং বাস্তবের দুঃখ বিষ কুশ্রিতা নগ্নতাকে বরণ করেই প্রেমেন্দ্র মিত্র অগ্রসর হয়েছেন। প্রতিদিনের জীবনযাত্রার গ্লানি দেখে, মানুষের হতভাগ্য রূপ দেখে, আভিজাত্যের মেকি ঔদাস্যে সরে যেতে চাননি। কবি জানেন তিনিও মানুষ, মানুষের যাবতীয় গুণাবলী তাঁর মধ্যেও থাকবে— সেগুলিকে ঘৃণা নয়; মাথা পেতে নেওয়াই জীবনের ধর্ম। তিনি লিখেছেন:

‘নশ্বর মৃত্তিকা গেহে,

জর্জর তৃষিত দীন যত নর-নারী,

ধুলির মলিন অঙ্কে ধূলিসম শেষে,

বিদায় লইয়া গেল

গোপনে ফেলিয়া অশ্রুবারি;

তাহাদের সব ব্যথা, সব গ্লানি, জ্বালা, অভিশাপ,

পাপ, তাপ, লজ্জা,ভয়, কুন্ঠা ও ক্রন্দন,

প্রতি ক্ষুদ্র দিবস-রাত্রির ঘৃণিত জীবন-যাত্রা—

কলঙ্ক হতাশা আর কদর্য কলুষ,

সযতনে করিয়া চয়ন,

এ মোর প্রণামখানি করিনু বয়ন।’

(নমস্কার: প্রথমা)

জীবন বিধাতাকে জীবনের এই দুঃখ-গ্লানি হতাশা কলঙ্ক দিয়েই নৈবেদ্য সাজিয়েছেন কবি। তিনি যে দুর্দশা দেখেছেন তা সুন্দর নয়, যে জ্বালা অনুভব করেছেন তা অলীক নয়। একেবারে মাটির কাছাকাছি, মাটিতে নেমে এসে সেই সব মানুষদের সঙ্গে ধুলোও মেখেছেন। এখানেই তিনি সার্থক। আবার কখনো যদি কবি পৃথিবীতে ফিরে আসেন, তাহলে খুব সুখের ভোগের আশা নিয়ে আসবেন না। তিনি দীন-দরিদ্র জাত-কুলহীন সাধারণ কোনো মায়ের কোলেই আসতে চান। প্রকৃতি অনুকূল বা প্রতিকূল হোক— জীবনের কঠোর কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই কবি জন্মগ্রহণ করতে চান। কবি ঘোষণা করেন:

‘জন্ম ল’ব হয়ত সে

কোন্ ঊর্মি-ছন্দোময়ী ফেনশীর্ষ সাগরের তীরে

ডুবারীর ঘরে,

কিংবা কোন্ জীর্ণ ঘরে কোন্ বৃদ্ধ নগরীর নগণ্য পল্লীতে

দীনা কোন্ পথের নটীর কোলে;

কিংবা—কোথা কিছু নাহি জানি!’

(ফিরে আসি যদি: প্রথমা)

জীবনানন্দ বাংলাকে ভালোবেসে ফিরে আসতে চেয়েছিলেন প্রকৃতির নির্জনতায়, কিন্তু প্রেমেন্দ্র মিত্র ফিরে আসতে চেয়েছেন মানুষের কোলাহলে, কর্মময় জগতে। ভালোবাসা আর প্রেমের জগতে। উভয় কবির মর্তপ্রীতির মধ্যে এটাই তফাত। তাই প্রেমেন্দ্র মিত্র মানুষ হয়ে মানুষীর কোল আলো করতে চান। জীবনানন্দ শঙ্খচিল বা শালিক বা হাঁস হতে চান।

অভিশপ্ত মানুষের কবি, অভিশপ্ত যুগের কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র। তাঁর ভাবনাকে আরও ব্যাপ্তি দান করেছেন পরবর্তী কাব্যগুলিতে। ‘সাগর থেকে ফেরা’ কাব্যটিতে যন্ত্রযুগের আদিম রূপ কবি লক্ষ করেছেন। কলকাতা শহরের কৃষ্টি সভ্যতা এক আভিজাত্যকে নির্দেশ করলেও জীবনকে করে দিয়েছে সংকীর্ণ গণ্ডিবদ্ধ, কৃত্রিম। প্রকৃতির মুক্ত লীলাচঞ্চল সেইরূপ কোথায়? কবি বলেছেন:

‘চিমনি তোলা ঊর্ধ্বমুখে আকাশ পানে চেয়ে

কী ভাবে সেই জানে!

ভাবে ভেবে পায় কি নিজের মানে?

পোল বেঁধেছে কল ফেঁদেছে

বসিয়ে বাজার হাট,

রাস্তা পেতে মেলেছে ঢের রংবেরঙের ঠাট।’

(শহর: সাগর থেকে ফেরা)

শহর ইঁট কাঠ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। ধুলোবালি জঞ্জালে ভরাট। কবির মনে হয়েছে পৃথিবী আবর্তিত অন্ধ নিয়তির চক্রে। মানুষের ইতিহাস হিংসার বিষে ফেনিল। কিন্তু কবির আশা এরও একদিন অবসান হবে। ‘সূর্যবংশের অনির্বাণ  প্রাণ শিখা’ দূত হয়ে এসে মানুষকে উদ্ধার করবে। আমাদের প্রাণের অন্ধকার দূর হবে। প্রেমেন্দ্র মিত্র যেখানে মানুষের মঙ্গলের জন্য কোনো অলৌকিক শক্তির কামনা করেছেন, আশায় বুক বেঁধেছেন; জীবনানন্দ দাশ সেখানে হৃদয়ের নির্দেশকে প্রাধান্য দিয়েছেন। যে স্নিগ্ধ দেশ উভয় কবিরই কাম্য ছিল তা কোথাও নেই। পরিবর্তে তৈরি হয়েছে যন্ত্রের যুগ। মানুষের লোভ লালসায় মরুসদৃশ জীবন। দুঃখের গ্লানি হাড়-হাভাত। কোথায়  স্বপ্ন নেই। ছিন্নভিন্ন আজকের সমাজ পৃথিবী। জটিল সময়ের এই অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সমাজবেদ এবং ইতিহাসবেদ যা কবিমানসের ধারাকে এক পরমশক্তির কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছে। জীবনানন্দ সেই শক্তির কাছে উপনীত না হলেও হৃদয়ের নির্দেশে স্বপ্নকে বাদ দিতে পারেননি:

‘এসব শূন্যতা ছাড়া কোনোদিন আজ

কিছু নেই সময়ের তীরে

তবু ব্যর্থ মানুষের গ্লানি ভুল চিন্তা সংকল্পের

অবিরল মরুভূমি ঘিরে

বিচিত্র বৃক্ষের শব্দে স্নিগ্ধ এক দেশ

এপৃথিবী, এই প্রেম, জ্ঞান আর হৃদয়ের নির্দেশ।’

(পৃথিবীলোক: শ্রেষ্ঠ কবিতা: জীবনানন্দ দাশ)

একটা সময়ের নিরিখে হাঁপিয়ে ওঠা প্রাণ মুক্তি চায়। একটু শ্বাস নিতে চায় যেন। ‘সাতটি তারার তিমির’ কাব্যগ্রন্থে জীবনানন্দ দাশ ‘তিমির হননের গান’ গেয়েছিলেন সমসাময়িক যুদ্ধ জিঘাংসার বাতাবরণ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য। প্রেমেন্দ্র মিত্র লিখেছেন:

‘রোদ দাও

এ অশুচি মুছি।’

(রোদের প্রার্থনা: সাগর থেকে ফেরা)

‘তিমির হনন’ এবং ‘রোদ’ সেদিন মানবতাকে উদ্বোধিত করার জন্য আশু প্রয়োজন ছিল। ব্যক্তিক মনের নিরালোক থেকে প্রাণের স্বতোৎসারিত নৈর্ব্যক্তিক  বিশ্বলোকের দিকে কবির যাত্রা। মানুষের অন্তরের বেদনা হাহাকার দাঙ্গা বিধ্বস্ত হতাশা সব মিলে এই অসুস্থ যুগের বিপন্ন পথিক ছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্রও।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাহিত্যিক বিভাস রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার

X