ভ্রমন বিষয়ক বিশেষ গদ্য: বাঘ এবং আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস- ডালিয়া দে

 

‘টাইগার’শব্দটি গ্রীক শব্দ ‘টাইগ্রিস’ থেকে এসেছে। টাইগার শব্দটি ‘টাইগ্রিস’ নদীর সাথেও জড়িত।টাইগার শব্দের উৎস পার্সিয়ান শব্দ ‘টিগ্রার’ অর্থ ‘পয়েন্ট’বা তীক্ষ্ণ’ হতে পারে এবং আবেস্তান শব্দ ‘টিগ্রি’ যার অর্থ ‘তীর’।এটি টাইগার হিসাবে প্রাণীটির নামকরণের পিছনে ব্যুৎপত্তি, যদিও এই শব্দের কোনওটিরই বাঘের সাথে সরাসরি কোনও মিল নেই।এটি বাঘের কোন অন্য বৈশিষ্ট্যের সাথে সম্পর্কিত হতে পারে।জেনেটিক নাম ‘পান্থেরা’র লাতিন শব্দ ‘প্যান্থার’ থেকে এসেছে।গ্রীক ভাষায় শব্দ রয়েছে, এটি ‘প্যান্থার’ এবং সংস্কৃত ‘পান্ড-অরা’ যা জিনগত নামের উৎস হতে পারে।সংস্কৃত শব্দের ‘পাণ্ড-আরার’ অর্থ ‘ফ্যাকাশে হলুদ’, ‘সাদা, সাদা’, যা প্রাণীর রঙের প্রতীক হতে পারে।

মহা শক্তিমান,মহা বুদ্ধিমান ,দক্ষ সাঁতারু।বিড়াল প্রজাতির মধ্যে একাই এমন যে জলে বসতে পছন্দ করে যা তাদের শরীর ঠান্ডা রাখে এবং মশা ,মাছি, পোকার উপদ্রব থেকেও রক্ষা করে। ক্ষিপ্রতায় অসাধারণ ,বহু রকমের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে বেঁচে থাকার ক্ষমতা আছে বাঘের।মানুষ ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে এই সুন্দর শিকারি জীবটির একটা ঝলক পাওয়ার জন্য ।

পূর্ণবয়স্ক পুরুষ বাঘের ওজন 310 কেজি বা তার বেশি হতে পারে।বাঘিনীর ওজন 170কেজি পর্যন্ত হতে পারে।নিজের ওজনের দ্বিগুণ প্রাণী শিকার করতে পারে।

এক রাতে প্রায় 27 কেজি শিকার খেতে পারে।সাধারণত একা থাকতে পছন্দ করে শুধু সঙ্গমের সময় বাঘিনীর আশেপাশে দেখা যায়।পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ বাঘ 60 থেকে 100 কিলোমিটার এবং বাঘিনী 20 থেকে 50 কিলোমিটার এলাকা নিয়ে থাকতে পারে।বাচ্চাদের সম্পূর্ণ দায়িত্ব মায়ের।তারা মায়ের কাছ থেকে শিকার করার কৌশল আয়ত্ত করে।সাধারনত দু’বছর পর্যন্ত তারা মায়ের সাথে থাকে তারপর তারা যে যার এলাকা অনুসন্ধানে বেরিয়ে পড়ে।নিজের এলাকা চিহ্নিত করতে মলদ্বার গ্রন্থি থেকে শক্তিশালী গন্ধযুক্ত মূত্র স্প্রে করে বিভিন্ন গাছে।এদের গায়ের দাগই এদের পরিচয় বাহক।বলা হয় প্রত্যেকটি বাঘের গায়ের দাগ আলাদা যেমন প্রত্যেকটি মানুষের ফিঙ্গারপ্রিন্ট।গায়ের এই কালো দাগ

তাদের সংখ্যা গণনাতেও সাহায্য করে।রাতের বাঘের চোখ মানুষের তুলনায় ছ গুন বেশি শক্তিশালী হয়।তাই রাতেও এরা সমস্ত কিছু একদম পরিষ্কার দেখতে পায়। এদের গলার আওয়াজ নাকি তিন কিলোমিটার দূর থেকে শোনা যায়।

কিন্তু এত বুদ্ধি, শক্তি, সহনশীলতা থাকা সত্ত্বেও এই শিকারির জীবটি আজ শিকারে পরিণত হয়েছে। মানুষের সঙ্গে সংঘাতে বাঘের অস্তিত্ব সংকটে।বন্য জীব সংরক্ষণ এবং পর্যটন এই দুটোর সামঞ্জস্য থাকা খুব প্রয়োজন।জঙ্গলের উপর নির্ভরশীল বহু মানুষ জীবনধারণের জন্য কাঠ মধু ইত্যাদি সংগ্রহ করতে গিয়ে বাঘের আক্রমণের শিকার হয় এ ঘটনা খুবই দুর্ভাগ্যজনক।জনবসতির বিস্তার উপযুক্ত খাদ্যের অভাব এসবই মানুষ এবং বাঘের মধ্যে সংঘাতকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে।এছাড়া বাঘের চামড়া বিদেশে পাচার হচ্ছে।চীনে চড়া দামে বিক্রি হয় বাঘের চামড়া,হাড় ইত্যাদি।তৈরি হয় স্নায়ুর ওষুধ।এছাড়াও নানান ওষুধ।কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা গেছে জন্তুদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য জঙ্গলের বিভিন্ন স্থানে ক্যামেরা ট্র্যাপ বসিয়ে।এতে যেমন চোরাশিকার বন্ধ করা গেছে তেমনি বাঘের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং সংখ্যাও গণনাতে ও সুবিধে হয়েছে।বাঘ শুধু আমাদের জাতীয় প্রাণী নয় ,বাঘ প্রতীক একটা সমৃদ্ধ জঙ্গলের।তাই তার সংরক্ষণের দায়িত্ব আমাদের সবার উপর বর্তায়।

আন্তর্জাতিক বাঘ দিবসের ইতিহাস:

বাঘ-যাকে বহু যুগ ধরে মানুষ শক্তির প্রতীক বলে মনে করে, যার একটা আওয়াজ সারা শরীরে শিহরণ তোলে যাকে ঘিরে সমগ্র জীবজগৎ বিরাজমান; কিন্তু শক্তির প্রতীক আজ তার অস্তিত্বের সংকটে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বসতি স্থাপন,যথেচ্ছভাবে বাঘ শিকার এ সবই বাঘের অস্তিত্বকে সংকটে এনে দিয়েছে।স্বাধীনতার পরেও শিকার চালু ছিল রাজা মহারাজারা ব্রিটিশ সরকারের সাথে মিলে নির্বিচারে বাঘ শিকার করত।স্বাধীনতার পরেও বাঘ শিকার বন্ধ করার জন্য কোন নীতি চালু হয়নি অবৈধ শিকার বাড়তেই থাকে থাকে দিনের পর দিন।

1970 সালে যখন বাঘের এই বিলুপ্তির খবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর কাছে পৌঁছেয় তখন তিনি বাঘ সংরক্ষণের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন ।1972 সালে ‘রাষ্ট্রীয় বন্যজীবন সুরক্ষা আইন’ বলবৎ করেন এই আইনের মাধ্যমে তিনি সমস্ত জীবজগতকে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা প্রদান করেন। শিকার পুরোপুরি ভাবে বন্ধ করা হয়।জঙ্গলের সুরক্ষার জন্য বন বিভাগের উপর দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।এর সাথেই ওই সময় ভারতে প্রথম বাঘ গণনা হয়।আর তার পরিণাম সত্যিই ভয়াবহ দাঁড়ায়,যাতে ভারতে কেবল 1800 থেকে 2000 বা পাওয়া যায়।

1973 সালে বাঘের সুরক্ষার জন্য ‘প্রজেক্ট টাইগার’ রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম শুরু করা হয়।এর সাথে নটি জাতীয় উদ্যান কে জোড়া হয়।জঙ্গলের সুরক্ষার জন্য আরও অনেক বেশি পরিমাণ কাজ হতে থাকে,যা ক্রমাগত চলতে থাকে।যার সাথে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য উভয় যুক্ত হয়।অনেক জাতীয় উদ্যান,অভয়ারণ্য গঠন করা হয়।পুনর্বাসনের কাজ দ্রুত শুরু হয়।এই প্রকল্পে বন বিভাগ,বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক,স্থানীয় জনগণ,সবাইকে যুক্ত করা হয়। কিন্তু 1990 থেকে 2000 পর্যন্ত সময় বাঘেদের জন্য খুব ভালো নয়।বাঘের চামড়া চড়া দামে চীনের বাজারে বিক্রি হতে থাকে।অবৈধ বাণিজ্য বাড়তে থাকে বাঘকে কেন্দ্র করে।ফলে দ্রুত কমতে থাকে বাঘের সংখ্যা।তাই 2005 এ বাঘ সংরক্ষণের জন্য সরকার আবার একটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন-‘প্রজেক্ট টাইগারকে ওয়াইল্ডলাইফ অ্যাক্টে’ সংশোধন করে ‘NTCA’ ‘ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটি’ তে রুপান্তরিত করা হয়।আর তারপর বাঘ সংরক্ষণের জন্য যুদ্ধ স্তরীয় তৎপরতায় কাজ শুরু হয়।এর ফলে যে সমস্ত জায়গায় বাঘের উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়েছে সেগুলোকে অভয়ারণ্য অথবা বাঘ সংরক্ষিত এলাকা গঠন করা হয়।বাঘ গণনার পুরনো প্রযুক্তির সাথে ক্যামেরায় আধুনিক প্রযুক্তি ও সংযোজিত হয় । বিভিন্ন অরণ্যে যেখানে বাঘের সংখ্যা একেবারে কমে গেছে সেখানে টাইগার রিলোকেট করা হয়।এরপর 2010 সালে বাঘ সংরক্ষণের জন্য আন্তরাষ্ট্রীয় স্তরে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে একটা সম্মেলনের আয়োজন করা হয় । যেখানে বাঘ সংরক্ষণের জন্য বিশ্বব্যাপী কার্যক্রমের রূপরেখা তৈরি হয়

এছাড়াও জঙ্গলে সীমানা থেকে মানুষজনকে দূরে সরানো হয়। যাতে মানুষ এবং বন্যজীবন উভয়ই সুরক্ষিত থাকতে পারে।স্থানীয় মানুষদের ড্রাইভার,গাইড ইত্যাদি চাকরিতে নিযুক্ত করা হয়।আগে বাঘের পায়ের ছাপ দেখে তার সংখ্যা গণনা করা হতো এবার তার সাথে যুক্ত হয় আধুনিক প্রযুক্তি।

জায়গায় জায়গায় ক্যামেরা ট্র্যাপ বসানো হয়।

এই সম্মেলনেই 29 শে জুলাই ‘আন্তরাষ্ট্রীয় বাঘ দিবস’ ঘোষণা করা হয়।প্রতি বছর এই দিনে বাঘ সংরক্ষণের কাজকে আরও গতি দান করা হচ্ছে ।এই রাষ্ট্রীয় আন্তরাষ্ট্রীয় বিভিন্ন কার্যক্রমে সফলতা স্বরূপ 2014 এ বাঘ গণনায় বাঘের সংখ্যা দাঁড়ায় 2226 এবং 2019 এ 2967।আর আজ ভারতে প্রায় পঞ্চাশটি টাইগার রিজার্ভ আছে।যেখানে তাদের সুরক্ষার জন্য হাতি দ্বারা প্রতিনিয়ত তাদের ওপর নজরদারি চালানো হয় ।ফরেস্ট গার্ডরা দিনরাত এক করে কাজ করছে ।

যার থেকে পরবর্তীকালে বাঘের সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনাও প্রবল।

বাঘের বিভিন্ন প্রজাতি:

সাইবেরিয়ান বাঘ – বাঘগুলি বরফপূর্ণ এলাকায় থাকে।

বেঙ্গল টাইগার – এই বাঘগুলি এশিয়াতে পাওয়া যায়। বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত এবং নেপালে ইত্যাদি জায়গায় পাওয়া যায়।

ইন্দোচিনি বাঘ – এই বাঘগুলি বেশ কয়েকটি এশীয় দেশে দেখা যায়। ইন্দোচিনি বাঘগুলি বার্মা, কম্বোডিয়া, চীন, ভিয়েতনাম এবং থাইল্যান্ডে ইত্যাদি জায়গায় পাওয়া যায়।

মালয়েশিয়ান বাঘ – এই বাঘগুলি কেবল মাল উপদ্বীপের দক্ষিণে পাওয়া যায়।

দক্ষিণ চীনি বাঘ – এগুলি সবচেয়ে বিপদগ্রস্থ বাঘের উপ-প্রজাতি। এগুলি সুমাত্রার বাঘের চেয়ে বেশি বিপন্ন।

সুমাত্রা বাঘ – এই বাঘগুলি বিড়াল পরিবারের বৃহত্তম সদস্য ,বিপন্ন প্রজাতি।

বিলুপ্ত বাঘের প্রজাতি :

বালি বাঘ,ক্যাস্পিয়ান বাঘ,জাভান বাঘ,হাইব্রিডস সাদা বাঘের মতো বিভিন্ন রঙের বাঘ,

ব্রাউন বাঘ এবং গোল্ডেন বাঘ ইত্যাদি।

যদিও এত উদ্বেগের মধ্যেই একটা ভালো খবর,ব্যাঘ্র শুমারিতে বিশ্বে রেকর্ড গড়ে গিনেস বুকে নাম তুলেছে ভারত।বিশ্বের বাঘের 70 শতাংশই রয়েছে ভারতে।বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বিস্তৃত ক্যামেরা ট্র্যাপ ওয়াইল্ডলাইফ সার্ভের জন্য বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে ভারত ।2019 সালের 29 শে জুলাই বিশ্ব ব্যাঘ্র দিবস দিবসে এই সমীক্ষার কথা জানানো হয়েছিল কেন্দ্রের তরফে।ভারতের প্রায় 141 টি এলাকায় বাঘের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।সেইসব এলাকায় মোট 26 হাজার 838 লোকেশনে ক্যামেরার মাধ্যমে বাঘেদের উপর নজর রাখা হয়।বন্য জীবজন্তু দের ছবি ক্যামেরা ট্রাপে ফ্রেমবন্দি হয়েছে।শুধু ক্যামেরায় ছবি তুলেই নয় ভারতে কোথায় কত বাঘ রয়েছে তা খুঁজে বের করতে জঙ্গলের বিস্তীর্ণ এলাকায় পায়ে হেঁটে গণনার মতো কঠিন কাজ করা হয়েছে এই সমীক্ষার অংশ হিসেবে ।আর তা থেকে 2967 টি বাঘের উপস্থিতির খবর মিলেছে ভারতে,যা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক।যার কৃতিত্ব ভারত সরকার বন মন্ত্রক,বন বিভাগ ভারতের নাগরিক সবার আজ বাঘ এবং তার প্রাকৃতিক আবাসস্থল সুরক্ষার দায়িত্ব আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার উপরে নির্ভরশীল যা সুন্দর এই শিকারি জীবটির তার ঘরের ,তার ভবিষ্যতের রক্ষা করবে।

 

ছবিঃ ডালিয়া দে 

বিশেষ বিজ্ঞপ্তি
শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাহিত্যিক বিভাস রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার

X