বাংলার আলপনায় চিহ্ন ও প্রতীক- দ্বিতীয় পর্ব

বাংলার আলপনায় চিহ্ন ও প্রতীক
দীপঙ্কর পাড়ুই

আলপনায় ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রবন্ধনী

“গোমঞে লেপিয়া মাটি        আলিপনা পরিপাটী

                  চারিদিকে বন্ধবের মেলা।”

উঠোনে গোবর-মাটি দিয়ে লেপে আলপনা দেওয়ার সুন্দর একটি দৃশ্যের বর্ণনা মুকুন্দরাম চক্রবর্তী তার চণ্ডীমঙ্গলে দিয়েছেন।এই দৃশ্যেটি একটি বিবাহ অনুষ্ঠানের খণ্ডচিত্র।তবুও এই চিত্রে গোবর-মাটি দিয়ে উঠোন লেপে আলপনা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।আলপনাকে গ্রাম্য ভাষায় আলিপনা, এলুনি,এলেনা বলে।আলপনার দেওয়ার আগে উঠোনে মাটি লেপা বা লেপন করা হয় গোলাকার বা চারকোনা করে।কারণ আলপনা দেওয়ার আগে জমি তৈরি করা জরুরী একটি বিষয়।সাধারনত খেত শব্দ থেকে ক্ষেত্র শব্দটি এসেছে,যার অর্থ জমি বোঝায়।এখানে জমি বলতে উঠোনের একটি অংশকে বোঝান হয়,যা অঙ্কনের মেঝে বা স্পেস বলে পরিচিত। গোলাকার বা চারকোনো করে মাটি লেপা হয় কাপড় বা ‍ন্যাতার সাহায্যে। তবে আলপনা আঁকা নয় ‘দেওয়া’ কথাটি যুক্ত হয়েছে।গোবরমাটি লেপাযুক্ত একটি বিশেষ জায়গায় আলপনা দেওয়া হয়।এই বিশেষ গোলাকার,আয়তকার, চতুস্কোন প্রভৃতি জায়গায় গোবরমাটি দিয়ে তৈরি করা হয়।একেই মাটিল্যাপা বা জমি বলা হয়, যা আদতে একটি ক্ষেত্র।আর ক্ষেত্রের যিনি অধিপতি তিনি ক্ষেত্রপতি,আর যিনি ক্ষেত্রের রক্ষক তিনি ক্ষেত্রপাল।অন্যদিকে সিন্ধু সভ্যতার শীলমোহরের নানা নকশাদিতে আমরা ক্ষেত্রপাল কে প্রত্যক্ষ করেছি।আবার বাংলায় পৌষপার্বনের আলপনায় ক্ষেত্রপালের উপস্থিতি রয়েছে।তাকে আঁকা হয় ও পুজোও করার বিধি রয়েছে।পশ্চিমবঙ্গের অনেক জায়গায় ক্ষেত্রপালের পুজো অনুষ্ঠিত হয়।ক্ষেত্রপাল কে বাংলায় শিবের প্রতিরূপ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস উল্লেখ করছেন— “বন্ধ্যা বা মৃতবৎসা নারীকে বঙ্গের অনেকস্থানে ক্ষেত্রপালের ঔষধ খাওয়ানো হয়।এই ঔষধ খাওয়াইবার পর সন্তান হইলে তাহাদিগকে ‘ক্ষেত্রপদ’, ‘ক্ষেত্রদাসী’ ইত্যাদি নাম রাখার প্রথা আছে।” আলপনায় ক্ষেত্রের গুরুত্ব অপরিসীম।অভিধানে ‘ক্ষেত্র’ মানে ভূমিখণ্ড, মৃত্তিকাখণ্ড বা ‘field’, শস্যের আবাস, মাঠ,  ময়দান,  স্থান ইত্যাদি বলা হয়েছে।তন্ত্রের ক্ষেত্রে সিদ্ধভূমি কথাটি বলা হয়।গাণিতিক পরিভাষায় রেখাচিহ্ন দ্বারা সীমাবদ্ধ, ত্রিভূজ, চতুর্ভুজ, অষ্টভুজাদি স্থান বা ‘figure’।দার্শনিক ক্ষেত্রে দেহ,মন,ইন্দ্রিয় বোঝাতে ক্ষেত্র কথাটি ব্যবহৃত হয়।তবে এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে গোবরমাটি দেওয়া লেপ বা লেপনকে কোথাও কোথাও ফুলের মতো নকশার মতো করা হয়,তাকে গোবরের আলপনা বলা হয়।মহারাষ্ট্রের ওয়ারলি চিত্রকলায় চতুস্কোন ক্ষেত্রবন্ধনীকে বলা হয় ‘চৌক’ বা ‘চক’। চক সাধারনত দু’ধরনের হয়ে থাকে,এক- দেবীচৌক।একটি চতুস্কোন ক্ষেত্রবন্ধনীযুক্ত জায়গার ভেতরের একজন মহিলাকে আঁকা হয় তার মাথার উপর চাঁদ ও সূর্য অবস্থান করে।দুই- সাধারন চৌক।একটি চতুস্কোন ক্ষেত্রবন্ধনীযুক্ত জায়গায় মানুষ,প্রাকৃতিক নানা উপাদান,নানা বস্তুসামগ্ৰীর ছবি ইত্যাদি বিষয়।এসব চিত্র দেখলে গুহাচিত্র ও সিন্ধু সভ্যতার মৃৎপাত্রের কথা মনে পড়ে।সেসব মৃৎপাত্রে আঁকা মানুষের অবয়বের সাথে ওয়ারলি চিত্রের সাদৃশ্যতা দেখা যায়। প্রত্যেক শিল্পকলাতেই শুরুর আগে জমি নির্মানের প্রসঙ্গ রয়েছে। আলপনার ক্ষেত্রেও তাই।গোবরমাটি দেওয়া লেপন বা লেপ শুকিয়ে গেলে তারপর আলপনা দেওয়া হয়।

গ্রাম্য ভাষায় মহিলারা  চতুস্কোনকে বলেন -চারকোনা, ত্রিভূজকে-তেকোনা, গোলাকার বৃত্তকে- গোলা বা গোল। এগুলি আলপনার মোটিফ ও জমির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

প্রথাগত ভাবে আলপনার দেওয়া বা আঁকার আগে যে জায়গাটি লেপন দিয়ে নির্বাচন করেছি সেই জায়গাটিকে ঘেরার পালা অর্থাৎ ক্ষেত্রের বন্ধনী দেওয়া হল। যেখানে দেবতা এসে বসবেন সেখানটিকে ঘিরে দেওয়া,এখানে কিন্ত রক্ষাপ্রদক অর্থে ক্ষেত্র বন্ধনী তা নয়।শুভতাসূচক একটি জায়গা প্রস্তুত করা, যে জায়গায় দেব-দেবী এমনকি আদিভৌতিক বা রাক্ষসও এসে বসবেন। রাক্ষস বা আদিভৌতিক দেবতাদের ক্ষেত্রে গোলাকার লেপন ছোট জায়গায় মধ্যে করা হয় মূল দেবতার সঙ্গে পুজিত হওয়ার সময়। গোবরমাটি ল্যাপার কি কারণ! সে প্রসঙ্গে একটি অবতারনা করব। চারণকবি মুকুন্দদাস তার ‘পল্লীসেবা’ নাটকে উল্লেখ করছেন-

“সুলভা । প্রফুল্ল? ও কি কচ্ছ?

প্রফুল্ল । দেখতেই ত’ পাচ্ছ গোবর ছড়া দিচ্ছি।ভোর হয়ে গেছে যে।

বিমলা ।এতে কি হয়?

প্রফুল্ল । এতে গৃহের স্বাস্থ্যোন্নতি হয়। গোবরে যেমন করে দুর্গন্ধ নাশ,তেমন করে ম্যলেরিয়া দূর, তারপরে গোবরের গন্ধ মনের পবিত্রতা আনয়ন করে।

বিমলা। গোবরে এত গুণ জানতুম না, একটা জ্ঞান হলো।

প্রফুল্ল। গৃহস্থের মেয়ে,এই টুকুনই জাননা, কেবল সাজপোষাকেই পরিপাটি। প্রত্যূষে সকল মেয়েদেরই গোবর ছড়া দেওয়া কর্তব্য। গোবর নিয়ে ছড়া দিয়ে শ্বশুর-শাশুড়ীর পাদোদক নিয়ে গৃহকার্য্য আরম্ভ করতে হয়। বুড়োরা বলেন এ না কর্লে নাকি প্রাণ সরস হয় না।” 

যে জায়গাটিতে গোবর লেপন করা হয়। সেটি পবিত্রতার জন্য। এখানেই বিশেষত্ব হ’ল দেবত্ব বিষয়টি, যা ওই গোবারমাটি ল্যাপা জায়গাটির ক্ষেত্রে ঘটে থাকে। কিন্ত আলপনার ক্ষেত্রে মাটির রঙ ও শুভতা সূচক দু’অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। গোবরের ‍মধ্যে   যে  ফাইবার বা তন্তু  জাতীয় বস্তু থাকে তা মাটির সাথে মিশে গিয়ে ফাটল রোধ করতে সাহায্য করে।  এভাবেই আলপনার গ্ৰাউন্ড বা জমি তৈরি হয়। ভারতের প্রাচীন চিত্রকলায় ছবি অঙ্কনের জন্য অষ্টাঙ্গ মার্গ অর্থাৎ আটটি পদ্ধতি ছিল। সমরাঙ্গণ-সূত্রধারে আটটি পদ্ধতির কথা বর্ণিত রয়েছে।যথা-

১.বর্তিকা- তুলির কাজ, ২.ভূমিবন্ধন- চিত্রের ভূমি তৈরী করা, ৩.লেখাকর্ম- প্রাথমিক রেখাঙ্কন, ৪.রেখাকর্ম-পূর্ণমাত্রায় রেখাচিত্র,কর্ষকর্ম বা ৫.বর্ণকর্ম- রঙের ব্যাবহার, ৬.বর্তনা- সেড বা ছায়ার ব্যাবহার, ৭.লেখকরণ- বস্তুর বা মানব শরীরের বহিঃরেখাঙ্কন, ৮. দ্যতিকর্ম বা দ্বিচকর্ম – অলঙ্করন বা  ‘finishing touch’। এ সকল উপার বা কৌশলের ধ্রুপদী চিত্রকলার প্রয়োগ হত। তবে ভূমিবন্ধন কথাটি কিন্ত ক্ষেত্রবন্ধন যা জমি তৈরির কথাই বলে।যেকোনো চিত্রকলার ক্ষেত্রে জমি তৈরি করে তারপর চিত্র আঁকা হয়।

বাংলায় আলপনার জমি তৈরি দু’রকম রঙ দিয়ে করা হয়।এক, গোবরমাটির লেপনই একটি রঙ। দুই, রাঢ়বঙ্গের আলপনায় গোবরমাটির বদলে লাল ভূমিজ রঙ ব্যাবহার করা হয়। যাকে গেরীমাটি বলে।এই রঙকে বিদেশীরা বলে থাকেন ইণ্ডিয়ান রেড কালার। বীরভূম,পুরুলিয়া মেদনীপুর, ঝাড়গ্ৰাম,বাকুড়া প্রভৃতি জেলার গ্ৰাম গুলিতে লাল গেরিমাটি লেপে আলপনা দেওয়ার রীতি রয়েছে।এমনকি দেওয়াল চিত্রের ভূমি তৈরীতে গেরী রঙ ব্যাবহার হয়ে থাকে।

গ্ৰন্থঋণ:

১.দাস,জ্ঞানেন্দ্রমোহন-বাঙ্গালা ভাষার অভিধান, সাহিত্য সংসদ,জুলাই ১৯৯৪।

২.চারণকবি মুকুন্দ দাসের গ্ৰন্থাবলী,২ য় খণ্ড,বসুমতী-সাহিত্য-মন্দির, সেপ্টম্বর,২০১৪।

৩.সরস্বতী,সরসী কুমার পালযুগের চিত্রকলা,আনন্দ,১৯৭৮।

৪.চক্রবর্তী,মুকুন্দরাম-চণ্ডীমঙ্গল,সাহিত্য একাদেমি,২০১৭

৫. The sustainable Lifestyle of the Warli –Winin Pereira

চলবে…

প্রথম পর্ব পড়ার জন্য নীচে ক্লিক করুনঃ

বাংলার আলপনায় চিহ্ন ও প্রতীক- প্রথম পর্ব

শেয়ার করুন

2 thoughts on “বাংলার আলপনায় চিহ্ন ও প্রতীক- দ্বিতীয় পর্ব

  1. খুবই ভালো বিষয় নির্বাচন ও লেখা. আলপনা র ওপরে লেখা পড়লাম. খুব ভালো ধন্যবাদ দীপঙ্কর কে.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *