বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতি বিষয়ক সাপ্তহিক

গ্রটস্কি ও পুওর থিয়েটার

 হেমন্ত চক্রবর্ত্তী

জার্জি মারিয়ান গ্রটস্কি 1933 সালের 11ই আগস্ট পোল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের রেজেও নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি লুডউইক সলস্কি অ্যাকাডেমি অব ড্রামাটিক আর্টস্ ( এটি ক্রাকোয় অবস্থিত ) এবং রাশিয়ান অ্যাকাডেমি অব থিয়েটার আর্টস্ ( এটি মস্কোতে অবস্থিত) থেকে নাট্যবিষয়ে অধ্যয়ন করেন। তিনি প্রথম নাটক পরিচালনা করেন 1957 সালে 24 বছর বয়সে পোল্যান্ডের ক্রাকো শহরে। নাটকটার নাম ছিল  ‘গডস্ অব রেইন’। 1959 সালে পোল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে ওপোল  শহরে তিনি  ‘থিয়েটার ল্যাবরেটরি’ প্রতিষ্ঠা করেন। 1960 এবং 70 – এর দশকে তিনি তাঁর ল্যাবরেটরি থিয়েটার নিয়ে ইংল্যান্ড, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশে ঘুরে বেড়ান। এই ভ্রমণের মধ্যে দিয়ে গ্রটস্কির থিয়েটার ও তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা সারা বিশ্বে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। 1976 সালে তিনি একই সঙ্গে নাট্য নির্দেশনা ও নাটক মঞ্চস্থ করা থেকে সরে আসেন। 1982 সালে তিনি পোল্যান্ড ত্যাগ করেন এবং আমেরিকায় যান। পোল্যান্ডে তিনি যে নাট্যকোম্পানী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তা 1984 সালে বন্ধ হয়ে যায়। আমেরিকায় থাকাকালীনই তিনি উপলব্ধি করেন যে, নাটক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরিসর  আমেরিকায় কম। এরপর আমেরিকা ছেড়ে তিনি ইতালিতে চলে যান। ইতালির পন্টেডেরাতে 1985 সালে ‘গ্রটস্কি ওয়ার্কসেন্টার’  নামে একটা নতুন দল প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে তিনি নাটক নিয়ে স্বাধীনভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। দীর্ঘ কুড়ি বছর তিনি অসংখ্য অভিনেতাদের তাঁর নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষার সঙ্গে পরিচিত করান এবং তাঁদের প্রশিক্ষণ দেন। তিনি ছোট ছোট বিভিন্ন দল নিয়ে খুব গভীরভাবে কাজ করতে শুরু করেন এবং অভিনেতাদের আত্মসচেতনতা ও আত্মোপলব্ধির বিকাশে সহযোগিতা করতে থাকেন। গ্রটস্কি তাঁর এই কাজকে  ‘প্যারা থিয়েটার’ বলতেন এবং তিনি যখন আমেরিকা ও ইতালিতে ছিলেন তখন ধারাবাহিকভাবে এই‌ থিয়েটারের ব্যবহারিক প্রয়োগকে বাড়ানোর চেষ্টা করতেন। তিনি এরপর লিউকোমিয়ায় আক্রান্ত হন এবং হার্টের সমস্যায় ভুগতে থাকেন। 1999 সালের 14 ই জানুয়ারি ইতালির পন্টেডেরাতে  তাঁর মৃত্যু হয়। মূল ধারার থিয়েটার থেকে সরে আসার ফলে থিয়েটারের বিকাশে তিনি তাঁর বিশাল অবদান রেখে যেতে সক্ষম হন। তাঁর পুওর থিয়েটারের ধারনা বিশ শতকের থিয়েটারে নির্দেশনার জগতে এবং মঞ্চায়নের ক্ষেত্রে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

 

                    গ্রটস্কি দীর্ঘ সময় ধরে ইউরোপ ও তার চারপাশের বিভিন্ন ‌বিখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্বের অভিনয় শিক্ষণ পদ্ধতি নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। তিনি স্তানিস্লাভস্কির ‘ফিজিক্যাল অ্যাকশনস্’, মায়ারহোল্ডের ‘বায়ো-মেকানিক্যাল ট্রেনিং’, ডাল্লিনের ‘রিদম্  এক্সারসাইজ’ এবং ডেলসার্টের ইন্ট্রোভার্সিভ ও এক্সট্রোভার্সিভ  রিয়্যাকসনের ওপর যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা তার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। এছাড়াও ওরিয়েন্টাল থিয়েটার -এর বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কৌশল, যেমন-  ‘পিকিং অপেরা’ , ভারতীয় কথাকলি নৃত্য এবং জাপানিদের ‘নো থিয়েটার ‘ -এর দ্বারাও প্রভাবিত হয়েছিলেন। তিনি একজন অভিনেতার সহজাত অভিনয় পদ্ধতির বিকাশ ঘটাতে চাইতেন স্বতন্ত্র ও নির্দিষ্ট কিছু পদ্ধতির অনুশীলনের মাধ্যমে,যেমন কখনও কখনও সঙ্গীতকে ব্যবহার করে তিনি অভিনেতাদের শারীরিক কসরত ও অঙ্গভঙ্গির প্রশিক্ষণ দিতেন। পূর্বনির্ধারিত কিছু নিয়ম-নীতি-কৌশলকে কখনই অভিনেতাদের ওপর চাপিয়ে দিতেন না তিনি। একজন অভিনেতা অভিনয়ের চূড়ান্ত পরিস্থিতিতে কিভাবে প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে তার ওপর নজর রাখতেন এবং পর্যবেক্ষণ করে দেখতেন যে , একজন অভিনেতা তার ইগো – কে সব থেকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে নাকি তার নিজস্ব অনুভূতি তথা আত্মঅনুভবকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। গ্রটস্কি বিশ্বাস করতেন যে, যেসব অভিনেতার ইগো  থাকবে তাদের দ্বারা পুওর থিয়েটার হবে না। তিনি একজন অভিনেতাকে প্রশিক্ষণের মধ্যে দিয়ে তাকে তার শরীরী অভিনয়ের সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে যাওয়ার এবং সহজাত প্রবৃত্তিকে সুনিপুণভাবে প্রয়োগ করার চেষ্টা করতেন ।তাঁর অভিনয় প্রশিক্ষণের সাহায্যে শারীরিক বিভিন্ন কৌশলের মধ্যে দিয়ে একজন অভিনেতা যখন পরিণত হয়ে ওঠে তখন দর্শক আর তার শরীরটা দেখতে পায় না, দর্শক তখন অভিনেতাদর শরীর যে দৃশ্যকল্পগুলো রচনা করে তাতে মনোনিবেশ করে।তাঁর প্রশিক্ষণ পদ্ধতি অভিনেতাদের মধ্যে শুধুমাত্র কতকগুলো দক্ষতার সমষ্টি না  ঘটিয়ে বরং অভিনেতাদের সমস্ত রকমের প্রতিবন্ধকতা মোচনে সহায়ক হয়ে ওঠে। তিনি একজন অভিনেতাকে ফিজিক্যাল, ভোকাল ও প্লাস্টিক ট্রেনিং  দিয়ে অভিনয়ে মনোনিবেশের ক্ষেত্রে সঠিক পরামর্শ দানের চেষ্টা করতেন।

 

                বিভিন্ন ব্যবহারিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে গ্রটস্কি কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন,যেমন— থিয়েটার কি? এটা অন্যদের থেকে কোথায় স্বতন্ত্র? থিয়েটার কি পারে যেটা টেলিভিশন আর সিনেমা পারে না?এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়েই তিনি পুওর থিয়েটার  -এর জন্ম দেন।

 

                  তিনি অনুভব করলেন যে, থিয়েটার মেকআপ, লাইট, পোশাক, দৃশ্যসজ্জা, যন্ত্রসংগীত প্রভৃতি ব্যবহার ছাড়াও করা সম্ভব। এমনকি নির্দিষ্ট কোনও স্পেসের  মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে যে কোনও স্পেসে  থিয়েটার করা সম্ভব। কেবলমাত্র অভিনেতা ও দর্শকদের সম্পর্ককে অস্বীকার করে  থিয়েটার করা সম্ভব নয়। এটা একটা জীবন্ত শিল্পমাধ্যম।আর এখানেই থিয়েটার অন্যান্য শিল্পমাধ্যমগুলোর থেকে স্বতন্ত্র।

 

               থিয়েটার করতে গিয়ে গ্রটস্কি অনুভব করেছিলেন যে, যতই থিয়েটারে মেকআপ, লাইট, যন্ত্রানুষঙ্গ , পোশাক, সঙ্গীত প্রভৃতির ব্যবহার করা হোক না কেন থিয়েটার কখনই টেলিভিশন এবং সিনেমার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠবে না। তিনি থিয়েটার থেকে এগুলোকে বাদ দিলেন এবং পুওর থিয়েটার -এর জন্ম দিলেন। তাঁর পুওর থিয়েটার-এ অভিনেতাদের শারীরিক ও মানসিক উপস্থিতি এবং দর্শকের সঙ্গে অভিনেতার‌ সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টাই শেষ কথা। তিনি বিলাসবহুল মঞ্চ ও অডিটোরিয়াম থেকে তাঁর থিয়েটারকে বের করে এনে বিভিন্ন পুরোনো বিল্ডিং, কখনও কখনও সাধারণ ঘরের মধ্যে 40-100 জনের মত অল্প সংখ্যক দর্শক নিয়েও থিয়েটার করতে শুরু করলেন। এক্ষেত্রে অভিনেতা ও দর্শক একই‌ স্পেস ব্যবহার করতো, অভিনেতা ও দর্শকদের মধ্যে পৃথক স্থানের ব্যবস্থা তিনি রাখেননি। থিয়েটার চলাকালীন তিনি দর্শকদের এমনভাবে বসাতেন যাতে থিয়েটার দেখতে কারও কোনও অসুবিধা না হয়।

    

                   গ্রটস্কির লক্ষ্য ছিল থিয়েটারের মধ্যে দিয়ে অভিনেতার সঙ্গে দর্শকদের একটা জীবন্ত সম্পর্ক স্থাপন করা , যেটা ফিল্ম এবং টেলিভিশন কখনই পারে না। অভিনেতারা যাতে দর্শকদের স্পর্শ করতে পারে, দর্শকের কাছাকাছি যেতে পারে এবং অভিনেতা ও দর্শকদের মধ্যে যাতে স্থানগত কোনও প্রভেদ না থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতেন তিনি।     

 

                  গ্রটস্কি তাঁর থিয়েটারে মানসিক ঔদার্যকে পরিহার করার চেষ্টা করতেন। কঠোর নিয়মানুবর্তিতার মধ্য দিয়ে তিনি থিয়েটার নির্মাণের অনুশীলন করতেন। অভিনেতা ও দর্শকের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের ওপর জোর দিয়ে থিয়েটার নির্মাণের প্রচেষ্টা চালাতেন। একজন অভিনেতার ব্যক্তিগত পারদর্শিতা ও নাটকীয় অভিনয়ের পর্যালোচনা করতেন খুব নিখুঁতভাবে। গ্রটস্কি মূলত স্তানিস্লাভস্কি, এছাড়াও ব্রেখট ও মায়ারহোল্ডের থিয়েটার টেকনিকের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন ব্যাপকভাবে।গ্রটস্কি তাঁর ‘টুআর্ডস এ পুওর থিয়েটার’ -এ বলেছেন— ” আমি স্তানিস্লাভস্কির দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলাম, তাঁর নিরলস পড়াশোনা, তাঁর অভিনয় পদ্ধতি এবং তাঁর কাজকর্ম সম্পর্কে জানার পর তিনি আমার ব্যক্তিজীবনের আদর্শ হয়ে উঠেছিলেন।”

    

                             

                  তিনি দেখলেন রিচ্ থিয়েটারের ক্ষেত্রে অনেকরকমের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, যেমন— মেকআপ, লাইট, পোশাক, নির্দিষ্ট হলঘর, টিকিট, যন্ত্রানুষঙ্গের ব্যবহার প্রভৃতি। তিনি উপলব্ধি করলেন এই প্রতিবন্ধকতাগুলোকে দূরে সরিয়ে শুধুমাত্র দর্শক ও অভিনেতার‌ পারস্পরিক উপস্থিতিকে কাছে লাগিয়ে অভিনেতার শরীরকে কাজে লাগিয়ে যে কোনও স্পেসে যে কোনও ভাবে থিয়েটার করা সম্ভব। আর এই চিন্তাভাবনার সূত্র ধরেই তিনি পুওর থিয়েটার -এর কথা ভাবলেন, যা রিচ্ থিয়েটার -কে অস্বীকার করে এগিয়ে গেল।

 

 

                  তিনি মঞ্চকে অস্বীকার করে বিকল্প স্পেসে থিয়েটার করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন রিচ্ থিয়েটার-এ দর্শক ও অভিনেতার‌ মধ্যে সেইভাবে কোনও পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় না , বরং একটা ব্যাপক দূরত্ব তৈরি হয়। এই দূরত্ব ঘোচানোর জন্য তিনি মুক্ত স্থানে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে থিয়েটার নির্মাণের এবং দর্শক ও অভিনেতার‌ পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নতি ঘটানোর চেষ্টা করেন।তিনি অভিনেতাকে সবসময় কঠিন চ্যালেঞ্জে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি করতে চাইতেন, যাতে তার জড়তা কাটে এবং সার্বিক স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশ ঘটে। তিনি থিয়েটারকে বাইরে থেকে বিলাসবহুল জাঁকজমকপূর্ণ না করে থিয়েটারের অন্তর্কাঠামোকে মজবুত ও শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছেন বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে। ভিতরের দৈন্যতাকে কাটিয়ে বাইরের বিলাসিতাকে বর্জন করে তিনি থিয়েটার নির্মাণের চেষ্টা করেন। থিয়েটারকে ব্যাকরণের বেড়াজাল থেকে বের করে এনে, গতানুগতিকতা থেকে মুক্তি দিয়ে থিয়েটারকে নগ্ন করে তুলে ধরেন গ্রটস্কি তাঁর পুওর থিয়েটার -এ।

 

                 লেখাটা শেষ করবো পিটার ব্রুকের কথা দিয়ে। গ্রটস্কি ও তাঁর থিয়েটার সম্পর্কে বলতে গিয়ে পিটার ব্রুক বলেছেন—

 

” গ্রটস্কি অদ্বিতীয়।

 

   কেন?

 

কারন আমার মতে গ্রটস্কি ছাড়া পৃথিবীতে আর কেউই স্তানিস্লাভস্কির অভিনয়ের প্রকৃতি, তাঁর অনন্য সাধারণ ব্যক্তিত্ব, তাঁর অভিনয়ের মানসিক-শারীরিক-প্রাক্ষোভিক বিজ্ঞান পদ্ধতি ও প্রকৃতি নিয়ে এত গভীরভাবে এবং সম্পূর্ণভাবে অনুসন্ধান চালানোর, কিংবা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার চেষ্টা করেনি।

 

তিনি তাঁর থিয়েটারকে ল্যাবরেটরি থিয়েটার বলতেন। এটা ছিল তাঁর কাছে একটা পরীক্ষাগার। এটাই সম্ভবত একমাত্র প্রগতিশীল থিয়েটার যেখানে দারিদ্র্য কোনও বাধা বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনি, যেখানে পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থের অভাব থিয়েটারের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর ক্ষেত্রে কোনও অজুহাত হয়ে ওঠেনি। গ্রটস্কির থিয়েটারে যে পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলো চলত সেগুলো বিজ্ঞানসম্মতভাবে গ্রহনযোগ্য কারণ এখানে প্রয়োজনীয় শর্তগুলো পালন করা হত। তিনি তাঁর থিয়েটারে ছোট ছোট দলে অভিনেতাদের বিভক্ত করে অফুরন্ত সময় এবং যথার্থ মনোসংযোগ দিতেন থিয়েটার সংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published.