সাক্ষাৎকার

কথায় কথায়…

২০১১ সালে কেয়াপাতার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছিল সাহিত্যিক বিভাস রায়চৌধুরী-র এই সাক্ষাৎকারটি।

বাংলা সাহিত্য জগতে বিভাস রায়চৌধুরী একটি দায়িত্বের নাম। ফেসবুক লাইভে এসে দিনের পর দিন উনি পাঠ করতে পারেন একের পর এক কমপঠিত, নাম না জানা অসংখ্য কবির কবিতা। তাঁদের পরম যত্নে লালন করতে পারেন “কবিতা আশ্রম” পত্রিকায়। প্রায় দশ বছর পূর্বে তাঁর যে সাক্ষাৎকার কেয়াপাতায় প্রকাশিত হয়েছিল সেই সময়ের কবির মনন, আদর্শে পরিবর্তন আসেনি এতটুকুও। সাক্ষাৎকারের একটি অংশে সে কথা উনি বলেওছিলেন। সাহিত্যিক বিভাস রায়চৌধুরী-র মূল্যায়ন করার স্পর্ধা আমাদের নেই। কেয়পাতার সেই সময়ের কয়েকজন প্রান্তিক যুবককে অসংখ্যবার যে সময় তিনি দিয়েছেন তার জন্য কেয়েপাতা তাঁর কাছে চিরকৃতজ্ঞ।

কেয়াপাতার মুদ্রিত সংখ্যায় প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারের কেয়াপাতার ওয়েবসাইটে পুনঃপ্রকাশ বিভাস রায়চৌধুরীর বৃহৎ কর্মকাণ্ডের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা…

লেখালিখির স্বাধীনতার জন্য একসময় বাড়ি ছেড়েছিলেন। বন্ধুর বাড়িতে, ছাত্রাবাসে, ভাড়াবাড়িতে থেকে চলেছিল প্রথমিক সাহিত্য সাধনা। তাঁর প্রাথমিক পর্বের লেখায় পাওয়া যায় না কোনো বড় সাহিত্যিকের প্রভাব, আসলে সে এক অন্য কাহিনী- গোপন অস্ত্রশিক্ষার ইতিহাস। বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থেকেও তথাকথিত ‘প্রাতিষ্ঠানিকতা’ থেকে শতযোজন দূরে থেকে লিখে চলেছেন একের পর এক কবিতা, উপন্যাস। সহজ প্রলোভনের ছোঁয়া থেকে নিজেকে সযত্নে সুরক্ষিত রাখা বিভাস রায়চৌধুরীর সাথে একান্ত আলাপচারিতার তন্ময় দাস, সুমিতাভ মণ্ডল ও অমিত সাধুখাঁ।

দেশভাগের সময় আমার বাবারা ওপার বাংলা থেকে এপার বাংলায় চলে এসেছিলেন। সে-সময় মারামারি, কাটাকাটি চলছে। বাবারা ভেবেছিলেন সেসব থেমে যাবে। এসেছিলেন একেবারে নিঃস্ব হয়ে। কিন্তু আমার বাবাদের বংশে গান, কবিতা, ছড়া লেখালিখির একটা চর্চা ছিল, সেই বীজ থেকে গিয়েছে আমার মধ্যে।

  • লেখালিখির শুরুতে নিশ্চয়ই বাড়ি থেকে অনেকটা হেল্প, সাপোর্ট পেয়েছিলেন?

আমার বাবা খুব রাগারাগি করতেন। বলতেন, পড়াশোনায় ভালো, লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে এসব করছ! বাবার সঙ্গে রাগারাগি করে আমিও বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম।

  • সে সময় কি লুকিয়ে লেখালিখি করতেন?

না, লুকিয়ে লিখতে হত না। আসলে আমি একটা মিউচুয়াল ডিভোর্স করেনিলাম। প্ল্যান ঠিক করতে হবে। আমি যেহেতু আয় করব না, অসাবধানী জীবনে থাকব; ফলে আমি তোমাদের কাছ থেকে কিছু গ্রহণও করব না, একটা রিলিফ অন্তত যে একজনের ভার বহন করতে হচ্ছে না। তখন আমি একটা বন্ধুর বাড়িতে থাকতাম, তারপর একটা বাড়ি ভাড়া করেছিলাম।

  • এ সময় মায়ের ভূমিকা কিরকম ছিল?

মা লেখাপড়া তেমন একটা জানতেন না। আমার প্রতি মায়ের একটা অন্ধ সমর্থন ছিল। আমার অভাব দেখে বোনকে দিয়ে মা খাবার পাঠিয়ে দিতেন।

  • লেখলিখির শুরু কখন থেকে?

প্রথম যখন লিখি তখন ক্লাস টেন-এ পড়তাম।

  • প্রথম লেখা কি কবিতা?

না, গদ্য। আমাদের বাড়িতে বসুমতী পত্রিকা রাখা হত। ওটার বাচ্চাদের পাতায় একটা গল্প পাঠিয়েছিলাম যেটা ছাপা হয়েছিল।

  • গল্পের বিষয়টা কী ছিল?

একটা ছেলে বাড়ি থেকে পালিয়েছেল। সেই নিয়ে গল্প। আসলে আমারও তখন থেকে রাগ-টাগ হতো বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার।

  • কবি বিভাস না ঔপন্যাসিক বিভাস, কাকে আগে রাখবেন?

নিজেকে ব্যর্থ কবি ভাবতেই ভালোলাগে।

  • মনের কথা কোনটায় বেশি সহজে বা ভালোকরে বলতে পারেন, কবিতা না উপন্যাসে?

কবিতাই আমার অবলম্বন।

  • এখন আপনি যে জায়গায় আছেন, সেখানে গ্রামে গেলে গ্রামের লোকেরা কিরকম চোখে দেখে?

আমি তো গ্রামেই থাকি। যে গ্রামে জন্ম, তার পাশেই একটা গ্রামে থাকি।

  • না, ব্যাপারটা যদি একটু অন্য চোখে দেখা যায়। মানে বিড়ি শ্রমিকের ছেলে বিভস আর সাহিত্যিক বিভাস, এ দুটো তো দৃষ্টিভঙ্গির তফাত হয়ে যায়। এর প্রভাব প্রতিবেশীদের উপর কতটা?

তফাত যদি আপনি না করেন।

  • একটা পাত্তা দেওয়ার ব্যাপার এসে যায়।

হ্যাঁ বলে, লেখালিখি করে, অনেকের সাথে পরিচিতি আছে, উপর মহলের সঙ্গে মেশে।

  • কোলকাতায় না থেকে বনগাঁর বাড়ি থেকে রোজ যাওয়া-আসা করেন কেন?

কোলকাতাকে আমি এখনো ভয় পাই। যেন বনে গিয়েছিলাম আর বাঘের মুখ থেকে ফিরে এলাম। বনগাঁ ষ্টেশনটা দেখলেই একটা শান্তি অনুভব করি। এজন্যই হয়ত এখনও বনগাঁতেই আছি। আর তাই হয়তো দিনের মাঝের সময়টা কী করলাম, তা দিনের শেষে মনে থাকে না।

  • এত কবি কেন? আপনার এ সম্পর্কে কী মতামত?

এত ক্রিকেটার কেন? আসলে সবাই নিজের মত করে চেষ্টা করছে। এতে আপত্তির কী আছে!

  • বর্তমান কবি-গদ্যলেখকদের সাথে আদর্শ, মনন কীভাবে অবস্থান করছে বলে আপনার মনে হয়?

ধরুন, আপনি টক খেতে ভালোবাসেন আর বলছেন মিষ্টি খেতে আপনার ভালোলাগে। এই যে ঢপ- এর কারণেই একটা আদর্শহীন পরিবেশ তৈরি হয়েছে সমাজে, সাহিত্যে, সংস্কৃতিতে, সর্বত্রই। তার কারন হচ্ছে, একটা মিথ্যা জিনিসের উপর সত্যের কোড চাপিয়ে জিনিসটাকে চালানো হচ্ছে। কিন্তু এই রঙপালিশ তো একদিন উঠে যাবে, ভিতরের শূন্যতাও সেদিন প্রকাশ পেয়ে যাবে। এই সব লোকগুলোকে আমি দেখেছি। আসলে এতে হয় কী, বই পড়ে যে ছবিটা পেয়েছি, সেটা বাস্তব অভিজ্ঞতার সাথে ধাক্কা খেতে থাকে। তাতে বুঝতে পারি, এই লোকটাও আমার মতো সাধারণ। আর কেউ যদি তার কবিজীবনের জন্য, লিট্ল ম্যাগাজিন সম্পাদক জীবনের জন্য বা বামপন্থী আদর্শ গ্রহন করে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার জন্য একটা সময় এসে অনুতাপ করে, তাহলে বুঝতে হবে সে এইটার জন্য তৈরি ছিল না।

 

  • ঠিক এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয়, বর্তমানে একটা খুব বড় ব্যাপার যে কবি- সাহিত্যিক বা শিল্প জগতের যেই হোক, যারা নিজেদের বুদ্ধিজীবী বলে দাবি করে, তাদের শিবির বদলের দিকে একটা ঝোঁক, ব্রান্ডেড হয়ে যাওয়া। এই ব্রান্ড ব্যাপারটা আপনার কাছে কীরকম, বা বুদ্ধিজীবীরা আপনার কাছে কী? আদৌ কি তারা বুদ্ধিজীবী?

আমার বক্তব্য হচ্ছে, এটার মধ্যে যারা গিয়েছে, তাদের মধ্যে কিছু প্রতিবাদের জন্য প্রতিবাদ করা- এইরকম একটা স্বতস্ফূর্ত জায়গা থেকে গিয়েছে। পরবর্তী ব্যাপারটা রাজনৈতিক দলগুলোর খেলা। তারা নানা ধরনের ঘটনা এবং ঘটনাকেন্দ্রিক ইমোশান তৈরি করে মানুষের মধ্যে। এবার এখানে যে সৎ প্রতিবাদের বিষয় তৈরি হয়েছিল, তার মধ্যে থেকে দুটো দল বিবাদমান দুটো রাজনৈতিকদল তৈরি করে নিতে পেরেছে। যারা একটু বিপদে আছে, তারা কম পেয়েছেন। যাদের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে তারা বেশি পেয়েছে। কারণ ওরা এলেই আরও অনেক ক্ষমতা পেয়ে যাবে। ধরুন সুনীল গাঙ্গুলীর বিভিন্ন সম্মানীয় পদের প্রতি যারা ঈর্ষাকাতর, তাদের চোখ তো ঐ পদগুলোতে। আদর্শ, সোনার বাংলা- এগুলো কিন্তু মূল ব্যাপার নয়, আসল ব্যাপার বাংলা অ্যাকাডেমির চেয়ারম্যান হব, সাহিত্য অ্যাকাডেমির প্রধান হব, রবীন্দ্র পুরষ্কার কমিটির লোক হব। ‘একটা সাপের দুটো মাথা’ গল্প ফেঁদে, সবার উদ্দেশ্যই সেই মাদুলি বেচা। এর মধ্যে নাটক, গল্প, কবিতা কিচ্ছু নেই। আর একথা আমার বন্ধুদেরও বলেছি যে যারা সমাজের অতিনাটকীয় ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামায় না, তারা হটাৎ ধ্যান ভেঙে বেরিয়ে এসেছে এই বলে যে এত অরাজকতা চলেছে এবং রাস্তায় নেমেছে, এর একটা এফেক্ট সিভিল সোসাইটির উপর থাকে। কিন্তু এদিকে দমদম আর ওদিকে যাদবপুর পর্যন্তই তো সব কথা নয়। বৃহত্তর পশ্চিমবঙ্গেরও একটা গুরুত্ব রয়েছে। সেখানেও প্রচুর শিক্ষিত মানুষ রয়েছে। তারাও বুদ্ধিজীবী। তাহলে এখানে যারা নাটক লেখালিখি করছে, শুধু তারাই বুদ্ধিজীবী! সে অর্থে তো চোরও বুদ্ধিজীবী। তাকেও বুদ্ধি করে বেঁচে থাকতে হয়। ফলে এ সবই হচ্ছে সমাজের ভাঙা-গড়ার খেলা।

  • আপনার ওই বন্ধুদের প্রতিক্রিয়া কী?

বন্ধুরা বলেছে, তুমি কোন দলে যাচ্ছ না কারণ তুমি অনেক বেশি ধান্দাবাজ। আমি বলেছি, তোমার কথা না আমার কথা থাকবে, তার জন্য আরো দশ বছর অপেক্ষা করতে হবে। কারণ ‘তুমি’ ব্যক্তিকে থাকতে গেলেও লেখার জোরে থাকতে হবে, পদের জোরে নয়। ‘আমি’ ব্যক্তিকেও তাই। লেখার কোয়ালিটি ফল করলেই বাজার থেকে আউট। তা তুমি যেই হও না কেন। বিখ্যাত অনেকেই এখন উল্টোপাল্টা লেখে, সেগুলোকে অগ্রাহ্য্ করতে হবে। গ্রামবাংলার লোক এখন লিখছে। লেখা ভালোহোক, খারাপ হোক, ওই আমার বাংলা সাহিত্যের আসল কোয়ালিটি। ওটার মানই এখন বাড়াতে হবে।

  • কীভাবে?

তাদের কবিতা নিয়ে ওয়ার্কশপ হোক। ছন্দশিক্ষা দেওয়া হোক। কোন বই পড়তে হবে, সেগুলোকে বলা হোক।

  • এতসব আয়োজনের দায়িত্ব কে বা কারা নেবে?

আমি বাংলাদেশে গিয়ে দেখেছি, ওখানকার বাংলা অ্যাকাডেমির নেতৃত্বে সারা দেশের কবিদের থেকে কবিতা চাওয়া হয়। কোনও বড় কবির নেতৃত্বে এর মধ্যে থেকে ধরুন তিনশো কবিকে বেছে নিয়ে তাদের ডাকা হয়। তারা কবিতা উৎসবে কবিতা দেয়। সেখান থেকে পঞ্চাশ জনকে সিলেক্ট করে ছয় মাসের ট্রেনিং দেওয়া হয় বাংলা অ্যাকাডেমিতে, যেখানে দেওয়া হয় বিশ্বসাহিত্যের পাঠ। পড়াতে আসেন শ্রেষ্ঠ কবি-লেখকেরা। শেখানো হয় যাবতীয় প্রকাশনার কাজও। তাদের কবিতার কালেকশান প্রকাশ করে বাংলা অ্যাকাডেমি। এটাই সিস্টেম, প্রসেস।

  • এই প্রসেসের সুফল বাংলাদেশ কতটা পেয়েছে?

সুফল তো পেয়েছেই। বাংলাদেশের নব্বই-এর দশকের কবিতা পশ্চিমবঙ্গের নব্বই-এর দশকের কবিতার থেকে অনেক উন্নত হয়ে গেছে। সত্তর-এর দশকেও বাংলাদেশের সাহিত্যকে জোলো সাহিত্য বলা হত। জিনিসটা এখন চেঞ্জ হয়ে গেছে। ওদের কবিতা পড়লেই বোঝা যায়, কীভাবে বিশ্বচেতনা যুক্ত হয়েছে কবিতার সঙ্গে। ওখানে রাষ্ট্র সংস্কৃতিকে ভালোবাসে বলেই কবিতার কাছে গিয়ছে, কবিদের কথা শুনেছে। সেইটা আমাদের এখানে নেই বলেই কিছু লোক ‘বুদ্ধিজীবী’ হয়ে বসে আছে।

  • আমাদের এখানে কি এই ধরনের প্রসেস শুরু করা সম্ভব নয়?

 

সম্ভব নয় কেন, ইচ্ছে করে করবে না। দেখুন, কবীর সুমনের মতো শক্তিশালী মানুষকেও রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে ইগোর লড়াইয়ে পরাজিত হতে হল। জয় গোস্বামী থেকে শুরু করে সবাই তো সুমনের লোক। কই কেউ তো এগিয়ে এল না ওর সমর্থনে। আর সুমন যখন অতই বিপ্লব ভালোবাসে, ওর তো উচিত ছিল জেলায় জেলায় গিয়ে যারা নতুন গান করছে, তাদের বলা, এসো, পুরনো গান ছেড়ে নতুন গান ধর। কিন্তু না, সুমন যে এত ভালোভালো কথা বলত, সেটা শুধু লাখ লাখ ক্যাসেট বিক্রির জন্য? আমরা যারা সুমনের জন্য পাগল হয়েছি্‌ তাদের প্রতি এটা সুমনের বিশ্বাসঘাতকতা। এসবের জন্যই আমি সবকিছু ছেড়ে নিরাসক্ত জায়গায় চলে এসেছি। বুঝেছি জলঘোলা করে লাভ নেই। আমার যা কথা, লেখালিখির মধ্যেই থেকে যাবে।

  • মফঃস্বলে প্রচুর লেখালিখি হলেও সেটা কোলকাতা কেন্দ্রিক সাহিত্যের স্ট্যান্ডার্ডের চেয়ে কোন ক্ষেত্রে পিছিয়ে। সমস্যাটা ঠিক কোন জায়গায়?

 

বিষয়ের দিক থেকে, আবেগের দিক থেকে মফঃস্বল এগিয়ে। শুধু ছন্দ, অলংকার এই ব্যাকারণগত দিক থেকে আমরা পিছিয়ে, এগুলো তো শিখতে হয়।  আর এগুলো ভীষণই গুরুত্বপূর্ণ।

  • গদ্যের ক্ষেত্রে?

নাগরিক গদ্য বলে কিছু হয়? ভাষা মিলেমিশেই থাকবে।

  • সাহিত্যে পুরষ্কার পেতে গেলে প্রাতিষ্ঠানিক সহচর্য থাকা দরকার। এটা কি আপনার সঠিক মনে হয়?

সঠিক নয়, কিন্তু উপায় কী? যারা পুরষ্কার দেয়, তারা লিস্ট তৈরি করে যে এরা এরা পুরস্কার পেতে পারে। তারপর আলোচনা হয়। এবার স্বাভাবিক কারণেই কমিটির মেম্বারদের যাদের সম্পর্কে জানা আছে, তাদের নামটা লিস্টের মধ্যে থেকে যায়। সর্বত্র সমান নজর দেওয়ার সময় তো তাদের নেই। ফলে দূরে যারা ভালো লেখে বা খারাপ লেখে, তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কেই জানে না।

  • এটার সমাধান কী?

 

সমাধান হচ্ছে আপনার জেলার কবিরা কেমন লেখে, আপনার তো একটা ধারনা আছে। আপনি আপনার ওখানেই একটা পুরস্কার চলু করুন না। সেখানেও তো বুদ্ধিজীবী সমাজ আছে। ধরুন বর্ধমানে যদি একজন নামী কবি থাকে, তাহলে তো গোটা বর্ধমান শহরের গরিমা বৃদ্ধি পায়। তাহলে ওই শহরের মানুষেরও তো কিছু দাবি আছে, নাকি সব এসে এই কোলকাতায় ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। তাহলে তো অবস্থা আমার এক বিখ্যাত অধ্যাপক বন্ধুর মত হবে। তার বই কেউ পড়ে না বলে নিজের টাকা দিয়ে অ্যাকাডেমিতে অনুষ্ঠান করে। ওর পাঠানো লোক ছাড়া কেউ বই কেনে না। এগুলো তো ভিক্ষা চেয়ে নেওয়ার মতো ব্যাপার। নিজের জোরে কিছু হোক। মূল বাজারে ঢোকা আলাদা ব্যাপার, একটা লাক ফ্যাক্টার। এসব জটিল ব্যাপারে না ঢুকলেও একজন লেখকের চলে যায়। জীবনটাকে প্রথম গুছিয়ে নিতে হবে। অলআউট রিস্ক্ নিলে ঠিক করে নিতে হবে যে আমি ভালো খেতে পাই আর না পাই লেখাটাকে গ্রহণ করে বাঁচব। আর ভয় লাগলে সাহিত্য-কর্মী হয়ে যাও। কারণ সাংগঠনিক কাজ করারও আমাদের অনেক ব্যাপার আছে।

  • লিটল ম্যাগাজিনগুলো এক্ষেত্রে নিজেদের ভূমিকা কীভাবে বাড়াতে পারে?

দেখুন, একটা জেলা থেকে এখন পঞ্চাশ-ষাটটা লিটল ম্যাগাজিন বের হয়। অনেক ভালো জেলা থেকে আরো বেশি বের হয়। সেগুলো বেরুক। কিন্তু তারাই নিজেদের মধ্যে সদ্ভাব রেখে সমবেত টাকা দিয়ে একটা বার্ষিক সংকলন বের করতে পারে। এটা একটা দুর্দান্ত ব্যাপার হবে। গ্রাম-মফঃস্বলের লোকেরাই এখন বেশি শিক্ষিত। সেখানে ভালো কিছু অবশ্যই সম্ভব।

  • সাহিত্যমহলে একটা কথা প্রচলিত আছে যে, ‘দেশ’ পত্রিকায় লেখা ছাপা না হলে খ্যাতি লাভ করা যায় না। আপনার কী মনে হয়?

আমরা আমাদের লেখা পাঠকের কাছে ফেলে পরীক্ষিত হতে চাই। সে হিসাবে ‘দেশ’ পত্রিকার ধারন ক্ষমতা অনেক বেশি। একজন কবি-লেখক একসাথে পনেরো-কুড়িটা অন্যান্য নামী পত্রিকায় লিখে যে সংখ্যক পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারে, ‘দেশ’- এর মাধ্যমে তা সহজেই পৌঁছানো যায়। তাই আমার মনে হয়, প্রত্যেকের উচিত একবার অন্তত এই সুযোগের সঠিক ব্যাবহারের চেষ্টা করা। আসলে নিজেকে নগ্নভাবে স্বীকার করাটা খুব দরকার।

  • আপনার কেরিয়ারের যে জায়গায় আজ পৌঁছেছেন, সেখানে আসতে বিশেষ কারোর সাহায্য পেয়েছেন?

সাহায্য তো নানা লোকের পেয়েছি। না হলে অত দূর থেকে এসে এখানের সারস্বত সমাজে জায়গা হল কীভাবে? শুভঙ্কর পাত্র, খুব ভালো কবিতা লিখতেন। একেবারে বিরল গোত্রের মানুষ, আমায় ভীষণ সাহায্য করতেন। তখন সাংবাদিক হওয়ার খুব ইচ্ছে ছিল। ওনার সঙ্গে আমি অনেক ঘুরে বেড়িয়েছি। আমায় অনেক ভালো বই দিয়েছিলেন, আমার জীবনটাকেই অন্য দিকে বইয়ে দিয়েছিলেন। শুভঙ্কর পাত্রের কাছে আমি ভীষণ ঋণী। অনেকে বলে, আমার প্রথমিক কবিতায় কোন বড় কবির ছাপ পাওয়া যায় না। আসলে ছাপটা ছিল শুভঙ্কর পাত্রের। সে দিক দিয়ে আমি উচ্চাকাঙ্খাহীন, শক্তিশালী দারুণ মানুষদের সাথে মিশেছি। ফলে গোপনে অস্ত্রশিক্ষা করার ধৈর্য আয়ত্ত করতে পেরেছি।

  • আপনার কবিতায় যে বিদ্রোহ অর্থাৎ জ্বালাময়ী একটা ভাব থাকে, সেটা কি প্রথম জীবনের ঘটনাগুলো থেকে চলে এসেছে?

বিদ্রোহ মানে নজরুল যার কথা বলতেন সেটা নয়। আসলে আপনি যদি স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হতে না পারেন, তাহলে ফাটিয়ে বেরিয়ে আসার একটা ব্যাপার থেকে যায়। সে গুলো ছিল। তবে এখন ভাবি, চড়া সুরে কখনো যদি কথা বলে থাকি, তার জন্য লজ্জিত, মাফ চেয়ে নিচ্ছি। কারণ কবিতা কোনও চড়া কথা সহ্য করতে পারে বলে আমি মনে করি না।

  • নিজের লেখার সমালোচনা করেন? আপনার সমালোচকদের সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি কিরকম?

কিছু কিছু সমালোচক বা কবি আমার প্রশংসা করেছেন বা করছেন। আবার আমার সমসাময়িক কিছু কবি বিরূপ মন্তব্যও করেন। তবে একটা যুক্তি থাকা দরকার, না হলে মনটা খারাপ হয়ে যায়। তবু স্বীকার করতে পারি সব লেখা আমার  ভালো নয়, অসম্পূর্ণ। আর সে জন্যই হয়তো লিখে চলেছি।

  • কবি, প্রেম এবং দায়িত্ব কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

কবিরা দায়িত্ব নিতে চায় না। দায়িত্ব মানে কি আমি তোমায় ভালোবাসি, তোমার ভাত কাপড়ের দায়িত্ব নিতে হবে! এটা কি ভালোবাসা নাকি? এটা তো চুক্তি।

  • ‘চণ্ডালিকা’ কাব্যে আপনার একটা কবিতা আছে ‘বজ্রধ্বনি-দুই’, সেখানে একটা লাইন আছে ‘সে- দৈবকে/ বিভাস লিখে যায়’। কী দৈববাণী আপনি লিখে যেতে চান যার জন্যে পাঠকশ্রেণী বিভাস রায়চৌধুরীকে মনে রাখবে?

আমাকে কেউ মনে রাখবে, এই আশা আমার নেই। তবে মোটামুটি সৎভাবে বেঁচেছিলাম, মিথ্যা কথা বলিনি, লেখাকে প্রতারনা করিনি, ছোটোখাটো ছিলাম, মাঝারি ছিলাম- এইরকম একটা ইনিংস পরবর্তী লেখক, পাঠকদের সামনে রেখে যেতে চাই।

 

কেয়াপাতায় প্রকাশিত বিভাস রায়চৌধুরীর দুটি কবিতা।

জ্বর

নিজেকে প্রয়োগ করি

দুঃখী মানুষের আয়োজন

সম্পূর্ণ করেছে চাঁদ

পোকা আর বিষের প্রনয়

গাঢ় হয়ে এলে

রুদ্ধ ঠোঁট বোবা থাকে ছাদ

যা দেখেছি বলবার নয়

গুমরে মারে জ্ঞান

জ্বর আসে, জ্বর ফিরে যায়

লালামাখা পড়ে আছি

যত শব, তত উৎসব

আমার বাংলায়…

 

চিরকুট

মনখারাপ করতে নেই

ওঠো… উঠে পড়ো…

দিগন্তে কখনো শেষ হয় না কবিতা!

জীবন অপার…

যে তোমাকে ছেড়ে চলে গেল,

শুভেচ্ছা জানাও তাকে—

‘তোর ভাল হোক!’

তারপর মুছে ফেলো চোখ…

নতুন পৃথিবী দ্যাখো

হাত নেড়ে ডাকছে তোমাকে

বলছে সে—‘প্রেমে পড়ো… প্রেমে পড়ো আরো একবার…’

চোখের জলের চিরকুট

মেঘে মেঘে পয়লা আষাঢ়!

 

“কবিতা আশ্রম” থেকে প্রকাশিত, “এই তো আমার কাজ” কাব্যগ্রন্থ থেকে বিভাস রায়চৌধুরীর চারটি কবিতা।

চরাচর

কষ্ট হওয়ারই কথা

কষ্ট পাচ্ছিও খুব

কিন্তু আমি স্বীকার করব না, তুমি একা পারো

শীতে কেঁপে কেঁপে উঠছি

চুম্বনে শুকনো পাতায় আগুন লাগে দ্রুত

কিন্তু আমি স্বীকার করবই না, তেমন একটা উনুনের গল্প তুমি জানো

ধুলোর মধ্যে লুকিয়ে থাকা মানুষের ঈশ্বর

একবার আমাকে বলছেন, “ঝাঁপাও”

আর তক্ষুনি তোমাকে বলছেন, “পালাও”

মাঝখানে একটা পথ নিরন্তর শুয়ে আছে দেখি

কষ্ট হওয়ারই কথা

কষ্ট পাচ্ছিও খুব

কিন্তু আমি স্বীকার করবই না আত্মার ওপারে চাঁদ উঠলে

তোমার কথা আমি ভাবি

তুমি

পাগলা হাওয়া, বৃষ্টি- এসব কোনো বিষয় না

বিষয় হচ্ছ তুমি

তোমাকে পাওয়া, না পাওয়া- এসবও কোনো বিষয় না

বিষয় হচ্ছ তুমি

তোমার চুল না

তোমার চুমু না

তোমার শরীরের কোনো কুড়িয়ে পাওয়া ঝিনুকও না

বিষয় বলতে শুধু তুমি

একটা নির্জন রাস্তা,

ঘুমের বাইরে এসে

যে আমাকে চিনতে পারেনি আর কোনোদিন…

আপনাকে নিয়ে লেখা

আপনার আঁকা ছবি…

শরীর-প্রসূত গাছ…

শাখা থেকে দুই পাখি

শান্তভাবে ওড়ে…

পাতাকে ঝরাচ্ছে গাছ বৃষ্টির ভেতরে!

সিঁড়ি আর জানালার মেঘ

একজন আকাঙ্ক্ষায় রাজি

অন্যজন থম মেরে আছে

সিঁড়ি আর জানালার মেঘ

আপনার বাড়ি আজীবন

পোষা কুকুরের মতো বাঁচে!

আলোবীজ

পাখি ওড়ে… পাখি ওড়ে…

গাছ নেই… গাছে গাছে বাসা হারাবার ভোরে।

জগৎ সকলেই জানে…

আলোবীজ ডেকে ডেকে আনে…

দুঃখী মাটি কেঁদে উঠলেই

আগামীকে পুঁতে দেয় ঠোঁটের ভেতরে!

বিশেষ কৃতজ্ঞতাঃ অমিত সাহা, সম্পাদক, “কবিতা আশ্রম”।  

Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
সাম্প্রতিক পোষ্ট
সাড়ে চুয়াত্তরের কেদাররূপী ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের “মাসিমা মালপোয়া খামু” র অনবদ্য হ্যাংলামো আমাদের ভেতরে স্বতঃজাগরূক। ওটা সহজেই মাসিমা আইচকিরিম খামু হতে পারে… সারাজীবনে কতবার যে চেয়েছি সেটা।

হারিয়ে যাওয়া ফেরিওয়ালারা- যশোধরা রায়চৌধুরী

Read More »
কাজী নজরুল ইসলাম ও একটি নির্বাচনী লড়াই। নির্বাচনের প্রাক্কালে এক শ্রেণির মুন্সি-মৌলভীরা কবিকে কাফের অপবাদ দিতে শুরু করল। ভোটের লড়াইয়ে মরিয়া কবি তখন এর জবাবে ইসলাম ধর্ম ও ঐতিহ্যকে ভিত্তি করে প্রচুর গান, গজল ও কবিতা রচনা শুরু করলেও তেমন সুবিধা হল না।

৩০ মে, ২০২১ , রবিবার কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও

Read More »