বিপ্রদাস চট্টোপাধ্যায়

অণুবীক্ষণে কেয়াপাতা,

পাঁচের কোঠার শেষের দিকে এসে আমি এখন অদৃষ্টবাদী এই বিশ্বলোকে এমন অনেক ঘটনা কাছে বা দূরে ঘটে চলেছে-ইন্টারনেট সমৃদ্ধ সভ্যতায় তার বেশীরভাগটাই মনে হয়েছে ‘ভাগ্যং কলতি সর্বত্র’। বেশ কিছুজনকে দেখেছি সারাজীবন বৃদ্ধ মাতা বা পিতাকে অন্ন বঞ্চিত করে। নানাভাবে গঞ্জিত করেও দিব্যি জীবনের পনেরো আনা অপার সুখে কাটিয়ে যাচ্ছে। তখন মনে হয়েছে রবীন্দ্রনাথকে। বৃদ্ধ পিতা ধৃতরাষ্ট্র একসময় পত্নী গান্ধারীকে বলছে- ‘কি দিবে তোমদের ধর্ম’। গান্ধারীর উত্তর- ‘দুঃখ নব নব;’ অর্থাৎ ধর্ম পাপ পূন্য বলে যেন কিছু নেই। চিরকালীন কয়েকটি সত্য- যা সসবাই হয়তো মেনে নিয়েছে-, আমি আমার নিভৃত গোপনে, দ্বন্দ্বদীর্ণ জীবনপথ পরিক্রমার ক্ষণে ক্ষণে আপন মনেই প্রতিবাদ করে গেছি। মনে হয়েছে “Sword is mightier than Pen”. এই রকম বিতর্কিত মনোমণ্ডপে বসে কেয়াপাতার সুগন্ধ অনুভব করা আমার কম্ম নয়। সত্যি বলতে কি ছন্দমিল ছড়া-টড়া বিশেষকালের বিশেষ কয়েকজন কবির ছড়া তেমন কারোর ভালো লাগে নি। প্রথমেই বলি কেয়াপাতার ‘গুচ্ছ ছড়া’য় বিজন দাসের লেখনি এককথায় Pen is mightier than Sword এত অর্থবহ ছড়া সত্যিই অনবদ্য। সত্রাজিৎ গোস্বামীর প্রবন্ধ “কবিতার ছন্দঃযুক্তি –তর্ক-আলাপ” পড়ে বারেবারে মনে হয়েছে কেয়াপাতার সৌভাগ্য যে এমন মননশীল লেখনি তার বুকে স্থান পেয়েছে। অনুগল্পে ড.শ্রীকান্ত বসুর “নকল ভিখারী” লেখাটিও অন্য কোন কথা না ভেবে বলতে ইচ্ছে করে- “আসাধারনঃ।

প্রতীক্ষার কবি জুবিন ঘোষের কাছে আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ তাঁর আরও কবিতা এমনিভাবে পেয়পাতার বক্ষকন্দরে যেন বারবার দেখতে পাই। ‘প্রেমে ‘না’’-র কবি বর্মণবাবুর লেখা আমি তন্ময় হয়ে অন্তত বারপাঁচেক পড়েছি। লিটিল ম্যাগাজিন আমার হাতে মাঝে মধ্যে পুজাপার্বণে আসে। তাতেও ভালো লেখা দেখি বৈকি! তবে “লৌকিক” গল্পের তীক্ষ্ণ মরালিটি চাবুক মেরে গেল যেন। অন্তলীনার সামাজিক চাপে পরিস্থিতির শিকার হয়ে যাওয়া – পরিশেষে নির্মম মিথ্যে স্বীকারোক্তি(?) গল্পটিকে অন্য মাত্রা দিয়ে গেছে। অমিত সাধুখাঁর লেখা আগেও পড়েছি। ‘মরনবুড়ি’ আমার মনে এখনও মরেনি। লৌকিক এক সুক্ষ বোধের গল্প। কেন পরম সত্যকে ঢাকা দিতে লীলা চরম মিথ্যা কথা বললো- তা, আমাদের ভীষণ ভাবে ভাবায়। সমাজ চিরকালই এইভাবে সত্যকে দাবিয়ে চলেছে। অমিত সাধুখাঁর অনেক সাধুবাদ প্রাপ্য এই গল্পটিতে। আপাত চকচকে সমাজ সংস্কৃতির অন্তর-বাহিরে এত ভনিতা। এত মিথ্যাচার, এত কদর্যতা জমে আছে সেখানে কেয়াপাতার লেখনিতে, গল্পে, অনুগল্পে, প্রবন্ধে তার বারবার প্রকাশ ঘটে চলেছে। প্রচ্ছদটি নাতুনিক মাত্রাবাহক। শিল্পী অচিন্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায় আমার অত্যন্ত স্নেহভাজন। তার শিল্প সুষমা বহুভাবে আমার দেখার সুযোগ হয়েছে। তার এবারের কেয়াপাতার প্রচ্ছদে সভ্যতাধীন তাজের দিকে খেটে খাওয়া আদিবাসী যুবকের তিরবিদ্ধ নকলকে শানিত কলা যেন আমার মনের কথাই নির্দেশ করে- “Survival for the ffittest”.

বিপ্রদাস চট্টোপাধ্যায়

গ্রন্থাগারিক

আঝাপুর সাধারণ পাঠাগার

আঝাপুর, বর্ধমান

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাহিত্যিক বিভাস রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার

X